কালবেলা · আন্তর্জাতিক
হুতিদের হামলার জেরে বিপাকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন
১৩/১০/২০২৬

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদার হওয়ায় লোহিত সাগরে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিজেদের সামুদ্রিক মিশন শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। তবে সদস্য দেশগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহায়তা মিলছে না। এখন পর্যন্ত নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম একটি করে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহপথের নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপের সীমিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নতুন করে সামনে এসেছে। খবর ইউরো নিউজের।
লোহিত সাগরে নৌ চলাচল সুরক্ষায় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘অ্যাসপিডিস’ নামে নৌ অভিযান শুরু করে ইইউ। ইতালি এ মিশনের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে নেতৃত্ব দিচ্ছে। তবে অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজের ব্যবস্থা খুব একটা হয়নি। এর মধ্যেই অঞ্চলটির নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে।
সোমবার ইইউর পররাষ্ট্রবিষয়ক কাউন্সিলের বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে জোটটির পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস বলেন, ‘আমাদের অন্তত ১০টি জাহাজ প্রয়োজন, কিন্তু আমরা এখনো সেই অবস্থানে পৌঁছাইনি। তবে আজ কয়েকটি সদস্য দেশের কাছ থেকে শুনেছি, এ নিয়ে আলোচনা চলছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযানের জন্য যে জাহাজগুলো প্রয়োজন, সেগুলো যেন পাওয়া যায়, সেটিই আশা করছি। কারণ, এ অঞ্চলে বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখতে চাইলে আমাদের একটি কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য মিশন থাকতে হবে।’
গত ১৯ সেপ্টেম্বর ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাজধানীতে চিঠি পাঠিয়ে অতিরিক্ত নৌ ও আকাশপথের সামরিক সরঞ্জাম দেওয়ার আহ্বান জানান কালাস। জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে ইইউর উপস্থিতি জোরদার করাই ছিল এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
ইতালির অনুরোধের পর এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর আগে ইয়েমেন উপকূলে একটি ইতালীয় বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যেতে হয়েছিল দেশটির একটি ফ্রিগেটকে। অ্যাসপিডিস অভিযান চালু হওয়ার পর থেকে লোহিত সাগরে শত শত জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিরা সৌদি আরবে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর আক্রান্ত হয়। এতে মোট ১৪ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।
ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বেড়ে যাওয়ায় অ্যাসপিডিস মিশন গঠন করা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়েমেনের পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো হুমকির মুখে পড়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ন্যাশনাল’-কে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো বলেন, অন্য ইইউ দেশগুলোও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিলে রোম এ মিশনে নিজেদের অবদান বাড়াতে প্রস্তুত।
ক্রোসেত্তো বলেন, ‘হরমুজে শুরু হওয়া এবং এখন বাব আল-মান্দেবে ছড়িয়ে পড়া সংকট ইউরোপীয় অর্থনীতি ও নাগরিকদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে। তাই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় ইউরোপের এখন পর্যন্ত ভূমিকার চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।’
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ইতালি ইরানের বিমান হামলার পর উপসাগরীয় দেশগুলোকে সামরিক সহায়তা দিয়েছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং রাডার সরঞ্জাম পাঠিয়েছে দেশটি।
অ্যাসপিডিস মিশনের মূল তিনটি যুদ্ধজাহাজ সরবরাহ করে ইতালি ও গ্রিস। এ ছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম পালাক্রমে জাহাজ পাঠায়। ফলে যে কোনো সময়ে মিশনে সক্রিয় যুদ্ধজাহাজের সংখ্যা পরিবর্তিত হয়।
নেদারল্যান্ডস একটি ফ্রিগেট পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে জাহাজটি মূল অভিযানের অংশ হিসেবে নয়, সহযোগী ভূমিকায় থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহে কাজ করবে। বেলজিয়াম তাদের দুটি ফ্রিগেটের একটি ‘লিওপোল্ড-১’ পাঠাবে। তবে কারিগরি সমস্যার কারণে জাহাজটি আগামী বছরের আগে মিশনে যোগ দিতে পারবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার হাইব্রিড হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় কিছু সদস্য দেশ বাল্টিক ও কৃষ্ণসাগরে নিজেদের যুদ্ধজাহাজ রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। এতে ইইউর সামরিক সক্ষমতা যে একাধিক অঞ্চলে চাপের মুখে রয়েছে, তা স্পষ্ট হয়েছে।
ইউরো নিউজের দেখা ইইউর ‘বার্ষিক প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি প্রতিবেদন ২০২৬’-এর গোপন মূল্যায়ন অনুযায়ী, সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় জোটটির গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান বিনিয়োগের মাধ্যমে এসব ঘাটতি পূরণ হতে ২০৩০ সালের পর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কালাস বলেন, ‘সদস্য দেশগুলো সম্প্রতি যে জাহাজ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে, তাকে আমি স্বাগত জানাই। তবে লোহিত সাগর সচল রাখতে আরও জাহাজ প্রয়োজন; এটি স্পষ্ট। এটি ইউরোপের কৌশলগত স্বার্থের বিষয়।’
সূত্র : ইউরো নিউজ
মূল প্রতিবেদনে যান ↗