করোনাকালে চাকরি হারানোর পর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও বকেয়া বেতন, বোনাস ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পাননি চট্টগ্রামের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি চিটাগং (ইউএসটিসি) এবং এর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতালের (বিবিএমএইচ) একদল সাবেক শ্রমিক-কর্মচারী। চাকরিচ্যুতির পর দীর্ঘদিন বেকার থাকা, আর্থিক সংকট এবং ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলার কারণে তাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
শ্রমিকদের অভিযোগ, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে সাধারণ ছুটির সময় কোনো কার্যকর আলোচনার সুযোগ না দিয়েই তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়। এরপর বকেয়া পাওনা আদায় এবং চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেও তারা প্রতিকার পাননি। উল্টো শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়েছে বলে তাদের দাবি।
প্রতিষ্ঠানের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান আহমেদ ইফতেখারুল ইসলাম, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দিলীপ কুমার বড়ুয়া এবং ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. কামরুল হাসানের যোগসাজশে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন নিম্ন বেতনভুক্ত শ্রমিক-কর্মচারীকে অবৈধ ও অমানবিক উপায়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ ২০–২৫ বছর সেবা দেওয়ার পরও তাদের আইনসম্মত প্রভিডেন্ট ফান্ড, বকেয়া বেতন ও বোনাস না দিয়ে রাস্তায় বসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি শ্রমিকদের।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক বিশেষ সহকারী বিপ্লব বড়ুয়ার ঘনিষ্ঠ ইউএসটিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দিলীপ কুমার বড়ুয়াকে দিয়ে শ্রমিকদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা দায়ের করানো হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ইউএসটিসি কর্মচারী ইউনিয়নের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতাল মিলিয়ে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন নিম্ন বেতনভুক্ত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। তাদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে কাজ করেছেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর আয়-রোজগারের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের পরিবারগুলো আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে বলে অভিযোগ ইউনিয়নটির।
পাওনা না পেয়ে সংকটে পরিবারগুলো
শ্রমিকদের অভিযোগ, চাকরিচ্যুতির পর থেকে তাদের বকেয়া বেতন-বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ডসহ আইন অনুযায়ী প্রাপ্য অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পরিশোধ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত আয় ছাড়াই সংসার চালাতে হচ্ছে তাদের। সন্তানদের পড়াশোনা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় এবং অন্যান্য মৌলিক চাহিদা মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন চাকরি করার পরও প্রাপ্য অর্থ না পাওয়ায় অনেক শ্রমিক তাদের সঞ্চয় হারিয়েছেন এবং ঋণ বা অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরি হারানোর পাশাপাশি পাওনা আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন দপ্তরে দপ্তরে ঘোরা ও মামলা মোকাবিলা তাদের সংকট আরও বাড়িয়েছে।
এ বিষয়ে শ্রমিক আবদুল আজিজ বলেন, আমরা দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবন যাপন করছি। ইউএসটিসি আমাদের পাওনা বুঝিয়ে না দিয়ে উল্টো একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করছে। কোনো মামলাতেই ইউএসটিসি জিততে না পারলেও মামলা দেওয়া বন্ধ করছে না।
ইউএসটিসি কর্মচারী ইউনিয়ন চাকরিচ্যুতির বিষয়ে শ্রম অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে লিখিতভাবে অভিযোগ দিয়েছে। শ্রম অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয় থেকে ২০২০ সালের ১০ মে তারিখে দেওয়া একটি চিঠিতে বিষয়টি উল্লেখ করে শ্রমিক ছাঁটাই প্রত্যাহার এবং শ্রম আইন অনুসরণ করে ইউএসটিসিকে পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ইউনিয়নের দাবি, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ ও চাকরিচ্যুতির বিষয়টি সমাধানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়েও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তৎকালীন চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের কাছেও সহায়তা চাওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ শ্রমিকদের।
শ্রমিকদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েও বকেয়া পাওনা আদায় বা চাকরিচ্যুতির বিষয়ে কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, আমরা শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছি। কিন্তু ইউএসটিসি কেন পাওনা পরিশোধ করছে না, সেটা খোঁজ নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা
শ্রমিক ইউনিয়নের অভিযোগ, চাকরিচ্যুতির প্রতিবাদ ও পাওনা আদায়ের দাবিতে সংগঠিত হওয়ার পর ইউনিয়ন প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা করা হয়েছে। তাদের দাবি, এসব মামলা তাদের আন্দোলন ও পাওনা আদায়ের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং আইনি লড়াই চালাতে গিয়ে আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
ইউনিয়নের দেওয়া নথিতে সাতধারা, সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ আইন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত আইনে মামলার উল্লেখ রয়েছে। শ্রমিক প্রতিনিধিদের দাবি, চাকরিচ্যুতি ও বকেয়া পাওনার বিষয়ে ন্যায়বিচার চাওয়ার কারণে তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তারা মামলাগুলোর নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এবং আইন অনুযায়ী প্রতিকার চান।
চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের দাবি, তাদের পাওনা নির্ধারণ করে দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে চাকরিচ্যুতির প্রক্রিয়ায় শ্রম আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ কোথায় রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলোর প্রকৃতি ও ভিত্তি কী—এসব বিষয় নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে।
শ্রমিকদের অভিযোগের বিষয়ে শ্রম অধিদপ্তর, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট পুলিশ প্রশাসন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আদালতের মাধ্যমে আইনসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শ্রমিকেরা।
দীর্ঘদিনের কর্মজীবনের পর চাকরি হারিয়ে এবং প্রাপ্য অর্থ না পেয়ে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবন কাটানোর অভিযোগ করা এসব শ্রমিক এখন কার্যকর প্রতিকারের অপেক্ষায়। তাদের দাবি, আর আবেদন-নিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন অভিযোগগুলোর তদন্ত, পাওনা নির্ধারণ এবং আইনগত প্রতিকারের বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়।
