দুর্নীতির মামলার বিচার চলছে বছরের পর বছর। তবু কমছে না মামলার জট। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা হাজার হাজার মামলা নিম্ন ও উচ্চ আদালতে ঝুলে আছে। চলতি বছরের আগস্ট শেষে দুদক ও বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মোট ৩ হাজার ৩৪৭টি মামলা বিচারাধীন ছিল। এর মধ্যে ৪৭৩টি মামলার বিচারিক কার্যক্রম উচ্চ আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। অন্যদিকে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ২৮৪টি মামলা। এর মধ্যে ১৩২টিতে আসামিরা খালাস পেয়েছেন, ১৩৮টিতে সাজা হয়েছে। ১৪ মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। নিষ্পত্তি হওয়া মামলার প্রায় ৪৭ শতাংশ। উচ্চ আদালতেও দুদকের ৪ হাজার ৮৪৬টি মামলা বিচারাধীন। মামলার এই দীর্ঘসূত্রতায় দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলার জট কমাতে বিশেষায়িত আদালত গঠন, উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং দুদকের নিজস্ব দক্ষ ও স্থায়ী প্রসিকিউশন গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি কমিশনের জনবল সংকট কাটিয়ে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে গতি আনার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা। দুদকের প্রসিকিউশন বিভাগের গত আগস্ট পর্যন্ত মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলার জট কমাতে তদন্ত ও মামলা দায়ের করার পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে বিশেষায়িত আদালত, উচ্চ আদালতে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা এবং কমিশনের নিজস্ব দক্ষ ও স্থায়ী প্রসিকিউশন গড়ে তোলা প্রয়োজন। দুদকের জনবল সংকটও মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে গতি আনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
বিচারাধীন ৩,৩৪৭ মামলা : দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত আগস্ট শেষে কমিশনের দায়ের করা ৩ হাজার ১৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৮০৫টি মামলা ঢাকায় এবং অন্য মামলা ঢাকার বাইরের আদালতগুলোতে বিচারাধীন। এর মধ্যে ২ হাজার ৭১৫টি মামলার বিচার চলছে, আর ৩০৪টি মামলা আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে।
অন্যদিকে, বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলের ৩২৮টি মামলা এখনও বিচারাধীন। এর মধ্যে ১৫৯টির বিচার চলছে এবং ১৬৯টি মামলা আদালতের আদেশে স্থগিত রয়েছে। কমিশন ও ব্যুরোর মামলা মিলিয়ে মোট বিচারাধীন ৩ হাজার ৩৪৭টির মধ্যে ২ হাজার ৮৭৪টির বিচার চলমান। বাকি ৪৭৩টি মামলা স্থগিত থাকায় সেগুলোর বিচারিক কার্যক্রম এগোচ্ছে না। অর্থাৎ বিচারাধীন মামলার প্রায় ১৪ শতাংশ স্থগিত রয়েছে।
বিচারাধীন মামলার এই চিত্র বলছে, নতুন মামলা ও তদন্তের পাশাপাশি পুরনো মামলাগুলো নিষ্পত্তি করাও দুদকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন মামলাগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং স্থগিত মামলাগুলোর জট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে মামলার সংখ্যা কমানো কঠিন হবে।
আট মাসে নিষ্পত্তি ২৮৪ মামলা : চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দুদকের ২৬২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩১টিতে আসামিদের সাজা, ১১৮টিতে খালাস এবং ১৩টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।
একই সময়ে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর ২২টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলার সাতটিতে সাজা, ১৪টিতে খালাস এবং একটি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে আট মাসে নিষ্পত্তি হওয়া ২৮৪টি মামলার মধ্যে ১৩৮টিতে সাজা এবং ১৩২টিতে খালাস হয়েছে। বাকি ১৪টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও মামলার নিষ্পত্তির গতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনের প্রসিকিউশন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কমিশন ও বিলুপ্ত ব্যুরোর মোট ২৬৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই নিষ্পত্তি হয়েছে ২৮৪টি মামলা, যা গত বছরের পুরো সময়ের চেয়ে ১৭টি বেশি।
এর আগে ২০২৪ সালে বিচারিক আদালতে দুদকের ২৯৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ১৩৮টিতে সাজা, ১১৬টিতে খালাস এবং ৪১টি মামলা অন্যভাবে নিষ্পত্তি হয়। ২০২৩ সালে কমিশনের ৩০৩টি এবং বিলুপ্ত ব্যুরোর ৩৮টিসহ মোট ৩৪১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছিল।
চলতি বছরের আট মাসে নিষ্পত্তির সংখ্যা গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় বেশি হলেও বিচারাধীন ৩ হাজার ৩৪৭টি মামলার তুলনায় অগ্রগতি সীমিত। নতুন মামলা যুক্ত হতে থাকলে নিষ্পত্তির বর্তমান গতি দিয়ে সামগ্রিক মামলার জট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে কিনা, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
সাবেক জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম বলেন, দুদকের মামলার জট নিরসনে বিশেষায়িত বা এক্সক্লুসিভ আদালত গঠন করা প্রয়োজন। এ জন্য দুদককে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে ৬৪ জেলাসহ বিভিন্ন স্থানে মোট ৮৮টি আদালতে দুদকের মামলার বিচার চলে। কিন্তু এসব আদালতে শুধু দুদকের মামলা নয়, অন্যান্য মামলারও বিচার হয়। ফলে দুদকের মামলাগুলোকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি করার সুযোগ সীমিত থাকে। আবার আসামিপক্ষ থেকেও কখনও কখনও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করা হয়।
