পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ডের আগে জানানো হয়নি কিছুই ,মরদেহ দেশে ফেরাতে দুই সরকারের সহযোগিতা চান স্বজনেরা
নিজস্ব প্রতিবেদক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
সৌদি আরবে বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সদর উপজেলার নিজ গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। পরিবারের একমাত্র ভরসা ও উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা। তাঁদের অভিযোগ, পরিবারের সদস্যদের কিছু না জানিয়েই নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। এ ঘটনায় নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের সহযোগিতা চেয়েছেন স্বজন ও এলাকাবাসী।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) গণমাধ্যমের খবরের মাধ্যমে তাঁরা নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর থেকেই বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নজরুলের মৃত্যুর খবর সহ্য করতে না পেরে তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের দাবি, শোকের মধ্যে তাঁর এক ফুফুও বুধবার রাতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান নজরুল ইসলাম (২২) পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কা নগরীর একটি মসজিদে সুইটি আক্তার নামের এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তাঁদের দুজনকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। এরপর প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাবন্দি থাকার পর গত বুধবার তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন।
নজরুলের মা জানান, কারাগারে থাকা অবস্থায় ছেলে প্রতি রোববার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতেন। নিয়মিত যোগাযোগ থাকায় তাঁরা আশা করেছিলেন, একদিন ছেলে ফিরে আসবেন। কিন্তু হঠাৎ গণমাধ্যমের খবর থেকে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পেরে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।
পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁদের কোনো তথ্য জানানো হয়নি। আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও তাঁরা নিশ্চিত নন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তথ্য জানার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
‘ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে চাই’
নজরুলের বাবা বলেন, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন এবং অসুস্থ হয়ে যান। পরিবারের উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে তাঁরা এখন অসহায়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কী করেছে আমি জানি না। একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই।’
পরিবারের সদস্যরা জানান, চার ভাইবোনের মধ্যে নজরুল ছিলেন সবার বড়। সৌদি আরবের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাঁর উপার্জনের ওপর পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। ছেলের এমন পরিণতিতে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন এলাকাবাসীর
নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তাঁর বাড়িতে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও গ্রামবাসী। তাঁরা পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে দুই দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন।
গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিন বলেন, নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা তাঁদের ব্যথিত করেছে। তাঁদের মতে, যেকোনো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নজরুলের ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
তাঁরা আরও বলেন, দরিদ্র পরিবারটি উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। মানবিক দিক বিবেচনায় নজরুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশ সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
দুই সরকারের সহযোগিতা চান স্বজনেরা
নজরুলের পরিবারের প্রধান দাবি, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা এবং অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো। এ জন্য বাংলাদেশ ও সৌদি আরব সরকারের কূটনৈতিক সহযোগিতা কামনা করেছেন তাঁরা।
তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারকে অবহিত করা হয়েছিল কি না, নজরুলের বিচারপ্রক্রিয়ায় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নিয়েছে—এসব বিষয়ে সরকারি বক্তব্য পাওয়া গেলে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র স্পষ্ট হবে।
একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে ঘিরে থাকা তরুণের এমন পরিণতি এখন তাঁর গ্রামজুড়ে শোক ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্বজনদের অপেক্ষা এখন একটাই—প্রিয় সন্তানের মরদেহ যেন শেষবারের মতো দেশের মাটিতে ফিরিয়ে আনা যায়।

