মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগানের ঘটনায় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার দেওয়া শাস্তি মেনে নিতে রাজি নয় স্পেন। প্রথম দফায় আপিল খারিজ হওয়ার পর এবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতের (সিএএস) দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটির ফুটবল ফেডারেশন (আরএফইএফ)। স্প্যানিশ ফেডারেশনের দাবি, সমর্থকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা অতিরিক্ত ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
গত মার্চে মিসরের বিপক্ষে স্পেনের একটি প্রীতি ম্যাচে সমর্থকদের একাংশ মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগান দেন। এ ঘটনায় স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনকে ২০ হাজার মার্কিন ডলার জরিমানা করে ফিফা। একই সঙ্গে নিজেদের মাঠে স্পেনের পরবর্তী প্রীতি ম্যাচে স্টেডিয়ামের অন্তত ১৫ শতাংশ আসন বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করেই ফিফার সঙ্গে স্পেনের ফুটবল কর্তৃপক্ষের বিরোধ তৈরি হয়েছে।
স্প্যানিশ ফেডারেশন মনে করছে, ঘটনার সময় তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল। স্লোগান শনাক্ত হওয়ার পর ম্যাচ কর্মকর্তাদের জানানো, দর্শকদের সতর্ক করা এবং সংশ্লিষ্ট গ্যালারিতে নিরাপত্তা বাড়ানোর মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এরপরও ফিফার কঠোর শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তারা।
আপিল খারিজ, এবার আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে স্পেন
ফিফার দেওয়া শাস্তির বিরুদ্ধে প্রথমে সংস্থাটির কাছেই আপিল করেছিল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন। তবে সেই আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ফিফার এক মুখপাত্র জানান, আগের সপ্তাহেই স্পেনের আপিল খারিজ করা হয়েছে।
এরপরই নতুন করে আইনি লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নেয় স্পেনের ফুটবল কর্তৃপক্ষ। এবার তারা আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের লুজানে অবস্থিত এই আদালত আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গলের বিভিন্ন বিরোধ, শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট আপিল নিষ্পত্তি করে থাকে।
স্পেনের ফেডারেশনের লক্ষ্য হলো ফিফার জরিমানা ও স্টেডিয়ামের আসন বন্ধ রাখার নির্দেশ পুনর্বিবেচনার সুযোগ তৈরি করা। তবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিলের পর শাস্তি বাতিল হবে, নাকি বহাল থাকবে, তা নির্ভর করবে মামলার শুনানি ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর।
কী ঘটেছিল স্পেন-মিসর ম্যাচে?
গত ৩১ মার্চ বার্সেলোনার কাছে এস্পানিওলের আরসিডিই স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও মিসর। আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচটি গোলশূন্য ড্রয়ে শেষ হয়। তবে মাঠের খেলাকে ছাপিয়ে আলোচনায় আসে গ্যালারিতে সমর্থকদের একাংশের আচরণ।
ম্যাচ চলাকালে স্পেনের কিছু সমর্থক ‘যে লাফাবে না, সে মুসলিম’ বলে স্লোগান দেন। একই ধরনের স্লোগান দ্বিতীয়বার শোনা যাওয়ার পর স্টেডিয়ামের ঘোষণাব্যবস্থার মাধ্যমে দর্শকদের সতর্ক করা হয়। বড় পর্দায়ও বৈষম্যমূলক আচরণ বন্ধের বার্তা দেখানো হয়।
ফুটবলে সমর্থকদের এমন আচরণ শুধু ম্যাচের পরিবেশ নষ্ট করে না, বরং ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগও তৈরি করে। এ কারণে ঘটনাটি নিয়ে স্পেনের ফুটবল অঙ্গনেও সমালোচনা শুরু হয়।
ফিফার শৃঙ্খলাবিধি অনুযায়ী, ম্যাচ চলাকালে দর্শকদের বৈষম্যমূলক আচরণ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট ফুটবল ফেডারেশনকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। সমর্থকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কিংবা এ ধরনের ঘটনার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনকে শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
লামিনে ইয়ামালের তীব্র প্রতিবাদ
মুসলিমবিদ্বেষী স্লোগানের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন স্পেনের মুসলিম ফুটবলার লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার এই তারকা ফুটবলার স্লোগানগুলোকে অসম্মানজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। এমন আচরণকারীদের অজ্ঞ ও বর্ণবাদী বলেও সমালোচনা করেন তিনি।
ইয়ামালের প্রতিক্রিয়া ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। আধুনিক ফুটবলে বর্ণবাদ, ধর্মীয় বিদ্বেষ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে খেলোয়াড়দের অবস্থান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। মাঠে কিংবা গ্যালারিতে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়—এমন অবস্থান বিভিন্ন সময় ফুটবলার ও ফুটবল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
স্পেনের মতো বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম শক্তিশালী দলের সমর্থকদের একাংশের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠায় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গুরুত্ব পায়। বিশেষ করে জাতীয় দলের ম্যাচে দর্শকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে ফেডারেশনের দায়িত্ব কতটা কার্যকর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
ফিফার শাস্তি নিয়ে স্প্যানিশ ফেডারেশনের আপত্তি
ফিফার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের অন্যতম যুক্তি হলো, ঘটনার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলাবিধির কোন ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, ‘মুসলিম’ শব্দটি নিজে কোনো অপমানসূচক শব্দ নয়। তাই ঘটনাটিকে বৈষম্যমূলক আচরণসংক্রান্ত ১৫ নম্বর ধারার পরিবর্তে রাজনৈতিক, আদর্শিক, ধর্মীয় বা আক্রমণাত্মক বার্তাসংক্রান্ত ১৭ নম্বর ধারার আওতায় বিবেচনা করা উচিত ছিল।
