প্রতি ঘনমিটার এলএনজি আমদানিতে ১১৭ টাকার মতো খরচ পড়ছে। দেশীয় গ্যাসের দামের সঙ্গে মিশ্রণের পর ৫২.১৮ টাকা (জুলাই-নভেম্বর) গিয়ে ঠেকেছে। গড়ে ২৩.৯০ টাকা দরে বিক্রি করে মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে গ্যাস খাত।
কমদামে বিক্রির কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম ৩ মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। আর অক্টোবর মাসে ঘাটতি হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। নভেম্বর মাসে এই ঘাটতি ৬ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা হবে বলে ধারণা করছে পেট্রোবাংলা।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঘাটতির বিপরীতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২৬-২৭) জ্বালানি খাতে ভতুর্কি বরাদ্দ রয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা। প্রথম ৫ মাসেই ২৬ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি ছাড় করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বার্তা২৪.কমকে বলেছেন, ইরান যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। স্পট মার্কেট থেকে কিনলে এক কার্গো এলএনজিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মতো বেশি দিতে হচ্ছে। যুদ্ধের কারণে জিটুজি ভিত্তিতে (কাতার এবং ওমান) গ্যাস আসা বন্ধ থাকায় লোকসান বাড়ছে। চলতি মাসে একটি জাহাজ হরমুজ পার হতে পেরেছে আমরা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে ফেলেছি।
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঘাটতি মেটানোর বিষয়টি সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। জ্বালানি একটি অতি প্রয়োজনীয় পণ্য, না দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
যুদ্ধের আগে এক কার্গো এলএনজি কিনতে ৫’শ কোটি টাকার মতো খরচ হতো, এখন সেই কার্গো সর্বোচ্চ ১২’শ কোটি টাকায় দিয়ে কিনতে হয়েছে। যে পরিমাণ গ্যাস ১০ ডলারের পাওয়া যেতো এখন ২২ থেকে ২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাস (জুন-মার্চ) গ্যাসের গড় ক্রয়মূল্য পড়েছে ২৭.৬৪ টাকা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর (এপ্রিল-জুন ২০২৬) গড় ক্রয়মূল্য উঠেছে ৪৫.৭৯ টাকায়। তখন গড় বিক্রয়মূল্য ২৩.৬৩ টাকা থাকায় প্রতি ঘনমিটারে ঘাটতি হয়েছে ২১.৮২ টাকা। এতে করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পেট্রোবাংলার ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর নিয়ে শঙ্কায় পেট্রোবাংলা।
ঘাটতি সামাল দিতে সম্প্রতি গ্যাসের দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ নেয় মন্ত্রণালয়। সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা এবং যানবাহনে ব্যবহৃত সিএনজি ৪৩ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬৫ টাকা করার প্রস্তাব দেয় পেট্রোবাংলা। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে ওই প্রস্তাবনা এমন সময়ে দেওয়া হয়, যখন এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের কারণে দেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছিল। সংকটের মধ্যে দাম বাড়ানোর উদ্যোগের ব্যাপক সমালোচনার পর প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত করা হয়।
পেট্রোবাংলা বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস কিনে থাকে। সিলেট গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানিকে প্রতি ঘনমিটারের দাম দেওয়া হয় ১ টাকা, বাপেক্সকে ৪ টাকা। শেভরন বাংলাদেশকে ১২ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৭৬ ডলার) আর টাল্লোকে দেওয়া হয় প্রায় ১০ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ২.৩১ ডলার) হারে। অন্যদিকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসে কাতার থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম পড়েছে ৪৬ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.৬৬ ডলার) এবং ওমান থেকে আনা এলএনজির দাম পড়েছে প্রায় ৪৪ টাকা (প্রতি হাজার ঘনফুট ১০.০৯ ডলার)।
দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া গ্যাসের ঘনমিটার প্রতি গড় মূল্য ৬.০৭ টাকা, আর ৩০ শতাংশ আমদানির পর দাঁড়াচ্ছে ৫২.১৮ টাকা। ৩০ শতাংশ আমদানিতে ভর্তুতি সামাল দেওয়া কঠিন হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ৭০ শতাংশ আমদানির প্রাক্কলনে কি দাঁড়াবে সহজেই অনুমেয়। তারপরও বিগত সরকারগুলো আমদানির দিকেই ঝুঁকেছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় যখন অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি ছিল। তখন আমদানি পথে পা বাড়ানোর কারণে আজকের মহাসংকট বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
সেই আমদানির চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে বর্তমান সরকারও। দ্বীপ জেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস আনতে ১ হাজার ৯৩১ কোটি টাকা জন্য যখন (ভোলা-বরিশাল) পাইপলাইন আটকা, তখন ২৪ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির জন্য মহেশখালী-বাখরাবাদ সমান্তরাল পাইপলাইন প্রকল্প বেশ জোরেশোরেই এগিয়ে চলছে। ফেনী-বাখরাবাদ অংশের ঠিকাদার নিযুক্তের কাজও প্রায় চূড়ান্ত বলা যায়।
অন্যদিকে ছন্দহীন কূপ খননের ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়াতেও। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন ধাপে প্রায় ১৯টি ডিপিপি আটকে রয়েছে। বর্তমান সরকারের সময়ে এখন পর্যন্ত মাত্র ১টি ডিপিপি অনুমোদিত হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক প্যাচে আটকা পড়েছে জিডিএফ অর্থায়ন প্রকল্পও। খোদ মন্ত্রী চিঠি দিলেও আমলে নিচ্ছে না পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়।
ডিপিপি প্রসঙ্গে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, আমি আজকে সশরীরে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম কথা বলতে। আশা করছি, খুব শিগগিরই ২টি ডিপিপি অনুমোদিত হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, অনেক পদেই নতুন লোকজন বসেছে, তারা ভাল করে যাচাই-বাছাই করছে, যে কারণে সময় একটু বেশি লাগছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৮টি গ্রাহক শ্রেণিতে অনুমোদিত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৫ হাজার ৩৫৬ মিলিয়ন ঘনফুট (দৈনিক)। মতান্তরে ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে কমবেশি ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানিকৃত এলএনজি থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অন্যদিকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন।
ঘোষিত চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বাইরে এক তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিতে ৩৭৯টি শিল্পের বিপরীতে প্রতিশ্রুত লোডের পরিমাণ রয়েছে ৩৮০ মিলিয়ন ঘনফুট। যারা কোটি কোটি টাকা জামানত দিয়ে জুতার তলা ক্ষয় করছেন।
এক সময়ে দেশীয় গ্যাস ফিল্ডগুলো থেকে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়নের মতো গ্যাস উৎপাদিত হলেও এখন ১৬২৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। মজুত কমে যাওয়ায় প্রতিনিয়ত কমে আসছে উৎপাদন। বেশি উদ্বেগের বিষয় বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার উৎপাদন কমে যাওয়া। ফিল্ডটি থেকে এখনও সাড়ে ৪৫ শতাংশের মতো গ্যাস যোগান আসছে। এক সময়ে ১৩৫০ মিলিয়নের মতো উৎপাদন দিতো, এখন ৭৩১ মিলিয়নে নেমে গেছে। মজুত কমে আসায় দ্রুতই কমে যাচ্ছে উৎপাদন। বাড়ন্ত চাহিদার বিপরীত সরবরাহ বাড়ানো থাকল দূরের কথা, বিদ্যমান সরবরাহ অব্যাহত রাখাই কঠিন মনে করছে পেট্রোবাংলা।
