দশ-বারো বছর বয়স পর্যন্ত তো দুর্গাপুজো ভালই কাটত। আমার পছন্দের জামাকাপড় কেনা হত। ষষ্ঠীতে কোনটা পরব, সপ্তমীতে কী পরব— আগে থেকে ভাগ করে গুছিয়ে রাখা থাকত। পুজোয় জামাকাপড়ের নতুন গন্ধ যেন এখনও নাকে লেগে আছে। মনে আছে, রাতে শোয়ার সময়েও মাথার কাছে নতুন জামাকাপড় নিয়ে শুতাম। যেন মহামূল্যবান সম্পত্তি, কাছছাড়া করা যাবে না এক মুহূর্তের জন্য। নতুন জামাকাপড় পরে, বাবা-মায়ের হাত ধরে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঠাকুর দেখতে যেতাম। সে এক অন্যরকমের আনন্দ!
কিন্তু, ১৩ বছর বয়সে এই পুজোর সময়েই বিরাট একটা ধাক্কা খাই। আমার মা ঠিক দুর্গাপুজোর আগে তাঁর খোকাকে ছেড়ে চলে গেলেন। আমার জীবনের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমার মনে আছে, মা চলে যাওয়ার পরে সমস্ত পারলৌকিক ক্রিয়া আমাকে দিয়ে বাবা করিয়েছিলেন। আমার মাসিমা সেই সময়ে আমাকে বুকে টেনে নেন, আগলে রাখেন। পুজোর মধ্যেই মায়ের সমস্ত শ্রাদ্ধশান্তির কাজ সেরেছিলাম। পুজোর মধ্যেই এই দুঃখটা মেনে নিতে হয়েছিল। এই স্মৃতি আমার মনে এখনও দগদগে। আনন্দের স্মৃতিও যেমন আছে, তেমনই এই বেদনাও রয়েছে।
এ বার মুম্বইয়ে বিশ্বজিতের আয়োজিত পুজোর ২৪তম বর্ষ। ফাইল চিত্র।
আমার বড়মামা আমার মাকে ভীষণ ভালবাসতেন। মা চলে যাওয়ার পরে যেহেতু আমি নতুন জামা পরতে পারছি না, আমার কষ্ট হবে বলে বড়মামা নিজের ছেলেমেয়েদেরও পুজোয় নতুন জামা কিনে দেননি। দুর্গাপুজোর স্মৃতি হাতড়ালেই মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। গত ২৪ বছর ধরে মুম্বইয়ের বাড়িতে দশভুজাকে নিয়ে আসছি। কিন্তু, নিজের মাকে কাছে পাই না বহু বছর।
সেই দুঃখকে সঙ্গী করেই মুম্বইয়ে, নিজেদের পাড়ায় জুহু স্কিম সর্বজনীনের পুজো শুরু করি আমি আর আমার স্ত্রী ইরা চট্টোপাধ্যায়। খুব সাধারণ ভাবেই শুরু হয় পুজো। ধীরে ধীরে আমাদের সঙ্গে অনেক লোকজন যুক্ত হন। এখন ‘বিশ্বজি়তের পুজো’র বেশ নামডাক। অনেকেই আসেন আমাদের পুজো দেখতে। অনেকের সঙ্গে আলাপ হয়। কত লোকে এসে বলেন, “দাদা আপনাকে দেখতে এলাম” বা “দাদা, আপনার পুজোর অনেক নাম শুনেছি”। কলকাতা থেকেও অনেক মানুষ আসেন। ঠাণে, নাসিক-সহ মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গা থেকে দর্শনার্থী আসেন। খুব ভাল লাগে এত লোক দেখে।
আমার ঠাকুর আগে তৈরি করতেন শিল্পী নিমাই পাল। তাঁর মৃত্যুর পরে সেই দায়িত্ব সামলান ছেলে অমিত পাল। মুম্বই ও পুণের বেশির ভাগ মূর্তি ওঁর হাতেই তৈরি হয়। ঢাকিও আসেন কলকাতা থেকে। ভোগ যিনি রান্না করেন, তিনিও কলকাতার।
আমি এখনও সাবেকি পুজোই করি। একচালার ঠাকুর থেকে এখনও নড়িনি। ওই ঠাকুর হলেই মনে হয় মনের মতো পুজো হচ্ছে। আমার পুজো মানে ভক্তি, শ্রদ্ধা, ভালবাসার মিশ্রণ। মানুষ যাতে ভাল করে ভোগ খান, সেই দিকে নজর রাখি। আমার পুজোয় কোনও আড়ম্বর থাকে না। পুজো যেন পুজোর মতো হয়— সেটা মাথায় থাকে সবসময়। মণ্ডপে সারাক্ষণ বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠ হয়। সলিল চৌধুরী, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শচীন দেববর্মন, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান চলে। চেষ্টা করি বাঙালিয়ানা বজায় রাখার। বাঙালি মনন বজায় রাখার চেষ্টা করি। ঝালমুড়ি, ফুচকার স্টলও রাখি। লোকে পছন্দ করেন।
পুজোর আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে। এই বছরে স্ত্রী ইরা ও মেয়ে সম্ভবীর ইচ্ছায় আমাদের সোনারঙের প্রতিমা আসবে। নেপথ্যে রুপো। ‘সোনা-রুপো’য় মোড়া মা আসবে এ বার। নানা অনুষ্ঠান হবে। সামনের বছর রজতজয়ন্তী। মা যদি চান, তা হলে পরের বছরও ভাল করে পুজো হবে। আরও ভাল করে মাকে সাজিয়ে আনব।
সংক্ষেপে
- পুজোর আর মাত্র হাতেগোনা কয়েক দিন বাকি। এই সময়ে সমাজমাধ্যম জুড়ে একের পর এক ‘ক্র্যাশ ডায়েট’, দামি সাপ্লিমেন্ট আর কিটো ডায়েটের বিজ্ঞাপন। তাতে কি সত্যিই ওজন ঝরে?
- পুজো মানেই খুদের বায়না, নতুন জামা পরে ঠাকুর দেখতে যাওয়া। কিন্তু এই সময়ের ভ্যাপসা গরম, হঠাৎ বৃষ্টি আর ভিড়ের ধকল ছোট শরীরে সহজেই অসুখ ডেকে আনতে পারে। তাই আনন্দের মাঝে যেন সে অসুস্থ হয়ে না পড়ে, সে জন্য আগেভাগেই সতর্ক হওয়া জরুরি।
- পুজোর আগে রোগা হবেন, এই ভাবনা যাঁদের মাথায় এসেছে, তাঁদের জন্য সঠিক ফিটনেস রুটিন প্রয়োজন। অল্প সময়ে ক্লান্তি ব্যতিরেকে নিজেকে ফিট ও ছিপছিপে করে তুলতে কিছু সহজ কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর রুটিনই হতে পারে আপনার সেরা হাতিয়ার।
আরও পড়ুন
