সোমবার বিকাল। মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারের ফলের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম। পাশে সাত বছরের ছেলে তানভীর। ছেলে আঙুল তুলে দেখাল রঙিন আপেলের সারি। ‘আব্বু, আপেল নেব।’
রফিকুল দাম জিজ্ঞেস করলেন। ‘লাল আপেল ৩৮০, সবুজ ৪০০ টাকা কেজি।’ এক মুহূর্ত চুপ থাকলেন। তারপর আস্তে করে ছেলের হাত ধরলেন। ‘চলো বাবা।’
ছেলে বুঝল না কেন চলে যেতে হলো। বাবা বুঝিয়ে বলার ভাষা খুঁজে পেলেন না। সন্তানের ছোট্ট আবদার পূরণ করতে না পারার এই কষ্টই এখন রাজধানীর বহু নিম্ন আয়ের পরিবারের নিত্যসঙ্গী।
একসময় সাধারণ মানুষের নিয়মিত কেনাকাটার অংশ ছিল যে ফল, তা এখন অনেকের কাছেই বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। কারওয়ান বাজার, শ্যামলী
ও মোহাম্মদপুরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমদানি করা ফলের দাম কেজিপ্রতি ৪০০ টাকার বেশি। একটি আপেল কিনতেও গুনতে হচ্ছে ৪২ থেকে ৫৬ টাকা। ফলে পুষ্টিকর খাবারের তালিকায় ফল রাখা অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাজধানীর বাজারে আমদানি করা ফলের দামের চিত্র রীতিমতো উদ্বেগজনক। মান ও আকারভেদে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে ৪২০ টাকায়। সবুজ আপেল ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং লাল আপেল ৩৮০ থেকে ৪৫০ টাকা। কমলার দাম কেজিপ্রতি ৪৫০ টাকা। সবুজ আঙুর ৫০০ থেকে ৫২০ টাকা এবং লাল আঙুর ৪৬০ থেকে ৪৮০ টাকা। নাশপাতি ৩৫০ থেকে ৩৬০ টাকা, বেদানা ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা।
খেজুরের দামও আকাশছোঁয়া। বাংলা খেজুর প্রতি কেজি ২৫০ টাকায় পাওয়া গেলেও প্রিমিয়াম খেজুর বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ টাকায়।
তবে কেজিপ্রতি দামের চেয়েও বেশি ভোগান্তির হিসাব মেলে একটি করে ফলের দাম বিবেচনায় নিলে। কারণ নিম্ন ও মধ্য আয়ের অনেক ক্রেতা কেজি ধরে ফল কেনেন না; সামর্থ্য অনুযায়ী একটি বা দুটি কেনেন। পাঁচটি আমদানি করা মাল্টায় এক কেজি হওয়ায় প্রতিটির দাম পড়ছে ৭০ থেকে ৮৪ টাকা। এক কেজি সবুজ আপেল প্রায় নয়টি হওয়ায় প্রতিটির দাম পড়ে ৪৪ থেকে ৫০ টাকা। লাল আপেল আট থেকে নয়টিতে এক কেজি হওয়ায় প্রতিটির দাম ৪২ থেকে ৫৬ টাকা। আর চারটি বেদানায় এক কেজি হলে প্রতিটির দাম দাঁড়ায় ১২৫ থেকে ১৬২ টাকা। অর্থাৎ একটি বেদানা কিনতেই একজন দিনমজুরকে তার দৈনিক আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় করতে হবে।
আমদানি করা ফলের চড়া দামের মধ্যে ভরসা হয়ে উঠেছে তুলনামূলক কম দামের দেশি ফল। প্রতি কেজি দেশি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১২০ টাকায়, যেখানে আমদানি করা মাল্টার দাম ৪০০ থেকে ৪২০ টাকা। দেশি মাল্টা চার থেকে ছয়টিতে এক কেজি হওয়ায় প্রতিটির দাম পড়ছে ২০ থেকে ৩০ টাকা। অর্থাৎ আমদানি করা মাল্টার তুলনায় দেশি মাল্টা তিন থেকে চার গুণ সস্তা। ড্রাগন ফল পাওয়া যাচ্ছে কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজারে আমলকী বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকায়। পাকা আমড়া ৮০ টাকা এবং কাঁচা আমড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। পানিফল ৪০ টাকা, জাম্বুরা ৯০ থেকে ১০০ টাকা এবং পেঁপে ৬০ টাকা কেজি। কদবেল ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কামরাঙা ৬০ থেকে ৭০ টাকা। চালতা পাওয়া যাচ্ছে প্রতিটি মাত্র ৫ টাকায়। আনারস প্রতিটি ৮০ থেকে ১০০ টাকা এবং তাল ১০০ থেকে ১২০ টাকা। এসব ফলই এখন অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের কাছে আপেল-কমলার বিকল্প।
