এক সময়ের মাছ কেনাবেচার জন্য পরিচিত ছিল ঘাটটি। সময়ের পরিক্রমায় মেঘনার সেই ঘাটই এখন হয়ে উঠছে দর্শনার্থীদের আকর্ষণ। নদীর শীতল বাতাস, নৌকার চলাচল, সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য আর নদীপাড়ের মনোরম পরিবেশে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। সম্ভাবনাময় এই স্থানটির নাম সাজু মোল্লার ঘাট। লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার হায়দরগঞ্জ-সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরে অবস্থিত ঘাটটি ধীরে ধীরে স্থানীয় বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
উপজেলা শহর থেকে প্রয় ১৪ কি.মি. দুরে অবস্থিত এই ঘাট, বিকেল গড়াতেই ঘাটে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেন, আবার কেউ নদীর পাড়ে বসে উপভোগ করেন প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য। মেঘনার বুকে মাছ ধরার নৌকার চলাচল, জোয়ার-ভাটার দৃশ্য আর দিগন্তজোড়া জলরাশি দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। নদীপাড়ের রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, খাবারের স্টল ও বসার স্থানও বাড়িয়েছে ঘাটটির আকর্ষণ।
বিজ্ঞাপন
ঘাটের চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আর খোলা পরিবেশ নগরজীবনের কোলাহল থেকে কিছুটা স্বস্তি খুঁজে পাওয়া মানুষের জন্য তৈরি করেছে ভিন্ন এক আবহ। ছুটির দিনে স্থানীয়দের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ এখানে ঘুরতে আসছেন।
-b63e14.jpg)
ঘুরতে আসা দর্শনার্থীদের কাছে নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই ঘাটটির প্রধান আকর্ষণ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা নদীর পাড়ে বসে ছবি তোলার জন্য অনেকেই বেছে নিচ্ছেন স্থানটি।
রায়পুর থেকে আসা ওসমান গনি নামে এক দর্শনার্থী বলেন, ‘মেঘনার পাড়ের পরিবেশটা বেশ সুন্দর। নদীর বাতাস আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি ভালো লাগে। পরিবার নিয়ে কিছু সময় কাটানোর জন্য জায়গাটি আকর্ষণীয়। আগে বসার জায়গা ছিলো না, এখন উপজেলা প্রসাশনের উদ্যোগে ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ’ করা হয়েছে এখন ভালো লাগে।’
আরেক দর্শনার্থীর হারুনুর রশিদ বলেন, ‘বিকেলে নদীর পাড়ে এলে মনটা ভালো হয়ে যায়। নৌকার চলাচল আর নদীর বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখতে ভালো লাগে। জায়গাটিকে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাজানো হয়েছে রায়পুরের বাইরের মানুষও এখানে ঘুরতে আসেন।
স্থানীয় এক তরুণ দর্শনার্থী মোশারফ হোসেন বলেন, ‘বন্ধুদের সঙ্গে অবসর কাটানোর জন্য জায়গাটি ভালো। তবে ময়লা ফেলার নির্দিষ্ট স্থান, পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা থাকলে দর্শনার্থীদের জন্য আরও সুবিধা হবে।’
দর্শনার্থীদের আনাগোনাকে কেন্দ্র করে ঘাটের আশপাশে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন খাবারের দোকান, চায়ের স্টল ও ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে দর্শনার্থীদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও আসছেন। ফলে ঘাটটি বিনোদনের স্থান হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
ঘাটসংলগ্ন এক খাবারের দোকানের মালিক আজিম বলেন, ‘এখানে মানুষ ঘুরতে এলে খাবার ও চা-নাশতার প্রয়োজন হয়। দর্শনার্থীদের আসা-যাওয়া থাকায় আমাদের ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। জায়গাটি প্রসাশনের উদ্যোগে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর করা হয়েছে মানুষের আগমন বাড়ছে, এতে ব্যবসাও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
আরেক স্থানীয় ব্যবসায়ী আক্কাস পাটোয়ারী বলেন, ‘ঘাটকে ঘিরে ছোট ব্যবসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে ব্যবসার পরিবেশ ভালো রাখতে পরিচ্ছন্নতা, নির্দিষ্ট দোকানব্যবস্থা এবং যানবাহন চলাচলের সুবিধা দরকার। পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
ঘাটের ব্যবসায়ীদের মতে, পর্যটকদের জন্য মানসম্মত খাবার, নির্ধারিত মূল্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ভালো সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ঘাটটির প্রতি মানুষের আগ্রহ আরও বাড়বে। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাও উপকৃত হতে পারেন।
পর্যটন সম্ভাবনাময় এই স্থানটির পরিবেশ সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন রাখতে উদ্যোগ নিয়েছে রায়পুর উপজেলা প্রশাসন। এর অংশ হিসেবে মেঘনার পাড়ে ‘পরিচ্ছন্ন প্রাঙ্গণ’ নামে একটি স্থানের উদ্বোধন করা হয়েছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য ঘাটের পরিবেশ সুন্দর রাখা এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো।
তবে শুধু সৌন্দর্যবর্ধন নয়, ঘাটটির আকর্ষণ ধরে রাখতে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং দর্শনার্থীদের সচেতন অংশগ্রহণও জরুরি। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা ও প্লাস্টিকের বর্জ্য নদীপাড়ের পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই ঘাটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও দর্শনার্থীদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে সাজু মোল্লার ঘাট লক্ষ্মীপুর জেলার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনোদনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এ জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, মানসম্মত বসার স্থান, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, নির্দিষ্ট বর্জ্য ফেলার স্থান এবং নদীপাড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশু ও বয়স্ক দর্শনার্থীদের সুবিধার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া দরকার।
মেঘনাকেন্দ্রিক পর্যটন বিকশিত হলে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খাবারের দোকান, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও অন্যান্য সেবাদাতার আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
একসময় মাছ কেনাবেচার ব্যস্ততায় মুখর থাকা সাজু মোল্লার ঘাট এখন নতুন পরিচয়ের পথে। মেঘনার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, প্রশাসনের পরিচ্ছন্নতা উদ্যোগ এবং স্থানীয় মানুষের আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে স্থানটিকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা গেলে এটি রায়পুরের পর্যটন মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে এখন প্রয়োজন ধারাবাহিক পরিচর্যা, পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।
এমএইচ
