ওমরাহ করতে গিয়ে হুথির হামলায় প্রাণ হারালেন মাদ্রাসা শিক্ষক নাসরুল্লাহ
কম ডেটা ব্যবহার করতে শুধু টেক্সট পড়ুন

ছবির উৎস, probashi.gov.bd
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-থ্রিতে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে।
ঢাকায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী নিহতরা হলেন- কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মোঃ নাসরুল্লাহ বদরপুরি এবং বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে মো: শাহেদ আহম্মেদ।
"গতকাল অপরাহ্ন আনুমানিক ৩:২০ ঘটিকায় রিয়াদের কিং খালেদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের টার্মিনাল-৩ এর উপর একটি ক্ষেপনাস্ত্র এসে পড়ে। এ সময় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের যাত্রী সেখানে অপেক্ষমান ছিল। দুঘটনায় ওই দুইজন বাংলাদেশী নাগরিক মৃত্যুবরণ করেছেন," মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
এর মধ্যে মি. বদরপুরি ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন বলে বিবিসি বাংলার কাছে নিশ্চিত করেছেন তার ভগ্নীপতি মাওলানা মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন । অন্যদিকে শাহেদ আহম্মেদ সৌদি আরবেই কাজ করতেন।
মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, ওমরার উদ্দেশ্যে শনিবার সকালেই ঢাকা ছেড়েছিলেন নাসরুল্লাহ বদরপুরি এবং ২৪শে অক্টোবর তাদের দেশে ফেরার কথা।
"রিয়াদে নামার পর তাদের দুই ঘণ্টা ট্রানজিট ছিল। সেখান থেকে আলাদা ফ্লাইটে মক্কায় যাওয়ার কথা। ফ্লাইটে ওঠার জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন সময়ই হামলা হয়েছে বলে তার ওমরাহ দলে থাকা অন্যদের কাছ থেকে আমরা জানতে পেরেছি," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
তার দেওয়া তথ্য মতে, ঢাকার কামরাঙ্গীরচরের জামিয়া রবিউল উলুম মাদ্রাসার শিক্ষক নাসরুল্লাহ বদরপুরি যে দলের সাথে ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন সেই দলের মোট ৪৫ জনের মধ্যে ৩২জনই হামলায় অক্ষত ছিল।
"কিন্তু ওনি মারা গেলেন। আরেকজন যিনি মারা গেছেন তিনি সৌদি আরবেই কাজ করতেন। একজন দুই পা হারিয়েছে। আরও কয়েকজন আহত হয়েছে বলে জেনেছি আমরা"।
মি. বদরপুরি পরিবারে বাবা, মা, স্ত্রী ও তিনটি সন্তান আছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ছবির উৎস, Reuters
প্রসঙ্গত, শনিবারই রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত এবং আরও বাংলাদেশি গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসাধীন থাকার কথা আজ রোববার সকালে জানিয়েছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ওই হামলার পর বিমানবন্দর ঘোষণা করায় আজ ঢাকা-রিয়াদ রুটে পাঁচটি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের দুটি ফ্লাইট আছে।
ওদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, হামলায় আহত ৪ বাংলাদেশি স্থানীয় কিং খালিদ হাসপাতালের আইসিউতে চিকিৎসাধীন আছেন।
"আমরা প্রত্যেকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছি। বাংলাদেশ মিশন তাদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হতে সৌদি কর্তৃপক্ষের সাথে একযোগে কাজ করছে," তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষকে উদ্ধৃত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১০ই অক্টোবরের এই হামলায় বহু মানুষ আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র জানিয়েছে, হামলার সময় বিমানবন্দরে ছিলেন কিন্তু হামলার শিকার হননি এমন বাংলাদেশি যাত্রীদের দুটি হোটেল ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে রাখা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
রোববার সকালে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, হতাহত বাংলাদেশিদের বিস্তারিত তথ্য জানতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে রিয়াদের বাংলাদেশ মিশন সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
বাংলাদেশ নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে এবং আহতদের দ্রুত ও পূর্ণ সুস্থতা কামনা করেছে।
পরে বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান যে, "সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন, তারা সৌদির কিং খালেদ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। আমরা সবার পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করছি"।
প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, নিহত ও আহত ব্যক্তিদের নিজ নিজ জেলা এবং পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করছেন কর্মকর্তারা। পরিচয় ও অন্যান্য তথ্য নিশ্চিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। এই ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে তাদের মরদেহ বাংলাদেশে আনা হবে রাষ্ট্রীয় খরচে।
"এর আগেও যখন হুথিরা আক্রমণ করেছিল, সেখানে কিন্তু বাংলাদেশের একজন নিহত হয়েছিলেন, এখন দুজন নিহত হলেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিগত দিনে ১৪ জন বাংলাদেশিকে হারিয়েছি। আমরা আশা করব যে এই বিপর্যয় বন্ধ হবে, এই আক্রমণ বন্ধ হবে। এ ধরনের মৃত্যু আসলে মেনে নেওয়া অত্যন্ত কষ্টকর," বলেছেন তিনি।
তিনি জানান, সৌদি আরবে বাংলাদেশ সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে, হতাহতের অবস্থা জানার চেষ্টা করছে এবং বাংলাদেশিরা যতদূর সম্ভব নিরাপদে থাকতে পারেন, সে নির্দেশনা মিশনকে দেওয়া হচ্ছে।
পরে সন্ধ্যায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে নিহত দুজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশের কঠোর নিন্দা
এদিকে রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় দুইজন বাংলাদেশিসহ ১২ জন হতাহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, "বেসামরিক মানুষের জীবন বিপন্নকারী এবং বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে যে কোনো হামলা গ্রহণযোগ্য নয় এবং এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে"।
এই ঘটনায় সৌদি আরবের সঙ্গে সংহতি জানানোর পাশাপাশি সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের সমাধান বের করার আহ্বান আবারও জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
বিবৃতিতে বলা হয়, আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানাচ্ছে বাংলাদেশ।
প্রসঙ্গত, সৌদি কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত শনিবারের ওই হামলার ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে। এছাড়া আহতদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে।
দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। হামলার পর কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, শনিবার দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় দাম্মাম শহরের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছেও একটি ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে।
এর এক দিন আগে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তার আগের দিন বিমানবন্দরে দুটি হামলায় পাইলটসহ সৌদি আরবের তিন নাগরিক নিহত হন। এর আগে ৬ ও ৭ অক্টোবর সৌদি আরবের দুটি বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় আরও তিনজন নিহত হন। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে এসব হামলার অভিযোগ করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।
