মেসির মতো ফুটবল খেলতে চায় মাইনুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনার জার্সিও কিনেছিল সে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানে পড়ে, সেখানে খেলার মাঠ নেই। বাসার আশপাশেও নেই খেলার উপযুক্ত জায়গা। নিরাপত্তার কারণে বাবা-মা তাকে একা বাইরে যেতে দেন না। তাই ফুটবল নিয়ে মাঠে ছোটা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মেতে ওঠার বদলে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোট বোনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কার্টুন দেখে সময় কাটে তার।
মাইনুলের মতো ঢাকার বহু শিশু-কিশোরের বিকেল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মাঠ। কোথাও মাঠের জায়গায় উঠেছে বহুতল ভবন, কোথাও মাঠ থাকলেও নেই অবাধে খেলার সুযোগ। অথচ একটি মাঠ শুধু দৌড়ঝাঁপ কিংবা খেলাধুলার জায়গা নয়, এখানেই তৈরি হয় বন্ধুত্ব, দলগত কাজ, নেতৃত্ব, প্রতিযোগিতা ও পরাজয় মেনে নেওয়ার মানসিকতা।
বিজ্ঞাপন
খেলার জায়গা কমে যাওয়ার সঙ্গে সংকুচিত হচ্ছে শিশু-কিশোরদের অবসর ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিসর। গবেষণায় খেলার মাঠের অভাবকে কিশোর গ্যাংয়ের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত কারণগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে মাঠের সংকট একা কোনো কিশোরকে গ্যাংয়ে ঠেলে দেয় না; পরিবার, বন্ধুমহল, সামাজিক পরিবেশ, মাদক, অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাবসহ কাজ করে আরও অনেক কারণ। তাহলে প্রশ্ন হলো- শিশুদের জন্য নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিসর তৈরি করতে না পারলে তাদের শৈশবের সেই শূন্যতা পূরণ করছে কে?
বর্তমান বাস্তবতা বলছে, সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে শহর। বদলেছে পাড়ার মাঠগুলোও। কোথাও উঠেছে উঁচু দালান, কোথাও বসেছে বাজার, কোথাও মাঠের জায়গা নিয়েছে স্থাপনা কিংবা মেলাসহ নানা ধরনের অস্থায়ী আয়োজন। কোথাও মাঠ থাকলেও সেগুলো উন্মুক্ত নয়। ফলে বিকেলের পরিচিত দৃশ্যও বদলে যাচ্ছে। মাঠের পরিবর্তে কিশোরদের দেখা যাচ্ছে অলিগলিতে, চায়ের দোকানের চিপার আড্ডায় কিংবা দীর্ঘ সময় মোবাইল ফোনের পর্দায়।
এ পরিবর্তনের সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে- খেলার মাঠ ও ইতিবাচক বিনোদনের জায়গা কমে যাওয়ার সঙ্গে কি কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার কোনো সম্পর্ক আছে?
বিজ্ঞাপন
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জানা যায়, অনেকগুলো কারণের মধ্যে অন্যতম হলো খেলার মাঠ কমে যাওয়া ও খেলার সুযোগ হারিয়ে ফেলা। কিশোর গ্যাং একটি বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মাদক, বড় ভাই বা সিনিয়রদের প্রভাব, সামাজিক পরিবেশ, অপরাধী গোষ্ঠীর প্রভাব, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কিশোরদের পরিচয় ও স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষা- সবকিছু মিলেই একজন কিশোরকে ‘গ্যাং’-এর দিকে ঠেলে দিতে পারে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাহিদা নাহিদের ১৩ বছর বয়সী কিশোর ছেলে হত্যার শিকার হওয়ার পর ‘কিশোর গ্যাং’র অপ্রতিরোধ্য বিস্তারের বিষয়টি আবারও আলোচনায় উঠে আসে।
সাম্প্রতিক বেশকিছু গবেষণায় খেলার মাঠের অভাবকে কিশোর গ্যাং গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষণায় বড় একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে। সেটা হলো- একটি শহর বা এলাকা যখন তার শিশু-কিশোরদের খেলার জায়গা দিতে পারে না, তখন তাদের অবসর, বন্ধুত্ব ও সামাজিক পরিচয়ের জায়গাটি দখলে নিচ্ছে কে?
বিজ্ঞাপন
সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার
পুলিশ সদর দপ্তরের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। এসব গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ২ হাজার ৫৫০। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ৯৮টি। এছাড়া খুলনা মহানগরে ৭, রাজশাহীতে ১৩, সিলেটে ১৫ ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি গ্যাং আছে। অন্য মহানগর ও বিভিন্ন জেলা শহরেও বেশ কিছু গ্যাং সক্রিয়। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি রয়েছে নোয়াখালীতে ২৫টি।
রাজধানীতে কিশোর গ্যাং ১৫৯টি। এসব কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ১ হাজার ৮১২। এর মধ্যে মোহাম্মদপুরে সর্বোচ্চ ২৭টি কিশোর গ্যাং আছে। এসব গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা সাড়ে ৩০০। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৬টি পল্লবী থানা এলাকায়। এসব কিশোর গ্যাংয়ে সদস্য সংখ্যা ১৬০।
ঢাকায় মাঠের সংখ্যা কত?
