সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, অথচ দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও সুখবর আসছে না? এর পেছনে নারীর পাশাপাশি পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যাও দায়ী হতে পারে। বিশ্বজুড়ে সন্তান ধারণে সমস্যায় থাকা দম্পতিদের প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে পুরুষের প্রজননগত কোনো না কোনো কারণ জড়িত থাকে। কিন্তু পুরুষের বন্ধ্যত্বের সমস্যা অনেক সময় সহজে বোঝা যায় না। কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর স্পষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না।
সন্তান ধারণে ব্যর্থ হওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করালে তবেই বিষয়টি ধরা পড়ে। তবে কিছু শারীরিক পরিবর্তন পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আসুন লক্ষণগুলো জেনে নিন-
যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
যৌন ইচ্ছা বা আগ্রহ হঠাৎ কমে গেলে তা হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে গেলে যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস পেতে পারে। তবে মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব ও অন্যান্য শারীরিক সমস্যাও এর কারণ হতে পারে।
এছাড়া যৌন উত্তেজনার সময় লিঙ্গ উত্থিত হতে অসুবিধা হওয়া বা উত্থান ধরে রাখতে না পারা আরেকটি সতর্কসংকেত। এটি সরাসরি বন্ধ্যত্বের প্রমাণ নয়। তবে হরমোনজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিস কিংবা রক্তনালির সমস্যার সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
বীর্যপাতের সমস্যা
বীর্যপাত হতে দেরি হওয়া, একেবারেই বীর্যপাত না হওয়া কিংবা বীর্য মূত্রথলির দিকে চলে যাওয়ার মতো সমস্যা সন্তান ধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বীর্যপাতের সময় বীর্যের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কম মনে হলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা ভাব
অণ্ডকোষে ব্যথা, ফোলাভাব, ভারী লাগা কিংবা আকারে পরিবর্তন দেখা দিলে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ভেরিকোসিল বা অণ্ডকোষের শিরা ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণুর উৎপাদন ও গুণগত মানকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে হঠাৎ তীব্র ব্যথা হলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।
শরীরে হরমোনজনিত পরিবর্তন
টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে গেলে শরীরে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন-পেশির শক্তি কমে যাওয়া, ক্লান্তি, যৌন ইচ্ছা হ্রাস এবং স্তনের টিস্যু বেড়ে যাওয়া। এসব লক্ষণ দেখা দিলে হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করার প্রয়োজন হতে পারে।
মুখ বা শরীরের লোম কমে যাওয়া
মুখে দাড়ি-গোঁফ বা শরীরের লোমের ঘনত্ব কমে যাওয়ার সঙ্গে কখনো কখনো হরমোনের ভারসাম্যহীনতার সম্পর্ক থাকে। তবে বংশগত বৈশিষ্ট্যসহ অন্যান্য কারণেও এমন হতে পারে। তাই শুধু লোম কমে যাওয়াকে বন্ধ্যাত্বের লক্ষণ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
পুরুষের বন্ধ্যত্বের সম্ভাব্য কারণগুলো-
১. হরমোনজনিত ব্যাধি
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষদের বন্ধ্যত্বের একটি বড় কারণ হলো হরমোনজনিত সমস্যা। হাইপোগোনাডিজম, অর্থাৎ টেস্টোস্টেরন এবং টেস্টিস দ্বারা প্রজনন সম্পর্কিত অন্যান্য হরমোনের অপর্যাপ্ত উৎপাদন বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে। সেইসঙ্গে মস্তিষ্কের গোড়ায় অবস্থিত পিটুইটারি গ্রন্থির ব্যাধিও হরমোন উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে, শুক্রাণু উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে।
২. শারীরিক এবং কাঠামোগত ব্যাধি
