অস্ট্রেলিয়ার স্বতন্ত্রসংসদ সদস্য হেলেন হেইনসকে গাড়িচাপা দেওয়ার আগে চালক গাড়িটি ঘুরিয়ে ইউটার্ন নিয়েছিলেন। ঘটনাটিকে স্পষ্টতই পরিকল্পিত হামলা বলে উল্লেখ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
সোমবার মেলবোর্ন থেকে প্রায় তিন ঘণ্টা উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ওয়াংগারাটায় নিজের কার্যালয়ের বাইরে সাদা রঙের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজারের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন হেইনস। রাতভর অস্ত্রোপচারের পরও তার অবস্থা সংকটাপন্ন ছিল।
মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম এবিসি নিউজকে আলবানিজ বলেন, ‘এটি যে ইচ্ছাকৃত ঘটনা, তা স্পষ্ট। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, কিংবা কেউ গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক থেকে ছিটকে পড়েননি।’
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে তিনি জানান, নিজের গাড়ির পেছনের ডিকি থেকে জিনিসপত্র ওঠানো বা নামানোর সময় হেইনসকে ধাক্কা দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ৪৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পথচারীরা তাকে আটক করার পর পুলিশ হেফাজতে নেয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো তাকে পরিবেশ আন্দোলনকর্মী ব্রেন্ডন নুজেন্ট হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তদন্তে একাধিক সংস্থার পাশাপাশি সন্ত্রাসবাদ দমন কর্তৃপক্ষও যুক্ত রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মঙ্গলবার সকালে জিজ্ঞাসাবাদ করার কথা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ (এএফপি) কমিশনার ক্রিসি ব্যারেট জানান, ভিক্টোরিয়া পুলিশ ও এএফপি সম্ভাব্য অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে সরকারি দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে আঘাত করার অভিযোগও রয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
এক বিবৃতিতে ব্যারেট বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টনি বার্ক এবিসি রেডিওকে জানান, প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি গাড়িটি পেছনে নিয়ে আবারও হেইনসকে ধাক্কা দেন। পরে এক পথচারী হস্তক্ষেপ করলে পরিস্থিতির অবসান ঘটে।
অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিকি জেফরিস নামের এক ব্যক্তি নিজের নাপিতের দোকান থেকে ছুটে এসে অভিযুক্তকে আটক করেন এবং তার কাছ থেকে একটি ছুরি সরিয়ে নেন। প্রথমে তিনি ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে মনে করেছিলেন।
সাংবাদিকদের জেফরিস বলেন, ‘ব্রেক করার কোনো শব্দ ছাড়াই বিকট একটি আওয়াজ শুনেছিলাম। ঘটনাটি ছিল পাগলাটে। কী হচ্ছে দেখতে আমি দৌড়ে বাইরে চলে আসি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুরুতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পারিনি। পরে বিষয়টি পরিষ্কার হলে আমি এবং সেখানে থাকা অন্যরা যতটা সম্ভব করার চেষ্টা করেছি।’
অস্ট্রেলিয়ায় রাজনীতিবিদদের ওপর এ ধরনের সহিংস হামলা অত্যন্ত বিরল। দেশটিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য পর্যায়ের আইনপ্রণেতা, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও সাধারণত কঠোর নিরাপত্তা ছাড়াই সুপারশপ, কফিশপ ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দেখা যায়। ভোটারদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগও বেশ স্বাভাবিক।
পেশায় নার্স ও ধাত্রী হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি শিক্ষাবিদ ছিলেন হেইনস। ২০১৯ সালে ইন্ডি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি সংসদে প্রবেশ করেন। পরে ২০২২ ও ২০২৫ সালের নির্বাচনেও আসনটি ধরে রাখেন।
হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন আলবানিজ। তবে দেশের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে হুমকির ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বজুড়েই রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানি বাড়ছে। ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের ফেব্রুয়ারির এক জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৭১ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে অনলাইন হয়রানিও রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে হুমকি ও হয়রানিমূলক আচরণের ঘটনা গত এক বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৭টিতে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৯৫১।
আলবানিজ বলেন, ‘উত্তেজনা কমিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের সবার।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি সত্যিই চাই না অস্ট্রেলিয়ার চরিত্র বদলে যাক। নিজেদের পরিচয়, পারস্পরিক সম্পৃক্ততা ও জাতীয় ঐক্যবোধ ধরে রাখতে হবে। একটি দেশ হিসেবে এগুলো আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
