রোগের শিকড় খুঁজতেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে, আর নিজের শিকড় খুঁজে পেতেন মানুষের মধ্যে। একদিকে ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের মতো রোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণা, অন্যদিকে ঈদের ছুটিতে গ্রামে ফিরে সাধারণ রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা। খ্যাতির শিখরে উঠেও মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষটির নাম অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানউর রহমান। তাঁর কাছে চিকিৎসা ছিল পেশা, গবেষণা ছিল সাধনা,আর মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল জীবনের দায়।
চিকিৎসক হিসেবে দক্ষতা, গবেষক হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিচিতি কিংবা শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা-কোনোটিই তাঁকে নিজের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও ফিরে গেছেন নিজের জনপদে, খোঁজ নিয়েছেন পুরোনো বন্ধুদের, ভেবেছেন শৈশবের বিদ্যালয় নিয়ে। তাঁর জীবন তাই শুধু একজন চিকিৎসকের সাফল্যের গল্প নয়; এটি জ্ঞানচর্চা, পেশাগত সততা ও মানবিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য আখ্যানও!
১৯৫৮ সালের ২১ এপ্রিল জন্ম নেওয়া মো. রিদওয়ানউর রহমান ২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর ৬৫ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ক্ষণজন্মা এই মানুষটির প্রয়াণে দেশের চিকিৎসা ও গবেষণাক্ষেত্রে তৈরি হয় অপূরণীয় শূন্যতা। মৃত্যুর তিন বছর হতে চললেও তাঁর কর্ম ও জীবনদর্শন আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীর প্রাক্কালে ফিরে দেখা যাক এমন এক মানুষকে, যিনি রোগের কারণ অনুসন্ধানে যেমন নিবেদিত ছিলেন, তেমনি মানুষের প্রতি দায়িত্ব পালনে ছিলেন অবিচল।
রোগীর উপসর্গ নয়, খুঁজতেন সমস্যার মূল :
চিকিৎসাবিজ্ঞানে জ্ঞান অর্জন এক বিষয়, সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে রোগের প্রকৃতি বুঝতে পারা আরেক বিষয়। অধ্যাপক মো. রিদওয়ানউর রহমান ছিলেন এই দুই দক্ষতার বিরল সমন্বয়। তাঁর কাছে চিকিৎসা মানে শুধু ওষুধ লিখে দেওয়া নয়; বরং পর্যবেক্ষণ, যুক্তি ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে রোগ নির্ণয়ের সঠিক পথ খুঁজে বের করা।
সাবেক শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে উঠে এসেছে তাঁর পর্যবেক্ষণক্ষমতার একটি ঘটনা। হাসপাতালে প্রশিক্ষণ চলাকালে এক রোগীকে পরীক্ষা করে তিনি তাঁর ডান ফুসফুসে সমস্যার কথা বলেছিলেন। পরে এক্স-রে পরীক্ষায় সেই ধারণার সত্যতা মেলে। পরদিন ওই রোগীকে কেন্দ্র করেই শিক্ষার্থীদের রোগ নির্ণয়ের পাঠ দেন তিনি।
ঘটনাটি শুধু তাঁর চিকিৎসাবিজ্ঞানের জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণক্ষমতার পরিচয় দেয় না, তুলে ধরে শিক্ষাদানের স্বতন্ত্র ধরনও। বাস্তব রোগীকে সামনে রেখে জটিল বিষয় সহজ করে বোঝানো, শিক্ষার্থীদের যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখানো এবং রোগের মূল কারণ খুঁজে বের করার অভ্যাস গড়ে তোলায় গুরুত্ব দিতেন তিনি।
চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় ওষুধনির্ভরতারও সমালোচনা করতেন মো. রিদওয়ানউর রহমান। তাঁর একটি বহুল আলোচিত মন্তব্য, ‘When you prescribe medicine for every single complaint, then you are nothing but a trained quack.’ অর্থাৎ, রোগীর প্রতিটি অভিযোগের বিপরীতে ওষুধ লিখে দেওয়াই যদি চিকিৎসার মূল পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়, তবে প্রকৃত রোগ নির্ণয়ের গুরুত্ব হারিয়ে যায়। তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয় চিকিৎসার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি-রোগীকে বুঝতে হবে, রোগের কারণ খুঁজতে হবে, তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হবে।