ভ্যারিকোসেল এমন একটি অবস্থা যেখানে অণ্ডকোষের মধ্যে শিরার বৃদ্ধি এবং বেলুনিং অণ্ডকোষের তাপমাত্রাকে পরিবর্তন করতে পারে। এটি শুক্রাণু উৎপাদনকে ব্যাহত করে। যা বন্ধ্যত্বের দিকে নিয়ে যায়। রেট্রোগ্রেড ইজাকুলেশনে বীর্য লিঙ্গ দিয়ে বের হওয়ার পরিবর্তে মূত্রথলিতে প্রবেশ করে, যা পুরুষদের বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে। এছাড়াও যথাক্রমে এপিডিডাইমাইটিস, অরকাইটিস এবং যৌনবাহিত সংক্রমণের মতো সংক্রমণ শুক্রাণুর স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করতে পারে। শুক্রাণু পরিবহন ব্যবস্থায় ত্রুটি যেমন শুক্রাণু পরিবহনের বিভিন্ন অংশে বাধাও বন্ধ্যত্বের আরেকটি কারণ হতে পারে।
৩. লাইফস্টাইল ফ্যাক্টর
অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাসের কারণে পুরুষের বন্ধ্যা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। দীর্ঘস্থায়ী ধূমপান বা তামাক সেবন শুক্রাণুর গতিশীলতা, গুণমান এবং পরিমাণকে কমিয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনের অভ্যাস টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমিয়ে দিতে পারে এবং ইরেক্টাইল ডিসফাংশন এবং শুক্রাণু উৎপাদন হ্রাস করতে পারে। স্থূল বা অতিরিক্ত ওজন সরাসরি শুক্রাণুর পরিমাণকে প্রভাবিত করতে পারে এবং হরমোনের মাত্রাও পরিবর্তন করতে পারে যা বন্ধ্যত্বের দিকে নিয়ে যায়। এছাড়াও অস্বাস্থ্যকর ও অনিয়মিত খাবার খাওয়া এবং শারীরিক কার্যকলাপের অভাব সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে, যা স্থূলতা এবং বন্ধ্যত্বের কারণ হতে পারে।
৪. পরিবেশগত কারণ
কীটনাশক, ভেষজনাশক, ভারী ধাতু, জৈব দ্রাবক, রঙ এবং দূষণ শুক্রাণুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রার পরিবেশে বেশি থাকলে তাও সাময়িকভাবে শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস করতে পারে।
৫. জেনেটিক ফ্যাক্টর
জেনেটিক্স বন্ধ্যত্বের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে। ক্লাইনফেল্টার সিনড্রোম একটি জেনেটিক অবস্থা যেখানে একটি পুরুষ শিশু অতিরিক্ত এক্স ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, এটি পুরুষের প্রজনন অঙ্গে ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে টেস্টিকুলার ফাংশন এবং শুক্রাণু উৎপাদন প্রভাবিত হয়। অন্যান্য জেনেটিক ব্যাধি যেমন সিস্টিক ফাইব্রোসিস, কলম্যান সিন্ড্রোম শুক্রাণু নালীতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
যেভাবে নির্ণয় করা হয় পুরুষের বন্ধ্যত্ব
সঠিক চিকিৎসার জন্য প্রথমে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। চিকিৎসকেরা রোগীর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার ইতিহাস বিবেচনা করে কয়েকটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
বীর্য পরীক্ষা
শুক্রাণুর সংখ্যা, গতিশীলতা, আকৃতি এবং বীর্যের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য যাচাই করা হয়। এটি পুরুষের প্রজননক্ষমতা মূল্যায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
রক্ত পরীক্ষা
টেস্টোস্টেরনসহ প্রয়োজনীয় হরমোনের মাত্রা পরীক্ষা করে হরমোনজনিত সমস্যা শনাক্ত করা হয়।
আলট্রাসনোগ্রাফি
অণ্ডকোষের গঠন, ভেরিকোসিল বা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা সন্দেহ হলে এই পরীক্ষা করা হতে পারে।
জিনগত পরীক্ষা
শুক্রাণুর সংখ্যা অত্যন্ত কম বা একেবারেই না থাকলে কিংবা নির্দিষ্ট জিনগত সমস্যা সন্দেহ হলে চিকিৎসক এই পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌন সম্পর্কের পরও এক বছর সন্তান না এলে দম্পতির দুজনেরই প্রজনন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। নারীর বয়স ৩৫ বছর বা তার বেশি হলে সাধারণত ছয় মাস চেষ্টা করার পরই মূল্যায়ন শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এছাড়া অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা, যৌনক্ষমতায় সমস্যা কিংবা আগে অণ্ডকোষে আঘাত বা অস্ত্রোপচারের ইতিহাস থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়ে থাকলেও প্রজননক্ষমতা সম্পর্কে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা জরুরি।
এসব লক্ষণ থাকলেই যে পুরুষের বন্ধ্যাত্ব হয়েছে, তা নয়। আবার কোনো লক্ষণ না থাকলেও প্রজননগত সমস্যা থাকতে পারে। তাই অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার মাধ্যমে সঠিক কারণ নির্ণয় করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: ভেরিওয়েল হেলথ, টাইমস অব ইন্ডিয়া
