অনলাইন ডেস্ক
রাজধানীর কোথাও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা মিছিল বা জমায়েত করতে না পারে, সে বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) কঠোর সতর্ক করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কোনো এলাকায় এমন ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট ওসি ও উপ-পুলিশ কমিশনারকে (ডিসি) জবাবদিহির আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভা বা ক্রাইম কনফারেন্সে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়। আগস্ট মাসের অপরাধ পরিস্থিতি পর্যালোচনার পাশাপাশি সামনের দিনগুলোতে রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের করণীয় নিয়ে আলোচনা হয়।
সভায় বলা হয়, কোনো মিছিল বা জমায়েত হওয়ার পর অভিযান চালালেই পুলিশের দায়িত্ব শেষ হবে না। সম্ভাব্য জমায়েত ও অপতৎপরতা সম্পর্কে আগাম গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণকে গুরুত্ব দিতে হবে।
গুলশানে সম্প্রতি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আকস্মিক মিছিলের ঘটনাও সভায় গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা গুলশান বিভাগের উপকমিশনার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ওই ঘটনায় কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তাকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি। বরং তথ্যের ঘাটতি কোথায় ছিল এবং ভবিষ্যতে কীভাবে আগাম প্রস্তুতি আরও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সভায় জানানো হয়, গুলশানের ওই মিছিলের বিষয়ে পুলিশ মাত্র আট মিনিট আগে গোয়েন্দা তথ্য পেয়েছিল। এরপর গুলশান থানা পুলিশ মিছিল ঠেকাতে তৎপর হলেও এত অল্প সময়ে বড় জমায়েত নিয়ন্ত্রণে প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ডিএমপির কর্মকর্তারা জানান, ভবিষ্যতে কোনো থানার এলাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে শুধু গোয়েন্দা সংস্থার ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়া যাবে না। সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ও জোনের ডিসিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক দায়িত্ব নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে গাফিলতি বা অপারেশনাল ঘাটতি পাওয়া গেলে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ সভায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা বা অপেশাদার আচরণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। এক কর্মকর্তা বলেন, কমিশনারের বার্তা ছিল—‘যে জায়গায় কাজ হবে না, সেই জায়গায় পরিবর্তন।’
সভায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সম্ভাব্য মিছিল, জমায়েত বা নাশকতার তথ্য পেলে তা দ্রুত মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকানোর নামে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতীতে সম্পৃক্ততা বা সমর্থনের পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। মিছিলে সরাসরি অংশগ্রহণের সুনির্দিষ্ট তথ্য, ছবি, ভিডিও ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজধানীর প্রবেশপথ, গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও রাতের চেকপোস্টে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবাসিক ও অন্যান্য হোটেলে অবস্থানকারীদের তথ্য সংগ্রহ, নতুন ও পুরোনো ভাড়াটিয়ার তথ্য হালনাগাদ এবং সন্দেহজনক সাবলেট ও অস্থায়ী আবাসের বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করে জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় নাগরিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো এলাকায় অপরিচিত ব্যক্তির সন্দেহজনক চলাচল বা কর্মকাণ্ড নজরে এলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর পরিবেশ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সভায় থানায় ওসিদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়। ডিউটির সময়ে ওসিদের থানায় অবস্থান করতে হবে এবং জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলে জিডিতে বিষয়টি উল্লেখ করে দায়িত্ব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে বুঝিয়ে দিতে হবে। দায়িত্বে গাফিলতি, বিশৃঙ্খলা বা অপেশাদার আচরণ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করতে হবে।
এ ছাড়া ছিনতাই ও কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার, অপরাধপ্রবণ এলাকায় নিয়মিত টহল এবং কোনো এলাকায় নিরাপত্তার শূন্যতা তৈরি না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গুলশানের সাম্প্রতিক মিছিলের ঘটনায় ডিবি ও থানা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সভায় জানানো হয়। তাঁদের মধ্যে ঢাকার বাইরে থেকে আসা কয়েকজনও রয়েছেন বলে কর্মকর্তারা জানান।