বিজ্ঞাপন
রাজধানীর মাঠ সংকটের চিত্র একাধিক গবেষণা ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) এক সমীক্ষায় বলা হয়, নগর পরিকল্পনার মানদণ্ড অনুযায়ী ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতি আধা কিলোমিটার কিংবা তিন থেকে পাঁচ হাজার মানুষের জন্য একটি মাঠ প্রয়োজন। দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন ৩০৫ দশমিক ৪৭ বর্গকিলোমিটার। সে হিসেবে মাঠ প্রয়োজন অন্তত ৬১০টি।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ১২৯টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ আছে মাত্র ২৩৫টি। এর মধ্যে আবার ৪১টি ওয়ার্ডে খেলার কোনো মাঠই নেই। যে ২৩৫টি মাঠ আছে, এগুলোর মাত্র ৪২টি মাঠ সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারে। বাকি মাঠগুলো নানাভাবে দখল হয়ে আছে।
শিশু-কিশোরদের বিকাশে খেলার মাঠের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। ঢাকা শহরে যত সংখ্যক জনসংখ্যা, তাদের জন্য অন্তত এক হাজার মাঠ দরকার। খেলাধুলায় ব্যস্ত হলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা জন্ম নেবে না।- জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, আইপিডির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর ও নগর-পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খেলার মাঠকে একটি এলাকার ‘ফুসফুস’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘শিশু-কিশোরদের বিকাশে খেলার মাঠের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে। ঢাকা শহরে যত সংখ্যক জনসংখ্যা, তাদের জন্য অন্তত এক হাজার মাঠ দরকার। খেলাধুলায় ব্যস্ত হলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনা জন্ম নেবে না।’
মাঠের অপ্রতুলতার চিত্র সারা দেশে প্রায় একই। বিশেষ করে জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে শিশু-কিশোরদের খেলার জন্য মাঠের অনেক বেশি সংকট রয়েছে বলে জানান নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান।
বিজ্ঞাপন
শিশু-কিশোরদের বিকাশের জন্য মাঠের প্রয়োজন কতটা?
শিশু থেকে কিশোর- মানুষের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়। এ বয়সে তারা পরিবার থেকে কিছুটা আলাদা নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়। বন্ধু প্রয়োজন হয়, একটি গোষ্ঠীর অংশ হওয়া, নিজের সক্ষমতা দেখানোর প্রয়োজন হয় এবং নেতৃত্ব দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এ প্রয়োজনগুলো অস্বাভাবিক নয়।
একটি খেলার মাঠ শিশুর সেই স্বাভাবিক চাহিদাগুলোকে ইতিবাচক পথে পরিচালিত করে। যেমন, ফুটবল খেলতে গিয়ে একজন শিশু বা কিশোর দল তৈরি করে। ক্রিকেট খেলতে গিয়ে সে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অধিনায়ক হলে নেতৃত্ব শেখে। হেরে গেলে পরাজয় মেনে নিতে শেখে। প্রতিপক্ষকে সম্মান করতে শেখে। নিয়ম ভাঙলে রেফারির সিদ্ধান্ত মেনে নিতে শেখে।
মাঠ যদি না থাকে এবং খেলতে না পারে তাহলে তো শিশু-কিশোররা ভিন্ন কিছু খুঁজবে। তখন তারা মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তাদের মধ্যে নেতিবাচকতা তৈরি হবে।- বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা
বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভাপতি ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা মনে করেন, মাঠ থাকলে এবং খেলার পরিবেশ তৈরি করলে তো অবশ্যই শিশু-কিশোরদের জন্য ভালো। তিনি বলেন, ‘মাঠ যদি না থাকে এবং খেলতে না পারে তাহলে তো শিশু-কিশোররা ভিন্ন কিছু খুঁজবে। তখন তারা মোবাইল, কম্পিউটার, টিভি স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকে পড়বে। তাদের মধ্যে নেতিবাচকতা তৈরি হবে।’
