বামাকালী নিরঞ্জনের পথে। ছবি: এই সময়
Published on
:
3 min read
নিলয় ভট্টাচার্য
ভক্তদের কাঁধে চড়ে নাচেন বামাকালী। ফি বছর কালীপুজো এলে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো সেই দৃশ্য। প্রদীপ, মোম, হ্যাজাকের আলোয় অপূর্ব কালীর অপূর্ব সে রূপ। সোশ্যাল মিডিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভিউজ তো হয়ই, বামাকালীর এই নাচ দেখতে ফি বছর নদিয়ার শান্তিপুরে হাজির হন বহু মানুষ। তবে চোরবাগান সর্বজনীনে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনার পরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা বামাকালীর পুজো কমিটির। মায়ের সেই নাচের স্থান পরির্বতন করা হলো।
এ বার ভিড় সামলাতে এবং নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পরিবর্তন করা হলো নাচের স্থান। কলকাতার চোরবাগানে সপ্তমীর দিন যে ঘটনা ঘটেছে, তার পরেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে খবর।
এক নজরে
চোরবাগানের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরে শান্তিপুরের ঐতিহ্যবাহী বামাকালীর নাচের স্থান বড়বাজার চৌরাস্তার মোড় থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো বেজপাড়ার মাঠে।
দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে ও দুর্ঘটনা এড়াতে পুজো কমিটি এবং জেলা প্রশাসন যৌথ ভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
জাগ্রত এই কালীর পুজোয় কোনও কৃত্রিম বিদ্যুতের আলো ব্যবহার করা হয় না; প্রদীপ, মোমবাতি, হ্যাজাকের স্নিগ্ধ আলোতেই দেবীর পুজো ও নিরঞ্জন সম্পন্ন হয়।
১৯৬৯ সালে প্রথম ঘটপুজো এবং ১৯৭০ সাল থেকে প্রতিমা পুজো শুরু হয়। যমুনা চৌধুরী স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর প্রথমে 'যমুনাকালী' নামে এই পুজোর সূচনা হলেও পরবর্তীতে এটি 'বামাকালী' নামে পরিচিতি লাভ করে।
কালীপুজোর ঠিক পরের দিন বাঁশের মাচায় দেবীকে কাঁধে নিয়ে ঢাকের তালে ভক্তরা নাচতে নাচতে নিরঞ্জনের পথে এগিয়ে যান, যা দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেন।
গত বছর পর্যন্ত শান্তিপুরের বড়বাজার ঘাট চৌরাস্তার মোড়ে বামাকালীর সেই নাচ হতো। এ বার হবে বেজপাড়ার মাঠে। ভিড়ের কারণে গত বছরই অল্প সময়ের জন্য নাচের আয়োজন করা হয়েছিল। এ বার সব দিক মাথায় রেখেই বড়বাজার চৌরাস্তা থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে বেজপাড়ার মাঠে নাচানো হবে বামাকালীকে। সেই প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে মন্দির ও মাঠ পরিদর্শন করেন প্রশাসনের আধিকারিকরা।
উদ্যোক্তারা জানান, ১৯৬৯ সালে প্রথম বামাকালীর ঘটপুজো শুরু হয়। ১৯৭০ সাল থেকে শুরু হয় প্রতিমা পুজো। প্রথমে এই কালী যমুনাকালী নামে পরিচিত ছিলেন। যমুনা চৌধুরী স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পরে পুজোর প্রচলন শুরু করেন বলে জানা যায়। পরবর্তীতে নাম হয় বামাকালী।
ভক্তদের বিশ্বাস, এই দেবী খুবই জাগ্রত। এই কালীপুজোয় বিদ্যুতের আলোর ব্যবহার নেই। কথিত আছে, মোম, প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোই মায়ের পছন্দ। সঙ্গে একটি মশালও জ্বলে। প্রতি বছর নিয়ম মেনে কালীপুজোর ঠিক পরের দিনই নিরঞ্জন হয় এই প্রতিমার।
ঢাক, ঢোল, কাঁসর, ঘণ্টা বাজে। হাজার হাজার ভক্ত নামেন পথে। এ রকমই কিছু ভক্তের কাঁধে চড়ে এগিয়ে আসেন মুক্তকেশী। ডান হাতে খড়্গ, বাঁ হাতে নরমুণ্ড। এক হাতে ঝোলে চাঁদমালা। মায়ের পায়ের কাছে যাঁরা থাকেন, হাতে প্রদীপ। কালো মেয়ের পায়ের তলায় আলোর নাচন। সেই প্রদীপের আলোতেই জ্বল জ্বল করে বামাকালীর চোখ। সে চোখে আগুন আছে, আছে অভয়ও। অপূর্ব সে মুখ।
বাঁশের মাচায় করে বামাকালীকে কাঁধে নিয়ে ছুটতে থাকেন ভক্তরা। হাজার হাজার মানুষ ছোটে বামাকালীর পিছন পিছন। সমস্বরে চিৎকার করতে থাকেন, বাজতে থাকে ঢাক। যে ভক্তদের কাঁধে বামা, তাঁরাও লাফিয়ে নাচতে থাকেন, সন্তানদের কাঁধে চড়ে নাচতে থাকেন মা-ও। বিশ্বাস, ভক্তি আর ভক্তের মায়ের প্রতি ভালোবাসার মিশেলে এ এক অসাধারণ দৃশ্য। কথিত আছে, পথের মোড়ে মোড়ে বামাকালীর বান্ধবী, বোনেরা আছেন। তাঁদের সঙ্গে দেখা হলেই শুরু হয় নাচ।
প্রতি বছরই বাড়ছে বামাকালীর নিরঞ্জন দেখতে যাওয়া ভক্তের সংখ্যা। এই সুন্দর মুহূর্তের তাল যাতে কোনও ভাবেই না কাটে, তার জন্য এ বার আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন পুজো উদ্যোক্তারা।
পুজো কমিটির সঙ্গে যুক্ত বর্ণালী চৌধুরী বলেন, ‘এটা আমাদের ও প্রশাসনের যৌথ সিদ্ধান্ত। মায়ের নাচ দেখতে যে হেতু বহু মানুষ আসেন। তাই এ বার নাচের জায়গা বদল করা হয়েছে। প্রশাসন ও আমাদের কমিটি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সামনেই বেজপাড়া মাঠ। সেখানে মায়ের নাচ হবে। পাশে আরও দু’টো মাঠ আছে। মাঝে বেজপাড়ার মাঠ। ফলে লোকজন এলে অসুবিধা হবে না। চোরবাগানে যা হলো, আমরা চাইব আর যেন কোথাও তেমন না হয়। আমাদের এখানেও যাতে সকলে সুস্থ ভাবে মায়ের নাচ দেখতে পারেন, উপভোগ করতে পারেন, সকলের কথা চিন্তা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’