ছবি: সংগৃহীত
-->দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের প্রেক্ষাগেৃহে মুক্তি পেয়েছে তিন সিনেমা ‘চিরকুট’, ‘স্নেহের বন্ধন’, ও ‘কাট-পিস’। সিনেমাগুলো ঘিরে নির্মাতা, অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রত্যাশা থাকলেও প্রেক্ষাগৃহে দর্শক খরায় ভূগছে সিনেমাগুলো।
তিন সিনেমার টিকিট বিক্রি এবং দর্শক উপস্থিতি নিয়ে হতাশ খোদ হল মালিকরা। সিনেমাগুলো চালিয়ে বিদ্যুৎ বিলের খরচও উঠছে না বলে হতাশার কথা জানিয়েছেন তারা। কোথাও দর্শকের অভাবে শো করা হয়েছে বাতিল, আবার কোথাও হাতেগোনা টিকিট বিক্রির আয় দিয়ে মেটানো যাচ্ছে না বিদ্যুৎ, শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও কর্মীদের খরচ। ফলে সিনেমা প্রদর্শন করেও লোকসান গুনতে হচ্ছে প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষকে।
১৮ অক্টোবর স্টার সিনেপ্লেক্সের ওয়েব সাইট ঘুরে দেখা যায়- ‘চিরকুট’ সিনেমায় বালি অর্কেড চট্টগ্রামে সাড়ে ৭টার শোতে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত টিকিট বিক্রি হয়েছে মোট ৪টি, স্টার সিনেপ্লেক্স বসুন্ধরায় ১৩টি, রাজধানীর সেন্টারপয়েন্ট উত্তরায় সাড়ে ৫টার শোতে ২টি টিকিট বিক্রি হয়েছে।
রাজশাহীর গ্র্যান্ড রিভারভিউ সিনেপ্লেক্সে চিরকুট সিনেমার টিকিট বিক্রি হয়েছে মোট ২৫টি। ‘কাট-পিস’ সিনেমায় ক্ষেত্রে সনি স্কয়াস মিরপুরে ৭টা ১৫ এর শোতে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত কোনো টিকিটই বিক্রি হয়নি। এমন অবস্থায় থাকলে শেষ পর্যন্ত শো বাতিল হবে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের বিভিন্ন হল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন। স্টার সিনেপ্লেক্সের মিডিয়া ও মার্কেটিং বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সিনেমাগুলোর ফলাফল আশানুরূপ নয়। আমাদের যে প্রত্যাশা ছিল তার পূরণ হয়নি এবং হচ্ছে না। তবুও আমরা বাংলা সিনেমার প্রতি দায়বদ্ধতা এবং দায়িত্ববোধ থেকেই সিনেমাগুলো প্রদর্শন করছি। সিনেপ্লেক্সকে টার্গেট করে যারা সিনেমা নির্মাণ করেন, তাদের প্রতি অনুরোধ আপনারা সিনেপ্লেক্সের দর্শকরা কি চায় এটা বুঝে সিনেমা নির্মাণ করুন। শুধু সিনেমা নির্মাণ করে সিনেপ্লেক্সে মুক্তি দিলেই সেটা চলবে না। দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে ফেরাতে হলে দর্শকের রুচি ও পছন্দের বিষয়টি মাথায় রেখে সিনেমা নির্মাণ করতে হবে।’
হতাশার কথা জানিয়েছেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের লায়ন সিনেমাসের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা আবদুল খালেক। তার তথ্য অনুযায়ী, ‘স্নেহের বন্ধন’-এর একটি প্রদর্শনীতে বিক্রি হওয়া ৩৭টি টিকিটের মধ্যে ৩৫টিই কিনেছেন সিনেমাটির প্রচারণায় আসা প্রযোজক, পরিচালক, অভিনয়শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। সাধারণ দর্শকের কাছ থেকে এসেছে মাত্র দুটি টিকিটের বিক্রি। একই দিনে ‘কাট-পিস’-এর একটি প্রদর্শনীতে বিক্রি হয়েছে মাত্র আটটি টিকিট। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি। তার ভাষ্য, দর্শক না এলে প্রদর্শনী বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
শুধু টিকিট বিক্রির সংকট নয়, সিনেমা চালানোর নিয়মিত খরচ নিয়েও উদ্বিগ্ন হলমালিকেরা। লায়ন সিনেমাসের কর্ণধার মির্জা আবদুল খালেক বলেন, ‘সিনেমা প্রদর্শনের আগে পোস্টার ছাপানোসহ প্রচারণার নানা খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু দর্শক না এলে সেই বিনিয়োগের সুফল মেলে না। তার ভাষ্য, ‘অনুরোধে সিনেমা চালাতে গিয়ে অনেক সময় হলমালিকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’