দামি ফল নয়, দেশি ফলেই মিলবে পুষ্টি— বলছেন চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সুস্থ থাকতে নিয়মিত ফল খাওয়া জরুরি। তবে পুষ্টির জন্য যে দামি ফল খেতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই।’
তিনি জানান, কলা, পেয়ারা, আমলকী, লটকনসহ দেশি ও তুলনামূলক কম দামের ফলেও প্রচুর পুষ্টিগুণ রয়েছে। তার ভাষ্য, দামি আপেল খাওয়ার পরিবর্তে প্রতিদিন একটি কলা খেলেও পুষ্টির চাহিদা পূরণে সহায়তা পাওয়া যায়।
তার পরামর্শ, সহজলভ্য ও কম দামের দেশি ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। কারণ সব ফলেই কোনো না কোনো পুষ্টিগুণ রয়েছে।
ফলের তালিকা থেকে বাদ পড়ছে আপেল-কমলা : হাজারীবাগের গার্মেন্টকর্মী সুমি বেগম বলেন, ‘শেষ কবে আপেল কিনেছি তা মনে নাই। আমড়া আর কদবেল কিনি। এটাই এখন আমাদের ফল। আপেল-কমলা তো স্বপ্নের জিনিস।’
শুধু নিম্ন আয়ের পরিবার নয়, মধ্যবিত্তের খাবারের তালিকাতেও ফলের জায়গা কমে আসছে। মিরপুরের গৃহিণী রেহানা বেগম বলেন, ‘আগে সপ্তাহে না পারলেও মাসে একবার ফল কিনতাম। তখন আপেল ছিল ২৪০ টাকা, মাল্টা ২৮০ টাকায় কিনে খাওয়াতাম ছেলেমেয়েদের। এখন দুই মাসে একবারও কেনা হয় না। ছেলে বলে আপেল খাবে, বলি পরে কিনব। কিন্তু পরে আর কেনা হয় না। এখন পেয়ারা, কলা এগুলো নিয়মিত কিনি।’
দাম বাড়ার পেছনে স্বচ্ছতার অভাব : কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ফল আমদানি পর্যায়ের দাম ও খুচরা বাজারের দামের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। আমদানি করা ফলের গ্রেডিং ও শুল্কের পরিমাণ নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রেডিংয়ের অস্পষ্টতাকে কাজে লাগিয়ে শুল্ক ফাঁকি ও ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে কোন গ্রেডের ফলে কত শুল্ক দিতে হয় এবং আমদানি মূল্য কত, তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা জরুরি।
তিনি বলেন, ফলের দাম নিয়ন্ত্রণে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। আমদানি থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত দামের ব্যবধান ও শুল্কের হিসাব স্বচ্ছ থাকলে অনিয়ম শনাক্ত করা সহজ হবে।
পুষ্টির ঘাটতি শুধু ব্যক্তিগত সামর্থ্যরে বিষয় নয় : ফলের বাজারে দামের এই ব্যবধান কেবল কেনাকাটার হিসাব নয়; এটি সাধারণ মানুষের পুষ্টি গ্রহণের সামর্থ্যরে সঙ্গেও জড়িত। যাদের আয় সীমিত, তাদের কাছে ফল কেনার সিদ্ধান্ত এখন পুষ্টির চাহিদা পূরণের চেয়ে সংসারের অন্য খরচের হিসাবের ওপর নির্ভর করছে। দামি ফল বাদ দিয়ে দেশি ফল বেছে নেওয়া বাস্তবসম্মত বিকল্প হতে পারে, কিন্তু সেই বিকল্পের দামও যদি বাড়তে থাকে, তাহলে স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