গবেষণায় আন্তর্জাতিক পরিসরে অবদান :
মো. রিদওয়ানউর রহমানের কর্মজীবন হাসপাতাল ও শ্রেণিকক্ষের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ এবং জনস্বাস্থ্যের নানা বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। রোগের বিস্তার, নির্ণয়, চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণের উপায় অনুসন্ধান ছিল তাঁর গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ নিয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর ও মাছিবাহিত রোগ নিয়ে তাঁর কাজ আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পরিচিতি পেয়েছে। তাঁর গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রোগের প্রকৃতি ও বিস্তার সম্পর্কে নতুন তথ্য অনুসন্ধান করা, যাতে চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য কার্যক্রম আরও কার্যকর করা যায়।
কালাজ্বর নিয়ে তাঁর গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ রোগটির আন্তর্জাতিক চিকিৎসাপদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। একইভাবে, ম্যালেরিয়া নিয়ে তাঁর একটি গবেষণাপত্র দ্য ল্যানসেট সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় এবং সেটি ২০১০ সালে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের বর্ষসেরা গবেষণাপত্রের স্বীকৃতি পায়। কালাজ্বর নির্মূলে তাঁর গবেষণার অবদান চিরস্মরণীয়। এবং সবশেষে বাংলাদেশের যে কালাজ্বরমুক্ত দেশ হিসেবে স্বীকৃতি মিলল-সেটির পেছনে তার সেই গবেষণার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য।
আমিলাইষ কাঞ্চনা বঙ্গ চন্দ্র ঘোষ ইনস্টিটিউটে স্কুলজীবন শেষ করে তিনি পড়াশোনা করেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে। পরে ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। ১৯৮২ সালে সম্মিলিত মেধাতালিকায় দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। এরপর বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস থেকে মেডিসিনে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৩ সালে পঞ্চম বিসিএসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দিয়ে শুরু হয় তাঁর সরকারি কর্মজীবন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিলেও গবেষণার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেননি। পরে ইউনিভার্সাল মেডিকেল কলেজের গবেষণাকেন্দ্রে প্রধান গবেষক হিসেবে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তাঁর গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা ছিল ১৬৭টি; এসব গবেষণায় উদ্ধৃতির সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৮৪। সংখ্যাগুলো তাঁর গবেষণার বিস্তার সম্পর্কে ধারণা দেয়। তবে তাঁর অবদানের গুরুত্ব শুধু প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়। রোগ সম্পর্কে নতুন জ্ঞান তৈরি, চিকিৎসকদের চিন্তার পরিসর বাড়ানো এবং জনস্বাস্থ্যের জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার মধ্যেই নিহিত ছিল তাঁর গবেষণার তাৎপর্য।
বিশ্বজোড়া খ্যাতি, শিকড়ে অটুট টান :
