ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১-দলীয় ঐক্যজোটের ব্যানারে থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এবার আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তৃণমূলে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানো, জনপ্রিয় প্রার্থী বাছাই এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করাকেই এখন গুরুত্ব দিচ্ছে দল দুটি। জাতীয় নির্বাচনের সমঝোতা স্থানীয় নির্বাচনে কার্যকর হবে না— দুই দলের নেতাদের বক্তব্যে এমন অবস্থানই স্পষ্ট। পৃথকভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিজ নিজ সাংগঠনিক শক্তি ও জনসমর্থন যাচাই
করতে চায় তারা। অন্যদিকে, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার প্রত্যাশা রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর।
স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনের ফলে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও সাংগঠনিক সক্ষমতা নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনী প্রস্তুতি সাজাচ্ছে দলগুলো।
স্থানীয় নির্বাচনে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতের আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। গতকাল শুক্রবার ঢাকা মহানগরী উত্তরের রুকন সম্মেলনে তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের দিনরাত সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে কাজ করতে হবে। তার ভাষ্য, ‘আমরা থামব না, আমাদের থামার সুযোগ নেই।’ আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে প্রাচীর গড়ে তুলতে হবে। কোনো চোরকে আর ছাড় দেওয়া হবে না। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে ভুলত্রুটি ও দুর্বলতা পর্যালোচনা করে সেগুলো কাটিয়ে ওঠারও তাগিদ দেন তিনি। মানুষের সমর্থনকে কার্যকর ভোটে রূপ দিতে সাংগঠনিক প্রস্তুতি ও জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দেন জামায়াত আমির।
দলীয় সূত্র জানায়, স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু সাংগঠনিক পরিচয় নয়, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও জনসেবার রেকর্ডকেও গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নির্বাচনে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। দলের একাধিক নেতা জানান, বিভিন্ন পর্যায়ে প্রার্থী ঘোষণার প্রস্তুতি এগিয়েছে। বাকি প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইও শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হালিম আমাদের সময়কে বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ১১ দলীয় ঐক্য গড়ে উঠেছিল। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এখানে প্রতিটি দল নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি ও এলাকার পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রার্থী দেবে।
একই অবস্থানের কথা জানিয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১-দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. হামিদুর রহমান আযাদ আমাদের সময়কে বলেন, জামায়াত একটি নির্বাচনমুখী দল। নির্বাচন নিয়ে তাদের পূর্ণ প্রস্তুতি রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে কোনো জোট হবে না; জামায়াতে ইসলামী এককভাবেই অংশ নেবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এনসিপিও। দলটির সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব সারজিস আলম বলেন, ইউনিয়ন থেকে নগর পর্যায় পর্যন্ত সংগঠন শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই তারা নিজস্ব প্রার্থী নিয়ে মাঠে নামতে চান। প্রায় চার হাজার ৬০০ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা এবং পরবর্তী তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার আমাদের সময়কে বলেন, স্থানীয় নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়, ইউনিয়ন থেকে নগর ওয়ার্ড পর্যন্ত সংগঠন বিস্তারেরও সুযোগ। এ লক্ষ্য সামনে রেখে কমিটি গঠন, প্রার্থী যাচাই ও নির্বাচনী প্রস্তুতি চলছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদকে গুরুত্ব দিচ্ছে এনসিপি। বিশেষ করে নগর রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরির জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে এনসিপি।
জামায়াত ও এনসিপির নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনে গড়ে ওঠা ১১-দলীয় ঐক্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকছে না। দলীয় প্রতীক না থাকায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, সংগঠনের সক্ষমতা ও ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে নিজস্ব পরিচয়ে মাঠে থেকে ভোটের রাজনীতিতে শক্তি বাড়াতে চায় দুই দল। জাতীয় নির্বাচনের বাইরে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনসমর্থন কতটা বিস্তৃত, সেই পরীক্ষাও দিতে হবে তাদের।
এদিকে নির্বাচনী প্রস্তুতির পাশাপাশি ভোটের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় অন্য দলগুলোর মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটির নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী আমাদের সময়কে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এ জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের আশ্বাস দিয়েছে সরকার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সব প্রার্থীকে সমান সুযোগ দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। বিতর্ক এড়িয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করতে চায় সরকার।
প্রসঙ্গত, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অংশ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন পাঁচ ধাপে আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম ধাপে ভোট হবে ২১ জানুয়ারি। গত সোমবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে কমিশনের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।