মঈদুল ইসলাম বলেন, অন্তত আটটি বিভাগে একটি করে বিশেষায়িত আদালত গঠন করে সেখানে দুদকের মামলাগুলোর বিচার করা হলে নিষ্পত্তির গতি বাড়ানো সম্ভব। তার হিসাব অনুযায়ী, এভাবে আটটি আদালতে মামলা বণ্টন করা হলে প্রতিটি আদালতে প্রায় ৪০০ থেকে সাড়ে ৪০০টি মামলা থাকবে। এতে মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করা সহজ হবে।
স্থায়ী প্রসিকিউশন গঠনে জোর : দুদকের মামলায় দক্ষতা ও সাজা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব স্থায়ী প্রসিকিউশন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন মঈদুল ইসলাম। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ৩৩ ধারার আলোকে স্থায়ী প্রসিকিউশন গঠনের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া এবং চুক্তিভিত্তিক আইনজীবীদের দিয়ে মামলা পরিচালনার যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। কমিশনের নিজস্ব দক্ষ আইনজীবী তৈরি করতে হবে। তিনি বলেন, দুদকের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ আইনজীবী থাকলে মামলার বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত করার পাশাপাশি সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে অধিকসংখ্যক মামলায় অভিযোগ প্রমাণ ও আসামিদের সাজা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নতুন মামলাও বাড়াচ্ছে চাপ : দুদকের মামলার জটের সঙ্গে নতুন মামলা ও অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টিও সম্পর্কিত। কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে দুদক ৫৯৮টি মামলা দায়ের করে। এসব মামলায় আসামি করা হয় ২ হাজার ৮৭২ জনকে। একই বছরে ৪১৩টি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
নতুন মামলার বিচার শুরু হওয়ার পাশাপাশি আগের মামলাগুলোর বিচারও চলমান থাকায় আদালতের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র দাখিল, সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিদের হাজিরা এবং অন্যান্য বিচারিক প্রক্রিয়া সময়মতো সম্পন্ন না হলে মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত হতে পারে। এ কারণে তদন্ত ও প্রসিকিউশনের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর পাশাপাশি আদালতে মামলাগুলোর অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনবল বাড়িয়ে গতি আনার পরিকল্পনা : দুদকের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, বিচারপতি মো. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিশনের সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে একাধিক সভা হয়েছে। জনবল বাড়িয়ে কমিশনের কাজে গতি আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অনুসন্ধান ও তদন্তের পাশাপাশি আদালতে দুদকের মামলার বিচার ত্বরান্বিত করা এবং সাজা নিশ্চিত করতে প্রসিকিউশনকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও পরিকল্পনা রয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দুদকের স্থায়ী প্রসিকিউশন গঠন এবং বিশেষায়িত আদালতে দুর্নীতির মামলা পরিচালনার বিষয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুত করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন তারা।
দুদক সচিব মো. সাইদুর রহমান খান জানান, কমিশন অর্ধেক জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। বিদ্যমান জনবল কাঠামো অনুযায়ী জনবল দ্বিগুণ করার সুযোগ রয়েছে। তবে জনবল কাঠামো পরিবর্তন করে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে মামলা, তদন্ত ও নিষ্পত্তির সংখ্যাও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
মামলার নিষ্পত্তির ধীরগতির চিত্র উঠে এসেছে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের পরিসংখ্যানে। গত আগস্টের হিসাব অনুযায়ী, দুই বিভাগে দুদকের মোট ৫৫৫টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে ৪৭১টি এবং আপিল বিভাগে ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়। বিপরীতে দুই বিভাগে বিচারাধীন রয়েছে মোট ৪ হাজার ৮৪৬টি মামলা। এর মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগে ৪ হাজার ৬০৬টি এবং আপিল বিভাগে ২৪০টি মামলা বিচারাধীন।
এর মধ্যে রিট মামলা ১ হাজার ১১টি, ক্রিমিনাল মিস মামলা ১ হাজার ৩০৩টি, ক্রিমিনাল আপিল ১ হাজার ৩২৭টি এবং ক্রিমিনাল রিভিশন ১ হাজার ৩৬৫টি বিচারাধীন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত হাইকোর্ট বিভাগে ২৭৯টি এবং আপিল বিভাগে ৮৪টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সব মিলিয়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৫৫টি মামলা। এ সময়ে নিষ্পত্তির বিপরীতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি থাকায় উচ্চ আদালতে দুদকের মামলার জটের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
উচ্চ আদালতে দুদকের মামলার জট কমাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম। তার মতে, উচ্চ আদালতে দুদকের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত আপিল আদালত গঠন করা হলে সেখানেও বিচারাধীন মামলার জট কমানো সম্ভব হবে।