বিজ্ঞাপন
মাঠে শুধু খেলা হয় না- সামাজিক আচরণও শেখা হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, খেলার মাঠ থেকেই শিশু-কিশোরদের মধ্যে সামাজিকতাবোধ তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের কাজ ছিল বিকেল হলেই ব্যাট-বল নিয়ে মাঠে নেমে পড়া। আবার মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই, বাসায় ফিরে যেতাম। এই যে খেলার মাঠে অনেকগুলো ছেলের সঙ্গে খেলা, বন্ধুত্ব, এতেই আমাদের মধ্যে সামাজিকতাবোধ সৃষ্টি হয়েছে।’
কিন্তু মাঠ না থাকলে শিশু-কিশোরদের এসব প্রয়োজন তো শেষ হয়ে যায় না। সে তখন অন্য জায়গায় বন্ধু খুঁজবে। অন্য কোনো গ্রুপের সঙ্গে পরিচয় তৈরি করবে। সেই গ্রুপ ইতিবাচক হলে সমস্যা নেই। কিন্তু যদি সেই গ্রুপের সংস্কৃতি হয় শক্তি প্রদর্শন, মারামারি, মাদক, চাঁদাবাজি কিংবা অপরাধ- তাহলে কিশোরের স্বাভাবিক ‘দলভুক্ত হওয়ার’ আকাঙ্ক্ষাই তাকে অপরাধী গোষ্ঠীর দিকে নিয়ে যেতে পারে।
পুরো ঢাকা শহরে খেলার মাঠগুলো কোনো না কোনোভাবে দখল হয়ে আছে। তাহলে শিশু-কিশোররা খেলবে কোথায়? তারা যাবে কোথায়, অবসর সময়টাতে কী করবে? তাদের তো খেলার সুযোগ দিতে হবে। খেলতে না পারলে একটা গ্রুপ বাসায় বসে মোবাইল স্ক্রিনে আটকে থাকবে, আরেকটা গ্রুপ বাইরে গিয়ে বখাটেদের সঙ্গে আড্ডা দেবে। এরাই শেষ পর্যন্ত কিশোর গ্যাং তৈরি করে।- অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক
ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা যে মাঠে খেলতাম, সেটা দখল করে তৈরি হয়েছে বহুতল ভবন। এভাবে পুরো ঢাকা শহরে খেলার মাঠগুলো কোনো না কোনোভাবে দখল হয়ে আছে। তাহলে শিশু-কিশোররা খেলবে কোথায়? তারা যাবে কোথায়, অবসর সময়টাতে কী করবে? তাদের তো খেলার সুযোগ দিতে হবে। খেলতে না পারলে একটা গ্রুপ বাসায় বসে মোবাইল স্ক্রিনে আটকে থাকবে, আরেকটা গ্রুপ বাইরে গিয়ে বখাটেদের সঙ্গে আড্ডা দেবে। এরাই শেষ পর্যন্ত কিশোর গ্যাং তৈরি করে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ায়।’
বিজ্ঞাপন
মাঠের অভাবেই তৈরি হচ্ছে কিশোর গ্যাং: গবেষণা
কীভাবে একজন কিশোরকে অপরাধী গোষ্ঠীর দিকে ধীরে ধীরে ধাবিত করে, এ বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরা হয়েছে ২০২৫ সালের ১৮ আগস্ট প্রকাশিত ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়।
জুভেনাইল ডিলিঙ্কুয়েন্সি: আ স্টাডি অন টিনএজ গ্যাং কালচার ইন ঢাকা সিটি (Juvenile Delinquency: A Study on Teenage Gang Culture in Dhaka City) শীর্ষক গবেষণাটি করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম আনোয়ার হোসেন। গবেষণায় কিশোর গ্যাংয়ের কারণ অনুসন্ধানে অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটিতে ‘বিগ ব্রাদার’ বা বড় ভাইয়ের প্রভাব, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক, খেলার মাঠের অভাব এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতাকে ‘গ্যাং’ গঠনের উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণাটির আরও একটি পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার বিষয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সেখানে বলা হয়েছে, মাঠের অভাবে কিছু কিশোর রেস্টুরেন্ট, সিসা বারসহ বিভিন্ন জায়গায় সময় কাটায়। অর্থাৎ, খেলার জন্য নিরাপদ জায়গার অনুপস্থিতিতে বিনোদনের অন্য জায়গাগুলো তাদের অবসর কাটানোর বিকল্প পরিসর হয়ে উঠছে।
কীভাবে কিশোররা গ্যাংয়ে যুক্ত হয়?