একজন চিকিৎসক যখন গবেষণার কাজে ব্যস্ত থাকেন, তখন শৈশবের এলাকা কিংবা পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ সীমিত হয়ে আসা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মো. রিদওয়ানউর রহমানের জীবনে নিজের জনপদের প্রতি টান ছিল স্বতন্ত্র। তাঁর কাছে আমিলাইষ কাঞ্চনা বঙ্গ চন্দ্র ঘোষ ইনস্টিটিউট শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না; ছিল বেড়ে ওঠার স্মৃতি, বন্ধুত্ব ও শিকড়ের প্রতীক।
বিদ্যালয়ের বন্ধুদের সঙ্গে আজীবন সম্পর্ক ধরে রেখেছিলেন তিনি। তাঁর বন্ধুদের স্মৃতিচারণে উঠে আসে, রমজানে বন্ধুদের নিয়ে তাঁর বাড়িতে ইফতারের আয়োজন হতো। কর্মজীবনের ব্যস্ততা কিংবা আন্তর্জাতিক পরিচিতি পুরোনো সম্পর্কের জায়গা দখল করতে পারেনি কখনো। ঈদের সময় গ্রামে ফিরে স্থানীয় হাটের একটি চেম্বারে বিনা মূল্যে রোগী দেখতেন তিনি। তাঁর এই সেবা শুধু বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; রোগীদের প্রতি সমান আচরণেও প্রকাশ পেত তাঁর ন্যায়বোধ। পরিচিত কেউ এলেও সিরিয়াল ভেঙে তাঁকে আগে দেখতেন না। তাঁর যুক্তি ছিল, একজনকে আগে দেখলে অপেক্ষমাণ অন্য রোগীরা মনে মনে তাঁর বাবা-মাকে গালি দেবেন।
খ্যাতিমান চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতির জোরে নিয়ম ভাঙার সুযোগ থাকলেও তিনি তা করতেন না। অপেক্ষমাণ রোগীদের সমান গুরুত্ব দেওয়ার এই অভ্যাস তাঁর পেশাগত সততা ও সাধারণ মানুষের প্রতি সম্মানের পরিচয় বহন করে। বড় কোনো বক্তব্যের চেয়ে দৈনন্দিন আচরণেই ফুটে উঠত তাঁর মানবিকতা।
নিজের এলাকার মানুষের চিকিৎসাসংক্রান্ত সমস্যায়ও তিনি পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন নিয়ে ভাবতেন, পুরোনো বন্ধুদের সংগঠিত করতেন এবং শৈশবের জনপদের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট রাখতেন। বিশ্বমানের গবেষক হয়েও নিজের বেড়ে ওঠার জায়গাটিকে ভুলে না যাওয়ার এই গুণ তাঁর জীবনকে দিয়েছে আলাদা মাত্রা।
তিনি ‘বেঁচে’ থাকবেন কাজে :
২০২৩ সালের ২৫ অক্টোবর তাঁর জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু একজন চিকিৎসক ও গবেষকের অবদান কেবল তাঁর কর্মজীবনের মেয়াদ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। কত মানুষের চিকিৎসায় ভূমিকা রেখেছেন, কত শিক্ষার্থীকে শিখিয়েছেন, গবেষণার মাধ্যমে কত নতুন প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন-সেই উত্তরাধিকারের মধ্যেই নিহিত তাঁর কাজের সার্থকতা।
মো. রিদওয়ানউর রহমানের জীবন মনে করিয়ে দেয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষের জন্য প্রয়োজন গভীর জ্ঞান, নিরন্তর গবেষণা ও যুক্তিনির্ভর চিন্তা। আর একজন চিকিৎসকের প্রকৃত মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ, সততা ও মানবিকতায়। আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণার স্বীকৃতি অর্জন করেও গ্রামের রোগী, পুরোনো বন্ধু ও শৈশবের বিদ্যালয়ের প্রতি টান হারাননি তিনি।
২৫ অক্টোবর তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। শোকের এই দিনে তাঁকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন খ্যাতিমান চিকিৎসক ও গবেষকের অর্জন মনে করা নয়; তাঁর জীবন থেকে চিকিৎসা, গবেষণা, শিক্ষা ও মানবসেবার পাঠ নেওয়াও। তিনি রোগের শিকড় খুঁজেছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানে, আর নিজের শিকড়কে আগলে রেখেছেন জীবনযাপনে।
এই দুইয়ের সমন্বয়েই অনন্য অধ্যাপক ডা. মো. রিদওয়ানউর রহমান। তাই তো তিনি হয়ে থাকবেন স্মরণীয়, বরণীয়; চিরকাল! ###
লেখক : প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজী বিভাগ
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল
The post রোগের শিকড় খুঁজতেন,ভোলেননি নিজের শিকড় appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
