দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে জ্বালানি সরবরাহের কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় বুধবার (২১ অক্টোবর) সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ইউরেনিয়ামের আরেকটি চালান পৌঁছেছে পাবনার ঈশ্বরদীতে। এর আগে চলতি মাসে কেন্দ্রটির জন্য ইউরেনিয়ামের চালান এসেছিল। নতুন চালান পৌঁছানোর মধ্যদিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিতে আরও অগ্রগতি হলো। তবে কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নতুন চালান পৌঁছানোর তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বুধবার (২১ অক্টোবর) সকাল ১০টার পর ইউরেনিয়ামবাহী গাড়িবহরটি প্রকল্প এলাকায় প্রবেশ করে। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় জ্বালানিবাহী বিশেষ কার্গো বিমান। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা চালানটি গ্রহণ করেন। পরে বুধবার (২১ অক্টোবর) ভোরে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে গাড়িবহরটি রূপপুরের উদ্দেশে রওনা হয়।
পুরো যাত্রাপথে সেনাবাহিনীর পাশাপাশি পুলিশ, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা।
জ্বালানি সরবরাহে ধারাবাহিকতা: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের মোট উৎপাদনক্ষমতা ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট। প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। এতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানির উৎস বাড়বে এবং গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতার চাপ কিছুটা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
চলতি বছরের ৩ ও ১১ অক্টোবর রূপপুরে ইউরেনিয়ামের চালান পৌঁছানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। গতকাল বুধবারের চালানটি এ ধারাবাহিক সরবরাহ কার্যক্রমের অংশ। তবে নতুন চালানটি প্রথম না দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য, সে বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদে ভিন্ন তথ্য রয়েছে। তাই প্রকল্প কর্তৃপক্ষের নিশ্চিত বক্তব্য ছাড়া নির্দিষ্ট ইউনিটের নাম উল্লেখ করা সমীচীন নয়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে রূপপুর কেন্দ্র। এর জ্বালানি সরবরাহে রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে কেন্দ্রটির উৎপাদন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জ্বালানি সরবরাহের সময়সূচি, আন্তর্জাতিক পরিবহন এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি নিরাপত্তায় কী ভূমিকা রাখবে: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো প্রাকৃতিক গ্যাসের পাশাপাশি আমদানি করা কয়লা ও তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। অন্যদিকে, জ্বালানি আমদানিতে ব্যয় হয় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা। এ পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন দেশের জ্বালানি উৎসে বৈচিত্র্য আনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ইউরেনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তুলনামূলক অল্প পরিমাণ জ্বালানি দিয়ে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। কেন্দ্রটি নিয়মিত উৎপাদনে গেলে বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া পরিচালনাকালে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রের তুলনায় সরাসরি কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কম হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্যোগেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ চালু হলেই জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা শেষ হবে না। ইউরেনিয়াম, বিশেষায়িত যন্ত্রাংশ, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং ব্যবহৃত জ্বালানির ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। তাই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা ও বিকল্প পরিকল্পনা গুরুত্বপূর্ণ।
রূপপুরে জ্বালানি পৌঁছানো বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে জ্বালানি পৌঁছানোর পরও রিঅ্যাক্টরে জ্বালানি স্থাপন, বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনসহ একাধিক ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। পরীক্ষামূলক উৎপাদন এবং পূর্ণ বাণিজ্যিক উৎপাদনও এক বিষয় নয়।
কেন্দ্রটি চালু হলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল, বিকিরণ নিরাপত্তা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক জ্বালানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রকল্পটির আর্থিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। নির্মাণ ব্যয়ের পাশাপাশি ঋণ পরিশোধ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি সরবরাহের ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় ও সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে, দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাত কতটা সুফল পাবে।
সব মিলিয়ে, রূপপুরে ইউরেনিয়ামের ধারাবাহিক চালান পৌঁছানো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। এখন নির্ধারিত সময়ে নিরাপদে উৎপাদন শুরু, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যয় সাশ্রয়ী পরিচালনা নিশ্চিত করাই প্রকল্পটির সাফল্যের প্রধান শর্ত।