২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ঢাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ে সায়েন্টিফিক পাবলিশিং ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ফ্যাক্টরস অভ জুভেনাইল গ্যাং কালচার ইন বাংলাদেশ: অ্যান ইনভেস্টিগেটিভ স্টাডি ইন ঢাকা (Factors of juvenile gang culture in Bangladesh: An investigative study in Dhaka) শীর্ষক আরেকটি গবেষণায় গ্যাংয়ে যুক্ত হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক সুবিধা, উত্তেজনা, পরিচয় প্রকাশ, নিরাপত্তা ও বন্ধু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি করেন মাওলানা ভাসানী সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব ক্রিমিনোলোজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক।
একই গবেষণায় ব্যক্তি, পরিবার, বন্ধু ও কমিউনিটি- চার স্তরের ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে। কম আত্মমর্যাদাবোধ, পূর্বের অপরাধপ্রবণতা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অভিভাবকের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, নেতিবাচক বন্ধু এবং অপরাধপ্রবণ এলাকায় বসবাস- এসব ঝুঁকির কথা গবেষণায় উঠে এসেছে।
খেলাধুলা ও সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ দিলে কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা অনেকটা কমে আসবে। কিশোর গ্যাং শুধু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন যত দৃঢ় করা যাবে, তত শিশু-কিশোরদের মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হবে। তারা সমাজের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, অপরাধ প্রবণতার দিকে ধাবিত হবে না।- অধ্যাপক ড. ওমর ফারুক
এ বিষয়ে কথা হলে গবেষক ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘খেলাধুলা ও সুষ্ঠু বিনোদনের সুযোগ দিলে কিশোর গ্যাংয়ে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা অনেকটা কমে আসবে। কিশোর গ্যাং শুধু আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধন যত দৃঢ় করা যাবে, তত শিশু-কিশোরদের মানসিক দৃঢ়তা তৈরি হবে। তারা সমাজের মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত থাকবে, অপরাধ প্রবণতার দিকে ধাবিত হবে না।’
খেলার সুযোগ তৈরি করতে পারলে একটি শিশু অনেক বেশি পজিটিভ মানসিকতা নিয়ে বড় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চাইল্ড লিডারশিপ বা নেতৃত্বের যোগ্যতা গড়ে ওঠে তাদের মধ্যে। আর যদি খেলার পরিবেশ না পায়, কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে যায়, তাহলে তাদের সেই লিডারশিপের সম্ভাবনা বড় ভাই কিংবা রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে অপব্যবহার হয়।’
‘বড় ভাই’ বনাম ‘কোচ’
কিশোর গ্যাং নিয়ে এনডিসির গবেষণা প্রবন্ধে ‘বিগ ব্রাদার’ বা বড় ভাইয়ের প্রভাবের কথা এসেছে। এ বিষয়েই দারুণ একটি সামাজিক তুলনা তুলে আনা যায়। একজন কিশোরের সামনে যদি থাকে একজন কোচ, যিনি তাকে বলেন- সময়মতো মাঠে এসো, নিয়ম মানো, সতীর্থকে সম্মান করো, অনুশীলন করো, হেরে গেলে আবার চেষ্টা করো। অন্যদিকে যদি থাকে একজন অপরাধপ্রবণ বড় ভাই, যিনি তাকে বলেন- আমার সঙ্গে থাকো, এলাকায় তোমার পরিচয় তৈরি হবে, শক্তি দেখাতে পারবে- তাহলে কিশোর কোন পরিবেশ বেছে নেবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তার পরিবার, সমাজ ও বিকল্প সুযোগের ওপর।
শিশু বা কিশোরদের যখন আপনি মাঠে এনে একজন কোচের অধীনে দেবেন, তখন সেখানে সে শিখবে শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা। তার মধ্যে তৈরি হবে জয়ের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিপক্ষ বা পরাজিতকে সম্মান করার অভ্যাস। হেরে গেলে পরের খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে।- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম আনোয়ার হোসেন
এনডিসির গবেষক (বর্তমানে আর্মি হেডকোয়ার্টারে ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম আনোয়ার হোসেন এ নিয়ে জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড় ভাই সংস্কৃতি কিশোর গ্যাংকে বেশি প্রভাবিত করে। এলাকার রাজনৈতিক নেতা, উঠতি সন্ত্রাসীরা বড় ভাই হিসেবে কিশোরদের নেতৃত্ব দেন। যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়, ইচ্ছামতো অপরাধ করা যায়, বিনাশ্রমে টাকা উপার্জন করা যায়। গ্যাংয়ে জড়িত কিশোররা এসব বড় ভাইকে অনুসরণ করে। কিন্তু শিশু বা কিশোরদের যখন আপনি মাঠে এনে একজন কোচের অধীনে দেবেন, তখন সেখানে সে শিখবে শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা। তার মধ্যে তৈরি হবে জয়ের আকাঙ্ক্ষা, প্রতিপক্ষ বা পরাজিতকে সম্মান করার অভ্যাস। হেরে গেলে পরের খেলার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করবে।’