ফেডারেশনের এই যুক্তি মূলত ঘটনার ব্যাখ্যা ও প্রযোজ্য বিধি নিয়ে। তাদের মতে, কোনো শব্দের অর্থ বিবেচনার পাশাপাশি সেটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়েছে, তা-ও গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে ঘটনার প্রকৃতি ও শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে আরও বিস্তারিত মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করছে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ।
তবে ফিফার শৃঙ্খলা কমিটি এই যুক্তি গ্রহণ করেনি। সংস্থাটির অবস্থান হলো, কোনো শব্দ সরাসরি গালি না হলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কাউকে অপমান, হেয় কিংবা বৈষম্যের শিকার করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে তা বৈষম্যমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু ব্যবহৃত শব্দের আক্ষরিক অর্থ নয়, বরং সেটি কীভাবে এবং কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, সেটিও শাস্তি নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিবেচ্য। এই ব্যাখ্যার ভিত্তিতেই ফিফা স্প্যানিশ ফেডারেশনের আপিল খারিজ করেছে।
শাস্তি কমানোর পক্ষে কী যুক্তি দিচ্ছে স্পেন?
রয়টার্সকে স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঘটনার শুরু থেকেই তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ফেডারেশনের নিজস্ব পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় স্লোগান শনাক্ত হওয়ার পর ম্যাচ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানো হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট গ্যালারিতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।
ওই কর্মকর্তার দাবি, ফেডারেশনের নেওয়া পদক্ষেপের কারণেই স্লোগান বন্ধ হয়েছিল। দর্শকদের বড় একটি অংশও এমন আচরণের বিরোধিতা করেছিলেন। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের উদ্যোগকে শাস্তি নির্ধারণের সময় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল বলে মনে করছে স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ।
এ ছাড়া তুলনামূলকভাবে আরও গুরুতর কিংবা বারবার শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় একই ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেছে ফেডারেশন। তাদের মতে, শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে ঘটনার গুরুত্ব, কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপ বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে ফিফা এসব যুক্তির ভিত্তিতে নিজেদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেনি। ফলে এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিলের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ খুঁজছে স্পেন।
স্টেডিয়ামের ১৫ শতাংশ আসন বন্ধ রাখার নির্দেশের প্রভাব
ফিফার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্পেনের পরবর্তী প্রীতি ম্যাচে স্টেডিয়ামের অন্তত ১৫ শতাংশ আসন বন্ধ রাখতে হবে। এর ফলে ম্যাচ আয়োজনের সময় দর্শক প্রবেশ ও আসন ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হতে পারে।
তবে নির্দেশনায় একটি বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ফিফার অনুমোদন সাপেক্ষে ওই আসনগুলোতে পরিবার, শিক্ষার্থী কিংবা বৈষম্যবিরোধী সংগঠনের সদস্যদের বসানোর সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট আসনগুলো সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত না রেখে ইতিবাচক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, বরং স্টেডিয়ামে বৈষম্যবিরোধী বার্তা জোরদার করাও। তবে স্প্যানিশ ফেডারেশন মনে করছে, তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানা ও আসনসংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বৈষম্যবিরোধী অবস্থানে ফিফার কঠোর বার্তা
ফুটবলে বর্ণবাদ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ দীর্ঘদিনের আলোচিত সমস্যা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সমর্থকদের আচরণ নিয়ে বিতর্কের পর ফুটবল কর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরও কঠোর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মাঠে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি গ্যালারিতে দর্শকদের আচরণও এখন শৃঙ্খলা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
স্পেন-মিসর ম্যাচের ঘটনাও সেই আলোচনাকে সামনে এনেছে। একদিকে স্প্যানিশ ফেডারেশন বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাদের নেওয়া পদক্ষেপ বিবেচনায় শাস্তি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে ফিফার অবস্থান, বৈষম্যমূলক আচরণকে নিরুৎসাহিত করতে শৃঙ্খলাবিধি প্রয়োগ করা জরুরি।
এই বিরোধের নিষ্পত্তি শুধু স্পেনের জরিমানা কিংবা স্টেডিয়ামের আসন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক ফুটবলে বৈষম্যমূলক আচরণের বিচার, ফেডারেশনগুলোর দায়িত্ব এবং শাস্তির আনুপাতিকতা নিয়েও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, ফিফার আপিল খারিজের পর স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের সামনে এখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে যাওয়ার পথই প্রধান বিকল্প। আদালতে তারা কী যুক্তি তুলে ধরে এবং সেই যুক্তির ভিত্তিতে শাস্তি বহাল থাকে, নাকি পরিবর্তন হয়—এখন সেদিকেই নজর ফুটবলবিশ্বের।
The post ফিফার শাস্তি মানছে না স্পেন, যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে appeared first on SATV.