সিনেমার মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন লায়ন সিনেমাসের এই কর্ণধার। তার মতে, একজন দর্শককে সিনেমা দেখতে গেলে টিকিটের বাইরে যাতায়াত ও অন্যান্য খরচও করতে হয়। সব মিলিয়ে যে অর্থ ব্যয় হয়, সিনেমা দেখে তার যথাযথ মূল্য না পেলে দর্শক প্রেক্ষাগৃহে আসতে আগ্রহী হবেন না।
রাজশাহীর গ্র্যান্ড রিভারভিউ সিনেপ্লেক্সেও একই চিত্র। প্রতিষ্ঠানটির বিভাগীয় প্রধান (এইচওডি) মেহেদি হাসানের তথ্য অনুযায়ী, টিকিট বিক্রি না হওয়ায় এখন পর্যন্ত ‘কাট-পিস’-এর কোনো শো চালানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে, ‘চিরকুট’-এর প্রতিটি প্রদর্শনীতে গড়ে ২০ থেকে ২৫টি টিকিট বিক্রি হচ্ছে। এই আয় দিয়ে প্রেক্ষাগৃহের নিয়মিত ব্যয় মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। মেহেদির মতে, পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবে ‘চিরকুট’ প্রত্যাশিতভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারেনি। পূজার ছুটি শেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় খুললে দর্শকসংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশা করছেন তিনি।
বরিশালের অভিরুচি সিনেমা হলেও সিনেমাগুলোর প্রদর্শনীতে দর্শকসংকট দেখা গেছে। স্নেহের বন্ধনের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, প্রথম দিন দুপুরের শোতে দর্শক ছিলেন ছয়জন, সন্ধ্যায় নয়জন। শনিবার দুপুরের শোতে চারটি এবং বিকেলের শোতে মাত্র দুটি টিকিট বিক্রি হয়। দর্শক না থাকায় রাতের ও বিশেষ প্রদর্শনী বন্ধ রাখতে হয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি বলে জানান তিনি। তার মতে, বরিশালে এমনিতেই সিনেমার বাজার সীমিত; ভালো গল্পের সিনেমা হলে কিছু দর্শক পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, উল্কা সিনেমা হলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ রফিক উদ্দিন জানান, পূজায় প্রত্যাশা অনুযায়ী দর্শক না থাকলেও প্রথম দুই দিনে প্রায় ২০ হাজার টাকার টিকিট বিক্রি হয়েছে। তৃতীয় দিনে দর্শকসংখ্যা কমেছে। তবে বাংলা সিনেমা নিয়ে তারা এখনও আশাবাদী।
পূজাকে কেন্দ্র করে মুক্তি পাওয়া তিন সিনেমার গল্প ও বিষয়বস্তুতে ছিল ভিন্নতা। পোশাকশিল্পের অন্ধকার জগত নিয়ে ইফফাত জাহান মম নির্মাণ করেছেন ‘কাট-পিস’। এতে অভিনয় করেছেন সিফাত আমিন শুভ, রাফাহ নানজীবা তোরসা প্রমুখ। নব্বইয়ের দশকের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্য ঘটনা ও ক্যাম্পাসের স্মৃতিনির্ভর সিনেমা ‘চিরকুট’ পরিচালনা করেছেন মুনতাসির আকিব। এতে নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেছেন নির্মাতার স্ত্রী আজিজুন মিম। এতে আরও অভিনয় করেছেন শ্যামল মাওলা, কাজী নওশাবা আহমেদ, সুমন পাটোয়ারী প্রমুখ। জয় চৌধুরী ও মৌ খান অভিনীত পারিবারিক গল্পের সিনেমা ‘স্নেহের বন্ধন’ পরিচালনা করেছেন কামরুজ্জামান।
তবে সিনেমাগুলো থেকে দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নিলেও সিনেমা সংশ্লিষ্টরা সোশ্যাল মিডিয়ায় বলছেন ভিন্নকথা। প্রচার-প্রচারণায় ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজেরাই নিজেদের সিনেমাকে হিট তকমা দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