মাঠের অভাবে শারীরিক পরিশ্রমও কমছে
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন পরিচালিত চিকিৎসা বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান এবং স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক গবেষণাপত্র ও নিবন্ধের ফ্রি অনলাইন ডাটাবেজ ‘পাবমেড’ ২০১৭ সালে ঢাকার কিশোরদের শারীরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করে। প্যাটার্নস অ্যান্ড কোরেলেটস অব ফিজিক্যাল অ্যাক্টিভিটি ইন অ্যাডোলেসেন্টস ইন ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ (Patterns and correlates of physical activity in adolescents in Dhaka city, Bangladesh) শীর্ষক ওই গবেষণায় ১৩ থেকে ১৭ বছর বয়সী ৭৯৮ শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ করা হয়। যেখানে দেখা যায়, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী পর্যাপ্ত শারীরিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিচ্ছে না। ছেলেদের ক্ষেত্রে স্কুলে মাঠ থাকা এবং খেলাধুলার সুযোগ শারীরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে সম্পর্কিত ছিল। মেয়েদের ক্ষেত্রে স্কুল স্পোর্টসেও ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া যায়।
ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘একটা শহরকে সুন্দর করে গড়ে তোলা এবং বাসযোগ্য করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো খেলার মাঠ। যেখানে শিশু-কিশোররা নিয়মিত খেলবে, শরীরচর্চা করবে। তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভালো হবে। এমনকি মেয়েদের জন্যও আলাদা মাঠ রাখা প্রয়োজন।’
অর্থাৎ মাঠ হারানোর ক্ষতি শুধু স্বাস্থ্যগত নয়, সামাজিকও।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘একজন শিশু বা কিশোর যদি খেলতে না পারে, মাঠ না থাকে, তাহলে তার শরীর এবং মনও ভালো থাকবে না। শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা অত্যাবশ্যকীয় করে দেওয়া দরকার। সে খেলতে পারুক আর না পারুক, মাঠে যাবে, সবার সঙ্গে মিশবে, তাতে নেতিবাচক সঙ্গ তৈরি হবে না, শিশু-কিশোরদের মধ্য থেকে অপরাধপ্রবণতাও কমে আসবে।’
রাস্তার মোড় কিংবা পাশের গলি কি মাঠের বিকল্প?
মাঠ হারিয়ে গেলে কিশোর কোথায় যায়? ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় এর উত্তর খুঁজতে গেলে উঠে আসছে রাস্তার মোড়, চায়ের দোকান, গ্যারেজের সামনে, মার্কেটের আশপাশ, শপিংমল কিংবা বিভিন্ন খাবারের দোকানের কথা।
এনডিসির জার্নালে প্রকাশিত গবেষণার একটি অংশেও মাঠের অভাবে কিশোরদের রেস্টুরেন্ট ও অন্য বিনোদনকেন্দ্রে সময় কাটানোর কথা উঠে এসেছে। যদিও রেস্টুরেন্টে বন্ধুর সঙ্গে বসা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু একটি কিশোরের যদি নিয়মিত ও দীর্ঘ সময় কাটানোর জন্য নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কমিউনিটিভিত্তিক কোনো পরিসর না থাকে, তাহলে নেতিবাচক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আমাদের যে ভয়াবহ কিশোর গ্যাং ঢাকা শহরে, বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে এটা থেকে মুক্ত হতে হলে তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন। শুধু তাদের দোষ দিলে হবে না। তাদের আমরা কোনো স্পেস দিতে পারছি না। ফুটবল মাঠ নেই, ক্রিকেট মাঠ নেই। তারা চলে যাচ্ছে বিভিন্ন আনাচে-কানাচে আর গ্রামাঞ্চলে বাগানের ভেতরে গিয়ে গাঁজা, মদের নেশা করছে। কারণ কি? তাদের ভেতরে হতাশা।- পুলিশের আইজি মো. আলী হোসেন ফকির
সম্প্রতি একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুলিশের আইজি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, ‘আমাদের যে ভয়াবহ কিশোর গ্যাং ঢাকা শহরে, বিশেষ করে বড় বড় শহরগুলোতে এটা থেকে মুক্ত হতে হলে তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজন। শুধু তাদের দোষ দিলে হবে না। তাদের আমরা কোনো স্পেস দিতে পারছি না। ফুটবল মাঠ নেই, ক্রিকেট মাঠ নেই। তারা চলে যাচ্ছে বিভিন্ন আনাচে-কানাচে আর গ্রামাঞ্চলে বাগানের ভেতরে গিয়ে গাঁজা, মদের নেশা করছে। কারণ কি? তাদের ভেতরে হতাশা।’
মোবাইল কি মাঠের জায়গা নিচ্ছে?
