যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে হামলার কথিত পরিকল্পনা ইরানে সমন্বয় করা হয়ে থাকতে পারে এবং এর পেছনে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ভূমিকা থাকার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত বলে দাবি করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সোমবার পার্লামেন্টে তিনি এ দাবি করেন। তবে ইরান এ ঘটনার সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইংল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিটি ইরানে হামলা চালাতে মার্কিন বোমারু বিমান ব্যবহারের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ভোরে ঘাঁটির কাছ থেকে সন্ত্রাসবাদ ও বিস্ফোরকসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে পাঁচ ব্রিটিশ নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হলে সেখানে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়।
রয়টার্সকে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঘাঁটিটিতে ড্রোন হামলার একটি কথিত পরিকল্পনায় ইরানের সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ করা হয়েছিল। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেন, ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হুমকির কারণে ঘাঁটি থেকে বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পার্লামেন্টে বার্নহাম বলেন, “আমাদের তদন্ত অনুযায়ী, পরিকল্পনাটি ইরানে সমন্বয় করা হয়ে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি। এটি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নির্দেশনায় পরিচালিত হয়ে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।”
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা আইআরএনএর বরাতে যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত সৈয়দ আলী মুসাভি বলেন, ফেয়ারফোর্ডের ঘটনায় তেহরানের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। ব্রিটিশ সরকারের কাছে অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি বা প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করার আহ্বান জানান তিনি।
অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ নিয়ে অস্পষ্টতা
কথিত হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ ব্যক্তিকে পরে কঠোর শর্তে পুলিশি জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এ ছাড়া ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিকত্বধারী একজনসহ আরও দুজন গ্রেপ্তার ব্যক্তিকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ওই পাঁচ ব্যক্তির সঙ্গে জব্দ করা ভ্যানগুলোতে পেট্রল পাওয়া গেলেও কার্যকর বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই এ ঘটনায় কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছেন।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পার্লামেন্টে বলেন, ইরানে অবস্থানরত এক পরিচিত ব্যক্তি ঘটনাটির পেছনে ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ওই ব্যক্তির নাম প্রকাশ করেননি তিনি।
বার্নহাম বলেন, “আমরা আমাদের ভূখণ্ডে এ ধরনের হুমকি সহ্য করব না।” তিনি আরও জানান, ইরানের অপরাধী নেটওয়ার্ক ও তাদের অর্থায়নের উৎসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে যুক্তরাজ্য তার সব ধরনের ক্ষমতা ব্যবহার করবে। ইরান ও আইআরজিসির ক্ষতি করার সক্ষমতা সীমিত করতে আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে বলেও জানান তিনি।
ইরানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ দেশের নিন্দা
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ প্রায় ৩০টি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা, প্রাণঘাতী হামলার পরিকল্পনা, অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, সাইবার হামলা এবং অন্যান্য গোপন তৎপরতা চালানোর অভিযোগের নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ফেয়ারফোর্ডের ঘটনা প্রমাণ করে যে আইআরজিসি গোপন নেটওয়ার্ক ও সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে দেশের সীমানার বাইরেও বৈরী তৎপরতা চালাতে আগ্রহী।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বেশ কয়েক বছর ধরে যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন ব্যক্তিকে হত্যা বা অপহরণের পরিকল্পনায় ইরানের অপরাধী নেটওয়ার্ক ও সহযোগীদের ব্যবহারের অভিযোগ করে আসছে। তবে তেহরান বারবার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত বছর যুক্তরাজ্য জানিয়েছিল, দেশটিতে অবস্থানরত ব্যক্তিদের হত্যা বা অপহরণের জন্য ইরান-সমর্থিত ২০টি বিশ্বাসযোগ্য হুমকির তথ্য তাদের কাছে ছিল।
আইআরজিসির বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা
গত জুলাইয়ে যুক্তরাজ্য নতুন আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে আইআরজিসি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হারাকাত আসহাব আল-ইয়ামিন আল-ইসলামিয়া (হায়ি) গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়া নিষিদ্ধ করে। গোষ্ঠীটি চলতি বছরের শুরুতে ইহুদি ও ইসরায়েলি সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা এবং ফারসি ভাষার সংবাদমাধ্যমে সাতটি হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড সে সময় ইরানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেন। একই সঙ্গে দুই ইরানি নাগরিকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেওয়া হয়।
নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা দুজন হলেন রুহুল্লাহ বাঘজান্দি, যাকে আইআরজিসির পাল্টা গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রধান বলে দাবি করেছে যুক্তরাজ্য, এবং শাহরাম আলী রেজা তামারজাদেহ জাক্কি। দ্বিতীয় ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জিন্দাশতি অপরাধী নেটওয়ার্কের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। নেটওয়ার্কটির বিরুদ্ধে ইরানি ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্য করে একাধিক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
