নতুনপাতা
শারদ ১৪৩৩
নতুন বারান্দা
শারদীয়া পদ্মকথা
কৃশানু ভট্টাচার্য্য
১৮ অক্টোবর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
আজ দ্বিতীয় সপ্তমী। অন্য বার যেমন পুজোতে একটা সপ্তমী থাকে এবারে আবার দুটো। আজ সকাল থেকে প্রীতিসার বাবা বাড়িতে নেই। বাবা গেছে রানাঘাট ছাড়িয়ে কালীনারায়নপুরে। পাড়ার পুজোতে ফুল আনতে হবে। বিশেষ করে পদ্মফুল। সোমবার সকালবেলাতেই পুজোর সময় ওই ফুল ছাড়া কোন কাজই না কি হবে না। কালীনারায়নপুরে মস্ত ফুলের হাট বসে। স্বাভাবিকভাবেই সকালে প্রীতিসার বাড়িতেই কেটে গেল।
বাবা ফিরল দুপুরবেলায়। যথারীতি দুপুরের খাবার পর এক ঝুড়ি প্রশ্ন নিয়ে প্রীতিসা হাজির হলো বাবার কাছে। বাবা যার কাছ থেকে ফুল নিয়েছে তার নাম নাকি জাহিরুদ্দিন। সে অনেকদিন ধরেই নাকি ওদের পাড়ার পুজোর ফুল দেয়। একবার পঞ্চমীর দিন আর দ্বিতীয়বার সপ্তমীর দিন গিয়ে নাকি বাবারা অনেকদিন ধরেই তার কাছ থেকে ফুল নিয়ে আসে। এবারও তাই সেই জাহিরউদ্দিনের কাছে গিয়েছিল বাবা আর বাবার এক বন্ধু।
" আচ্ছা বাবা, জাহিরউদ্দিন মানে তো মুসলমান। উনার কাছ থেকে তোমরা ফুল আন? ওই যে সেদিনকে একজন চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে টিভিতে বলছিলো যে দুর্গাপুজো নাকি আমাদের হিন্দুদের উৎসব।"
কিছুটা থতমত খেয়ে ওর বাবা বললেন, " না মানে দুর্গাপূজা আসলে হিন্দুদের উৎসব হলেও এই পুজোতে যে যে জিনিস লাগে তার অনেকগুলোই বিভিন্ন লোকে সারাবছর বিভিন্ন জায়গায় তৈরি করে। সে মা দুর্গার পিছনে শোলার সাজ, এই যে আমরা পদ্ম নিয়ে এলাম এগুলো তৈরি হয় গ্রামে। এখানে এসব তৈরি করার সময় কে হিন্দু, কে মুসলমান এসব বিচার করা হয় না। পুজো যারই হোক না কেন, এটাতো আমাদের জাতীয় উৎসব। উৎসব সবার। "
আপাতত বিষয়টা মাথায় না ঢুকলেও প্রীতিসা এবার প্রশ্নটা আরেকটু কঠিন করলো।
" আচ্ছা, এই যে তুমি ১০৮ খানা পদ্ম বলছো, এটা কেন? ১০৯ খানাই বা নয় কেন বা ১০৫ খানায় বা নয় কেন? "
"এটাতো একটা পদ্ধতি, মা। সেই রামায়ণে আছে রামচন্দ্র অকালবোধন করবার সময় ১০৮ টা পদ্ম মায়ের চরণে নিবেদন করবেন ঠিক করেছিলেন। সেখানেই তো সেই বিপত্তি। ১০৮ টা পদ্ম জোগাড় করতে পারেননি। শেষমেষ নিজের চোখের মণি দিয়ে তিনি মাকে নিবেদন করতে যাচ্ছিলেন। রামায়ণে পরিস নি?"
এক লাফে নিজের বইয়ের তাক থেকে প্রীতীসা 'ছবিতে রামায়ণ 'নিয়ে চলে এলো। সত্যিই তো সেখানে লেখা আছে এই গল্পের কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সংখ্যাটা ১০৮ কেন?
বাবা বললেন, " দ্যাখ জ্যোর্তিবিজ্ঞান বলছে, পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব সূর্যের ব্যাসের প্রায় ১০৮ গুণ। আবার পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব চাঁদের ব্যাসের প্রায় ১০৮ গুণ। মনে হয় , এই হিসেব থেকে এই সংখ্যাটা এসেছে। আর তারপর এই ১০৮ সংখ্যাটাকে মাথায় রেখেই মানুষ জপ করেন। দেখিস নি, তোর মামা বাড়িতে দিদা ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে বসে ১০৮ বার জপ করেন।"
বাবা বলে চললেন, "আর এর পিছনে একটা অংকের গল্প আছে রে। দেখ ১০৮ সংখ্যাটা বেশ মজাদার। "
প্রীতিসা বলল, কি রকম?
"১০৮ এ কটা সংখ্যা আছে, আর কি কি?"
" কেন এক, শূন্য , আর আট। " "তিনটাকে যোগ কর। কত হবে?
" কেন ৯।"
" দ্যাখ ৯ দিয়ে ১০৮ কে ভাগ করলে কত হয়? ১২। অনেকে বলেন, জ্যোতিষীরা যে হিসেব করেন সেখানে রয়েছে বারোটা রাশি আর নটা গ্রহ। এই দুয়ের গুনফলেও কিন্তু ওই ১৮০ আসছে।"
প্রীতিসা বুঝতে পারলো, এই ১০৮ সংখ্যাটা আসলে নানা দিক থেকে ব্যাখ্যা করা যায়। ইতিমধ্যে আবার বাবাকে ডাকতে চলে এসেছে পাড়ার এক কাকু।
কাজেই এই প্রশ্নোত্তরের পালাটা পুরোটা শেষ হলো না। তবে প্রীতিসা মনে মনে ঠিক করে রাখল বাবা আসলে এসে প্রশ্ন করবে অন্য কোন ফুল নয় কেন? কেন এই পুজোতে শুধু পদ্মফুল দেওয়া হয়? সেটা কি পদ্ম আমাদের জাতীয় ফুল বলে?