মাঠের সংকটের সঙ্গে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে- ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার। মোবাইল ফোন, অনলাইন গেম, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিশোরদের অবসর কাটানোর ধরন বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু বাস্তব জীবনের খেলাধুলা, বন্ধুত্ব ও সামাজিকতার জায়গা যদি ক্রমশ সংকুচিত হয়, তাহলে দীর্ঘ সময় স্ক্রিননির্ভরতা বাড়তে পারে।
এনডিসির গবেষণায়ও ইলেকট্রনিক যোগাযোগমাধ্যমের সহজলভ্যতাকে কিশোর গ্যাং গঠনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখানে সমাধান ‘মোবাইল নিষিদ্ধ করা’ নয়। সমাধান হলো মোবাইলের পাশাপাশি বাস্তব জীবনে আরও আকর্ষণীয় বিকল্প তৈরি করা।
একজন কিশোরকে যদি বলা হয়, ‘ফোন ব্যবহার কোরো না’, কিন্তু তার সামনে কোনো মাঠ নেই, ক্লাব নেই, প্রশিক্ষণ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই- তাহলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে তাকে দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পথে রাখা কঠিন।
কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি তো আর একদিন-দুদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সমাজ ভাঙছে, শিশু-কিশোররা সুষ্ঠু কোনো শৈশব পাচ্ছে না। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে সব সিঙ্গেল পরিবারে পরিণত হচ্ছে। শিশুরা তো ভালো কিছু পাচ্ছে না। যে কারণে তারা ডিভাইসনির্ভর হচ্ছে।- ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা
ব্যারিস্টার সারওয়াত সিরাজ শুক্লা বলেন, ‘কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি তো আর একদিন-দুদিনে তৈরি হয়নি। আমাদের সমাজ ভাঙছে, শিশু-কিশোররা সুষ্ঠু কোনো শৈশব পাচ্ছে না। একান্নবর্তী পরিবারগুলো ভেঙে সব সিঙ্গেল পরিবারে পরিণত হচ্ছে। শিশুরা তো ভালো কিছু পাচ্ছে না। যে কারণে তারা ডিভাইসনির্ভর হচ্ছে। ধীরে ধীরে যখন সে বাইরের জগতের সঙ্গে মেশে তখন নিজের ভাব প্রকাশ করা, পরিচয় তৈরি কিংবা বন্ধুত্ব তৈরি করার জন্য কাউকে বেছে নেয়। একসময় ধীরে ধীরে কোনো গ্রুপের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। সেটাই তখন তার কাছে ভালো লাগে, হোক সেটা খারাপ কোনো কিছু।’
যা বলছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা
আইডিয়াল স্কুল, বনশ্রী শাখার চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র রবিন (ছদ্মনাম)। বাবার হাত ধরে এসেছে স্কুলে। স্কুল গেটে কথা হলে রবিন জানায়, তার প্রিয় খেলা ক্রিকেট। কিন্তু খুব বেশি খেলার সুযোগ পায় না। বিকেল হলে বাসার সামনে রাস্তার ওপর খুব ছোট পরিসরে পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে কিছুক্ষণ বল নিয়ে খেলে। তার বাবা হাসান পারভেজ বলেন, ‘বাসার আশপাশে কোনো খেলার জায়গা নেই। যে কারণে বড় জায়গায় খেলতে পাঠাতে পারি না। বাসার সামনে ছোট্ট রাস্তাটাই ওদের ভরসা।’
একই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র রিফাত (ছদ্মনাম) জানায়, বাসার কাছাকাছি একটি বালুর মাঠ আছে। কিন্তু খেলাধুলার উপযোগী নয়। যে কারণে কেউ ওটাতে যায় না। বাসার সামনে ছোট্ট রাস্তায় মাঝে-মধ্যে খেলা হয়। তবে অধিকাংশই দিনই কাটে বাসায়, মোবাইলে গেমস খেলে।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রাব্বির (ছদ্মনাম) বাসা আফতাবনগরে। বিকেল হলেই আফতাবনগর এল ব্লকের মাঠে বল নিয়ে চলে যায় বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে। তার বাবা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার ছেলে ভাগ্যবান, বাসার কাছে একটি খেলার মাঠ পেয়েছে। বিকেল হলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যায়, সন্ধ্যা হলেই বাসায় ফেরে। সুন্দর শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন। খেলার সুযোগ পাওয়ার কারণে আজে-বাজে বন্ধু নেই তার। শরীর-মনও ভালো থাকে।’
বনশ্রী আইডিয়াল স্কুল থেকে চারটি রোড পরই নিবরাস মাদরাসা। কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের মাদরাসায় (তিনটি শাখা মিলিয়ে) সাত হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলছে কয়েকটি ফ্ল্যাটবাড়ি ভাড়া করে। খেলার কোনো মাঠ তো নেই। ছুটির পর শিশু-কিশোররা যখন বেরিয়ে আসে তখন তাদের দেখা যায় ঘর্মাক্ত, বিরক্ত, অসহিষ্ণু।
এই মাদরাসার চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীর মা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘শিশু-কিশোররা তো খেলারই সময় পায় না। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর প্রাইভেট, এরপর ক্লাস, বিকেলে কোচিং, সন্ধ্যায় টিউটর- নিশ্বাস ফেলারই তো সুযোগ পাচ্ছে না এখনকার বাচ্চারা। আবার সপ্তাহে ছুটির দিনগুলোতে নানা এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাকটিভিটিজ। আমরা সত্যিকারার্থে বাচ্চাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছি। বিনিময়ে পাচ্ছি অসহিষ্ণু, অসামাজিক একটা প্রজন্ম। এদেরই অনেকে চাপ সহ্য করতে না পেরে বাইরের সঙ্গ বেছে নেয়। যাদের অনেকেই জড়িয়ে যায় কিশোর গ্যাংয়ে।’
কিশোরদের মাঠে ফেরাতে করণীয় কী?
