বাচ্চাদের ভাত খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দাও। আমার আসতে একটু দেরি হবে, একটা নিউজ নিয়ে ব্যস্ত আছি। স্ত্রী আনন্দিতা সাংমাকে কথাগুলো বলেই বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির (৪৪)। দুই সন্তানকে নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে তার ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী। কিন্তু স্বামীর ফেরা আর হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কাছে পৌঁছায় লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে হত্যার খবর।
গত বৃহস্পতিবার রাত পৌনে আটটার দিকে দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ানকে স্ত্রীর কাছে রেখে বেরিয়ে যান লুৎফুজ্জামান। পরে নেত্রকোণার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন তিনি। স্বামীর নিথর দেহের পাশে সন্তানকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন আনন্দিতা। তার কাছে ঘটনাটি ছিল অবিশ্বাস্য। তিনি বলেন, স্বাভাবিক একটি সন্ধ্যায় সন্তানদের খাওয়ানোর সময় হঠাৎ গুলির শব্দ শুনেছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন, কেউ হয়তো পটকা ফুটিয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকমুখে জানতে পারেন, আমার স্বামীকে গুলি করা হয়েছে।
ছুটে গিয়ে দেখি রক্তাক্ত অবস্থায় তিনি পড়ে আছেন। স্বামী হত্যার বিচার দাবি করে আনন্দিতা বলেন, আমি তো আমার স্বামীকে আর ফিরে পাবো না। তবে যারা তাকে হত্যা করেছে, আমার অবুঝ দুটি শিশুকে পিতৃহারা করেছে, পুলিশ তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনুক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। লুৎফুজ্জামান বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোণা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। সেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধ নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি ভিডিও প্রকাশ করতেন তিনি।
তার বাড়ি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে। তিনি মহব্বত আলী ফকিরের ছেলে। বসবাস করতেন দুর্গাপুরের তেলনজিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে। রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের রাস্তার পাশে একটি বাড়ির বারান্দায় চায়ের দোকানটি। চারদিকে নীরবতা। দোকানটি থেকে লুৎফুজ্জামানের শ্বশুরবাড়ির দূরত্ব প্রায় ২০ গজ। বাড়িটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা কান্নাকাটি করছেন। তেলনজিয়া গ্রামে অধিকাংশ বাসিন্দাই গারো সম্প্রদায়ের। লুৎফুজ্জামানের ফুফুশাশুড়ি নিরালা রেমা ও রুলি রেমা জানান, তারা বাড়ির বারান্দায় বসে গল্প করছিলেন। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনে দোকানের কাছে গিয়ে দেখেন, লুৎফুজ্জামানের নিথর দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তার মাথা, গলা ও বুক থেকে রক্ত ঝরছিলো।
স্বজনদের কাছ থেকে জানা যায়, প্রায় ছয় বছর আগে তেলনজিয়া গ্রামের শিলা সাংমা ও প্রয়াত ফিলিপ রাংসার মেয়ে আনন্দিতাকে বিয়ে করেন লুৎফুজ্জামান। তাদের দুই সন্তান- চার বছর বয়সী মেয়ে প্রান্তি ও দেড় বছর বয়সী ছেলে আইয়ান সাফয়ান। প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন লুৎফুজ্জামান। পরে বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। নিজের মুঠোফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে মিনিট তিনেকের মধ্যে আবার ফিরে আসেন তিনি।
মুঠোফোন নিয়ে দোকান থেকে বের হওয়ার সময় দুই যুবক সেখানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চান। এরপর তারা লুৎফুজ্জামানকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়েন। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে ওই দুই যুবক দৌড়ে পালিয়ে যান। পরে লুৎফুজ্জামানকে উদ্ধার করে দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দোকানি রবিন রাংসা বলেন, আমি তখন চায়ের কাপ ধুচ্ছিলাম।
লুৎফুজ্জামান চা খেয়ে যাওয়ার সময় মুঠোফোন ফেলে যাওয়ায় আবার ফিরে আসেন। তিনি ফোন নিয়ে বের হওয়ার সময় দুই যুবক এসে আমার কাছে সিগারেট চায়। এরপর লুৎফুজ্জামানকে গুলি করে। আমি পরপর চারটি গুলির শব্দ শুনেছি। ভয়ে বাসায় গিয়ে ঢুকে পড়ি। রবিন রাংসার ভাষ্য, দুই যুবকের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে হবে। তাদের একজনের পরনে লুঙ্গি, অন্যজনের পরনে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ছিলো। গুলি করার পর স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে তারা পালিয়ে যান। খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিলো বলে জানান তিনি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নেত্রকোণার এসপি তরিকুল ইসলাম, এএসপি (অপরাধ) মাহফুজা খাতুন, এএসপি (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম, দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমদ খান এবং দুর্গাপুরের ইউএনও আহমেদ সাদাতসহ পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এসপি তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে। ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ জানায়, হত্যাকাণ্ডের পর জেলার সব থানাকে সতর্ক করা হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা লুৎফুজ্জামানকে কুপিয়ে জখম করেছিলো। সে সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে গুলিতে নিহত লুৎফুজ্জামানের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোণা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
বিআলো/অর্নব