ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক বাসব্যবস্থা চালুর সিদ্ধান্ত ইতিবাচক। একই রুটে যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র বাস থামানো ও চালকদের বেপরোয়া আচরণের অবসান জরুরি। নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে বাস পরিচালনা, চালকদের মাসিক বেতন, নির্ধারিত স্টপেজ ও সময়সূচি মেনে চলাচল সেই পরিবর্তনের পথ তৈরি করতে পারে। কিন্তু একই ধরনের সিদ্ধান্ত অতীতেও নেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবসম্মত কারণেই তা বাস্তবায়িত হয়নি। তাই এবারের সিদ্ধান্তের ইতিবাচকতা নির্ভর করবে তার কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।
২০০৪ সালের কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির প্রস্তাব ছিল। ২০১৫ সালে মেয়র আনিসুল হকও একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে পরীক্ষামূলক সেবাও চালু হয়। কিন্তু একই পথে অন্য কোম্পানির বাস চলাচল অব্যাহত থাকায় পরিকল্পিত সেবাটি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যাত্রীছাউনিও অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অতীতের এই ব্যর্থতার কারণ দূর না করে নতুন সময়সীমা ঘোষণা করলে পরিস্থিতি বদলানোর নিশ্চয়তা নেই।
বাসমালিকদের অনাগ্রহ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা আগের উদ্যোগগুলোকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এসব সমস্যার মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন। মালিকদের সহযোগিতা নিতে হবে, তাঁদের বাস্তব সমস্যাও বিবেচনা করতে হবে। কিন্তু কোনো রুটে শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রভাবশালী মালিকের বাসকে পুরোনো নিয়মে চলতে দেওয়া যাবে না। নিয়ম সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর করার রাজনৈতিক সদিচ্ছাই হবে বাস্তবায়নের প্রধান পরীক্ষা।
শুরুতেই বাস্তবায়নের পরিসর নিয়ে অস্পষ্টতা দূর করা দরকার। সভার সিদ্ধান্তে ছয় মাসের মধ্যে পুরো কার্যক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্য বলা হয়েছে। অথচ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক জানিয়েছেন, এই সময়ে ৩২টি রুটের মধ্যে পাঁচটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো ব্যবস্থার প্রস্তুতি এবং কয়েকটি রুটে সেবা চালু করা আলাদা বিষয়। কোন সময়ের মধ্যে কী অর্জিত হবে, তার নির্দিষ্ট রূপরেখা না থাকলে পরে আংশিক অগ্রগতিকে পূর্ণ বাস্তবায়ন হিসেবে দেখানোর সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিটি রুটে কত বাস লাগবে, কতক্ষণ পরপর ছাড়বে, যাত্রীচাহিদা কী এবং কোথায় অন্য পরিবহনের সঙ্গে সংযোগ থাকবে—এসব নির্ধারণ করতে হবে। রুটের সংখ্যা কমানোই সেবার মান উন্নয়নের নিশ্চয়তা নয়। যাত্রীর হাঁটার দূরত্ব, বাসবদলের প্রয়োজন ও মোট ভাড়া বেড়ে গেলে নতুন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। সমীক্ষার তথ্যকে ব্যবহার করে রুট সাজাতে হবে এবং পরীক্ষামূলক পর্যায়ে যাত্রীদের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।
কোম্পানি গঠনের আর্থিক কাঠামোও স্পষ্ট হওয়া জরুরি। মালিকদের বিনিয়োগ, আয় বণ্টন, পরিচালন ব্যয় ও শ্রমিকের বেতন কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা আগেই ঠিক করতে হবে। চালককে মাসিক বেতন দেওয়ার ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর না হলে দৈনিক আয়ের চাপ ও যাত্রী ধরার প্রতিযোগিতা বহাল থাকবে। ব্যাংকঋণ বা নীতিসহায়তা দেওয়া হলে তার সঙ্গে বাসের মান, নিয়মিত সেবা ও আর্থিক স্বচ্ছতার শর্ত যুক্ত করতে হবে। পুরোনো বাসের মান নিয়েও আপসের সুযোগ নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ বা চলাচলের অনুপযোগী বাস বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চাপের মুখে শিথিল করা চলবে না। নতুন বাস প্রয়োজন হলে অর্থায়ন ও সংগ্রহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এখনই করতে হবে।
ডিটিসিএ, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। কোন সংস্থা সমন্বয়ের নেতৃত্ব দেবে এবং ব্যর্থতার জন্য কে জবাব দেবে, সেটিও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন। মাসভিত্তিক অগ্রগতি প্রকাশ এবং যাত্রীদের অভিযোগের নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখতে হবে। নির্ধারিত রুটে অনুমতিবহির্ভূত বাস, স্টপেজ অমান্য করা ও অতিরিক্ত ভাড়ার বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা ছাড়া কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনাও ফল দেবে না। সরকারকে অতীতের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যা ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তনেও কার্যকর থাকবে।