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) সায়েদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা ও ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত খেলার মাঠের সংকটের কারণে বর্তমান প্রজন্ম বিভিন্ন অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। সামাজিকভাবে এসব শিশু-কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখতে হলে খেলার মাঠের বিকল্প নেই। খেলার মাঠের দিকে শিশু-কিশোরদের ধাবিত করতে হবে।’
গবেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এসএম আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘খেলার মাঠ পুনরুদ্ধার করতে হবে। খেলার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন খেলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা প্রয়োজন। শুধু ফুটবল-ক্রিকেটই নয়, দেশীয় নানা খেলার প্রতিযোগিতা আয়োজন করা যেতে পারে। তাতে এলাকার বড়রা স্পন্সর করবে। সমাজের মধ্যে একটা সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হবে। এভাবেই কমে আসবে কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি।’
কিশোররা নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে চায়। খেলার মাঠে গেলে ভালো বন্ধু গড়ে ওঠে। খেলতে গিয়ে টিম ওয়ার্ক তৈরি হয়। যেখান থেকে নেতৃত্ব দিতে শেখে। জয়-পরাজয় মেনে নিতে শেখে। কিন্তু পরিচয় তৈরির সুযোগই যদি না থাকে, তাহলে তারা তো ভিন্ন পথে যাবেই!- নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘কিশোররা নিজের পরিচয় তৈরি করতে চায়। বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে চায়। খেলার মাঠে গেলে ভালো বন্ধু গড়ে ওঠে। খেলতে গিয়ে টিম ওয়ার্ক তৈরি হয়। যেখান থেকে নেতৃত্ব দিতে শেখে। জয়-পরাজয় মেনে নিতে শেখে। কিন্তু পরিচয় তৈরির সুযোগই যদি না থাকে, তাহলে তারা তো ভিন্ন পথে যাবেই!’
মাঠের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সম্পত্তি কর্মকর্তা ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট হাছিবা খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে যে মাঠগুলো দখল করে রাখা হয়েছে, সেগুলো দখলমুক্ত করার জন্য আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। শুধু দখলমুক্ত করাই নয়, সেগুলো খেলার উপযোগী করার জন্য সিটি করপোরেশন কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়া যেখানেই কেউ দোকান বসাচ্ছে, মেলা করছে বা কোনো না কোনোভাবে দখলের চেষ্টা করছে, তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অভিযান চালাচ্ছি।’
তবে নতুন মাঠ তৈরি করার জন্য দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে পর্যাপ্ত জায়গা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, তবুও প্রধানমন্ত্রী প্রশাসক মহোদয়কে নিয়ে বৈঠক করেছেন। নতুন মাঠ তৈরির বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অচিরেই হয়তো এর বাস্তবায়ন দেখতে পাবেন।’
শুধু ‘মাঠ’ নয়, দরকার ‘খেলার পরিবেশ’ও
শুধু মাঠ সংরক্ষণ করলেই হবে না। ২০২৬ সালের সেভ দ্য চিলড্রেনের অ্যাকসেসিবল, সেইফ, অ্যান্ড প্লেইএবল? আরবান ওপেন স্পেসেস অ্যান্ড দেয়ার স্যুটেবিলিটি ফর চিলড্রেন ইন ঢাকা সিটি (বাংলাদেশ, ২০২৬) (Accessible, Safe, and Playable? Urban Open Spaces and Their Suitability for Children in Dhaka City (Bangladesh, 2026) শীর্ষক একটি গবেষণায় শুধু মাঠের সংখ্যা নয়, মাঠের নিরাপত্তা, খেলা যোগ্যতা, অন্তর্ভুক্তি ও ব্যবস্থাপনা- এসব বিষয়ও বিবেচনা করেছে। গবেষণাটি দেখিয়েছে, কাগজে কোনো জায়গা খেলার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও বাস্তবে সেটি শিশুদের জন্য ব্যবহারযোগ্য নাও হতে পারে। নিরাপদ যাতায়াত, খেলাযোগ্য পরিবেশ, অন্তর্ভুক্তি ও ব্যবস্থাপনা- সবকিছুর প্রয়োজন।
ব্যারিস্টার শুক্লা বলেন, ‘মাঠগুলো যত বেশি কাজে লাগানো যাবে, তত বেশি শিশু-কিশোররা মাঠমুখী হবে। আমরা হয়তো খুব স্বল্প সময়ে এর সুফল দেখতে পাবো না। তবে ধীরে ধীরে সমাজ আবার সুষ্ঠু হবে, শিশু-কিশোররা কিশোর গ্যাং, মাদকের মতো মারাত্মক অপরাধের সঙ্গে জড়াবে না।’
খেলাধুলা কি গ্যাং ঠেকাতে পারে?
