শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি শেষে শিক্ষার্থীদের পদচারণায় আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) ক্যাম্পাস। দীর্ঘ নয় দিনের বিরতি শেষে বন্ধুদের সঙ্গে পুনর্মিলন, আড্ডা আর চেনা পরিবেশের কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে গত ১৭ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের সাপ্তাহিক ছুটি ও পাঁচ দিনের প্রশাসনিক ছুটিসহ মোট নয় দিনের ছুটি পান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। এ সময়ে ক্লাস-পরীক্ষার ব্যস্ততা কমে আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসজুড়ে নেমে এসেছিল অনেকটা নীরবতা। ছুটি শেষে শিক্ষার্থীরা ফিরতে শুরু করায় সেই নীরবতা ভেঙে ক্যাম্পাস ফিরে পেয়েছে তার চিরচেনা ছন্দ।
হিন্দুধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের কাছে এই ছুটি ছিল ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন ও পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির বিশেষ উপলক্ষ। মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, স্বজনদের সান্নিধ্য আর উৎসবের নানা স্মৃতি নিয়ে তারা ফিরেছেন ক্যাম্পাসে। অন্যদিকে, অন্যান্য ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরাও পরিবার ও প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়েছেন।
ছুটি শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের চিরচেনা আড্ডার স্থান কড়ইতলা, অদম্য একাত্তর সহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় আবারও জমে উঠেছে শিক্ষার্থীদের আড্ডা। দীর্ঘদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, ছুটির অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি এবং নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় ফেরার মধ্য দিয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ।
প্রবাসী বাবার সাথে ১৮ বছর পর পূজার স্মৃতি নিয়ে রসায়ন বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী সম্পা সাহা বলেন,
"উৎসবের আবহ আর নতুন পোশাকের উচ্ছ্বাসের চেয়েও আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল প্রবাসী বাবার সান্নিধ্য। দীর্ঘ ১৮ বছরের অপেক্ষার পর অবশেষে বাবার সাথে পূজার আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার পরম সুযোগ হয়েছে। মাত্র ৯ দিনের এই ছুটিতে বাবার সাথে কাটানো স্মৃতির রেখা হৃদয়ে নিয়ে ফিরলাম আমাদের প্রিয় প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসে। ছুটি শেষে চেনা মুখের কোলাহল ও সহপাঠীদের নতুন উৎসাহ নিয়ে আবারও শুরু হলো বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দৈনন্দিন পথচলা।
ক্যাম্পাস জীবনের শেষ দিনগুলোর আবেগ প্রকাশ করে ফিশারিজ এন্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী জাকওয়ানা জুই বলেন,
"দীর্ঘ ছুটি শেষে আবারও চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে যবিপ্রবি ক্যাম্পাস। ছুটি কাটিয়ে চেনা মুখদের মাঝে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। তবে আসন্ন গ্র্যাজুয়েশন মনে করিয়ে দেয় ক্যাম্পাস জীবনের রঙিন দিনগুলো ধীরে ধীরে শেষের দিকে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি মুহূর্ত এখন আগের চেয়েও মূল্যবান। একদিন হয়তো নিয়মিত আর ফেরা হবে না, কিন্তু প্রিয় প্রাঙ্গণের এই স্মৃতি আর মায়ার টান অমলিন থাকবে আজীবন।"
মায়ের ভালোবাসার স্মৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী মোঃ হাবিবুর বলেন,
"যান্ত্রিক ব্যস্ততা ছেড়ে পূজার ছুটিতে গ্রামে ফেরাটা ছিল পরিবার ও শৈশবের বন্ধুদের কাছে ফেরার এক পরম সুযোগ। আসার সময় মা যে ভালোবাসায় দলা-পাকানো কিছু টাকা আর প্রিয় খাবার হাতে গুঁজে দেন, তা শহরের হাজার টাকার চেয়েও দামি। ধর্মীয় উৎসবের এই ছুটিতে যেমন প্রীতি ও সম্প্রীতির বন্ধন অনুভব করেছি, তেমনই ছুটি শেষে চেনা মুখগুলোর কোলাহলে প্রিয় ক্যাম্পাসটিও আবার নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। মায়ের এই ভালোবাসার ছায়া, আমাদের সামাজিক সম্প্রীতি আর ক্যাম্পাসের এই প্রাণবন্ত মুখরতা যেন চিরকাল অমলিন থাকে।"
ক্যাম্পাসের আবেগ ও ভালোবাসার কথা উল্লেখ করে ফিশারিজ এন্ড মেরিন বায়োসায়েন্স বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী সিয়াম আহমেদ বলেন,
"দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিতে পরিবার ও পরিজনদের সঙ্গ পেয়ে মনটা সতেজ হয়ে উঠেছিল। তবে ছুটি শেষে প্রিয় ক্যাম্পাসে ফেরা সবসময়ই এক অন্যরকম আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। বন্ধুদের কোলাহল, মাঠের খেলাধুলা আর চেনা পরিবেশের প্রতি যে টান অনুভব করছিলাম, ক্যাম্পাসে ফিরে তা পূর্ণতা পেল। ক্যাম্পাস কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের জীবনের আরেকটি আবেগঘেরা ঠিকানা, যেখানে তৈরি হয় জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো।"
উৎসব শেষে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ফেরার আবেগঘন মুহূর্ত তুলে ধরে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী রোহিত রোহান বলেন, "শরতের কাশের শুভ্রতায় আসা পূজার ছুটি যেন ব্যস্ততা পেরিয়ে পরম স্বস্তির এক টুকরো মুক্তি। মেসের চার দেয়াল ছেড়ে ঘরে ফিরে মা-বাবার সান্নিধ্য, আনন্দ আর উৎসবের আবহে মুহূর্তেই উবে যায় সব ক্লান্তি। তবে বিসর্জনের সুর বাজে উৎসব শেষে ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ফেরার মুহূর্তেও। স্মৃতিময় দিনগুলো পিছে ফেলে প্রিয় ক্যাম্পাসে ফেরাটা কিছুটা আবেগঘন হলেও, সহপাঠীদের চেনা কোলাহলে নতুন উৎসাহ নিয়ে শুরু হয় জীবনের পথচলা।"
