মুজাহিদ হোসেন, নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:
নওগাঁর বদলগাছী থানার নবাগত অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুর রহমানের মতবিনিময় সভা বর্জনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে চরম অপসাংবাদিকতা ও বিভ্রান্তিকর প্রপাগান্ডা ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে এবং পেশাদার সাংবাদিকদের হেয় প্রতিপন্ন করতে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বদলগাছী উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও বদলগাছী উপজেলা প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দ।
জানা যায়, নবাগত ওসি মো. হাবিবুর রহমান যোগদানের পর স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনের সদস্যদের সাথে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেন। তবে শুরুতেই এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে চরম বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে। বদলগাছী উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও উপজেলা প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দকে ওসির পক্ষ থেকে প্রথমে ১৪ অক্টোবর সভায় যোগদানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরই পুলিশের পক্ষ থেকে পুনরায় ফোন করে বলা হয়, ওসি সাহেব থাকবেন না—তাই সময় পরিবর্তন করে ১৫ অক্টোবর আসতে বলা হয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তি নিজেদের ‘মূলধারার সাংবাদিক’ দাবি করে নবাগত ওসিকে প্ররোচিত করেন। ওসির ওপর প্রভাব বিস্তার করে ঐতিহ্য ভেঙে তারা আলাদাভাবে মতবিনিময় করতে বাধ্য করেন। পরবর্তীতে ১৪ তারিখেই ওই গোষ্ঠীটি ওসির সঙ্গে মতবিনিময় করেছে জানতে পেরে ১৫ অক্টোবর বদলগাছী উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও উপজেলা প্রেস ক্লাবের সাংবাদিকরা থানায় গিয়ে মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়ে ওসির কাছে এই বৈষম্যের কারণ জানতে চান। কিন্তু ওসির নিকট থেকে কোনো সন্তোষজনক জবাব না পাওয়ায় দুই সংগঠনের সাংবাদিকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে একযোগে মতবিনিময় সভা বর্জন করেন।
ঘটনাটি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর নিজেদের ‘মূলধারার সাংবাদিক’ দাবিদার চক্রটি প্রকৃত ঘটনা গোপন করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন মাধ্যমে প্রপাগান্ডা চালানো শুরু করে। তারা বদলগাছীর সাংবাদিকরা সংবাদ বর্জন করেননি মর্মে বিভ্রান্তিকর পাল্টা তথ্য ছড়িয়ে দুই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালায়, যা সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় অনুসন্ধানে জানা যায়, নিজেদের পেশাদার সাংবাদিক দাবি করা এই চক্রটির কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতেও বিভিন্ন গুরুতর ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে এদের মধ্যে কেউ কেউ ডিবি পুলিশ সেজে মাদক ব্যবসায়ীকে তুলে এনে আর্থিক রফাদফা করে ছেড়ে দেওয়ার মতো অপরাধে যুক্ত ছিলেন। এছাড়া উপজেলা চত্বরের ভেতর থেকে সরকারি গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিক পরিচয়ে তা ধরে নিজেই বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। এমনকি ঐতিহাসিক পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের কাস্টডিয়ানের নিকট থেকে অনৈতিক সুবিধা বা চাঁদা না পেয়ে এক বছর আগের পুরনো ভিডিও নতুন ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রটির নানা অনিয়ম, প্রভাব বিস্তার ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের কারণে উপজেলার অনেক কর্মকর্তা শান্তিতে কাজ করতে পারেন না।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বদলগাছী উপজেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং বাংলা টিভি ও বাংলা পোস্ট-এর জেলা প্রতিনিধি আশরাফুল নয়ন বলেন, "কারও সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করার আগে সত্যতা যাচাই করা উচিত।
আজ যারা নিজেদের বদলগাছীর পেশাদার ও মূলধারার সাংবাদিক দাবি করছেন, তাদের আগে জানা উচিত পেশাদারিত্বের অর্থ কী। আমার সম্পর্কে যেসব ভিত্তিহীন মন্তব্য করা হয়েছে, আমি তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। আমি নওগাঁ জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক পদে হেরে বদলগাছীতে সংগঠন করিনি; বরং সেখানে সফলতার সঙ্গে দুই বছর দায়িত্ব পালন শেষে স্বেচ্ছায় পদ ছেড়েছি এবং পরে সর্বসম্মতিক্রমে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়ে এখনো বহাল আছি।
তিনি আরও বলেন, "বদলগাছীর মাটিতেই আমার জন্ম ও সাংবাদিকতার শুরু। বদলগাছীর উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করার পূর্ণ অধিকার আমার আছে। মেধা ও কলমের মাধ্যমেই যেকোনো ষড়যন্ত্র ও অপপ্রচারের যোগ্য জবাব দেওয়া হবে।"
বদলগাছী প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সভাপতি ও বর্তমান বদলগাছী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি মো. ফেরদৌস হোসেন ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, "১৩ অক্টোবর আনুমানিক বেলা সাড়ে ১২টায় থানার দুই এসআই আমাদের প্রেসক্লাবে এসে ১৪ অক্টোবর ওসির সঙ্গে মতবিনিময় সভার আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ঘণ্টাখানেক পরই আবারও ফোন করে জানানো হয় ওসি সাহেব থাকবেন না, তাই সভা ১৫ তারিখে হবে। অথচ আমরা জানতে পারি ১৪ তারিখেই একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সঙ্গে ওসি মতবিনিময় করেছেন। এটি স্পষ্ট বৈষম্য ও স্বজনপ্রীতি। ১৫ তারিখে ওসির কাছে আমরা এর কারণ জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। যার ফলে উপজেলা প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সাংবাদিকরা সভা বর্জন করতে বাধ্য হই।
তিনি আরও যোগ করেন, "আমরা কোন কোন সংগঠন আমন্ত্রিত ছিলাম এবং কারা সভা বর্জন করেছি তা প্রকাশিত সংবাদে স্পষ্ট। যারা সাংবাদিকতার নীতি-আদর্শ ভুলে প্রপাগান্ডা ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, তাদের দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি; অন্যথায় তারা সাংবাদিকতার ইতিহাস থেকেই নিক্ষিপ্ত হবে।
এ জাতীয় আরো খবর..