খেলাধুলা একা কোনো কিশোর গ্যাং সমস্যা সমাধান করতে পারবে- এমন দাবি কেউ করেননি কিংবা কোনো গবেষণা বলা হয়নি। কিন্তু খেলাধুলা একটি কার্যকর প্রতিরোধমূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। কারণ খেলাধুলা কিশোরের সময়কে কাঠামোবদ্ধ করে।
প্রতিদিনের দীর্ঘ অবসর যদি কোনো ইতিবাচক কাঠামোর মধ্যে না থাকে, তাহলে সে সহজেই অন্য ধরনের আড্ডায় যুক্ত হতে পারে। এখানে ‘অবসর’ নিজে সমস্যা নয়। সমস্যা হলো অর্থবহ অবসর ব্যবহারের সুযোগের অভাব।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘একজন শিশু বা কিশোর যদি খেলতে না পারে, মাঠ না থাকে, তার মধ্যে যদি নৈতিক শিক্ষা গড়ে না ওঠে এবং তার শরীর ও মন সুষ্ঠুভাবে গড়তে না পারলে জীবনটাই বৃথা। এর ফলে শিশু-কিশোরদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়বে কিশোর গ্যাংয়ে। খেলার মাঠ যত দেবেন, খেলার সুযোগ যত পাবে, তত কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি কমে আসবে। এজন্য শিশু-কিশোরদের জন্য খেলাধুলা অত্যাবশ্যকীয় করে দেওয়া দরকার।’
খেলাধুলার অ্যাক্টিভিটি কমে গেলে অলস মস্তিষ্ক মানুষকে নেতিবাচক দিকে ধাবিত করে। খেলাধুলার সুযোগের অভাবে কিশোরদের অনেকে কিশোর গ্যাং বা অপরাধে জড়ায়। স্কুলে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার সরকারি পদক্ষেপ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি। খেলাধুলায় কিশোরদের যত বেশি যুক্ত করা যাবে, তত তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক থেকে দূরে থাকবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।- বিকেএসপি মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ
বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইফ উল্লাহ বলেন, ‘খেলাধুলার অ্যাক্টিভিটি কমে গেলে অলস মস্তিষ্ক মানুষকে নেতিবাচক দিকে ধাবিত করে। খেলাধুলার সুযোগের অভাবে কিশোরদের অনেকে কিশোর গ্যাং বা অপরাধে জড়ায়। স্কুলে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার সরকারি পদক্ষেপ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করি। খেলাধুলায় কিশোরদের যত বেশি যুক্ত করা যাবে, তত তারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ও মাদক থেকে দূরে থাকবে- এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
মাইনুলের ফুটবল খেলার ইচ্ছা আছে, রবিনের আছে ক্রিকেট খেলার আগ্রহ। তাদের চাওয়া খুব আলাদা নয়— একটু জায়গা, কিছু বন্ধু আর নিশ্চিন্তে খেলার সুযোগ।
এ সুযোগটি না থাকলে একটি শিশু হয়তো মোবাইলের পর্দায় হারিয়ে যায়, কেউ রাস্তার আড্ডায় সময় কাটায়, কেউ আবার খুঁজে নেয় এমন কোনো দল, যেখানে পরিচয়, বন্ধুত্ব কিংবা ক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ আছে। এর কোনোটিই কিশোর গ্যাংয়ের একমাত্র কারণ নয়। কিন্তু নিরাপদ ও ইতিবাচক পরিসরের অভাব যে ঝুঁকি বাড়াতে পারে, গবেষণা ও মাঠের বাস্তবতা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তাই কিশোরদের অপরাধ থেকে দূরে রাখার আলোচনা শুধু পুলিশি অভিযান কিংবা শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাদের জন্য মাঠ, খেলাধুলা, প্রশিক্ষক, বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ ও অংশগ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ একটি মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু খেলার জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া নয়- মাইনুলদের শৈশবের একটি অংশ ফিরিয়ে দেওয়া।
আইএইচএস/এএসএ/ এমএফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
