স্বর্গের রাজসিংহাসনে তখন মহিষাসুরের আধিপত্য। দেবতাদের পরাজিত করে সে ভেবেছিল, সমগ্র ত্রিভুবনে তার সমকক্ষ আর কেউ নেই। শক্তি, অহঙ্কার আর জয়ের নেশায় সে ছিল উন্মত্ত। কিন্তু এক দিন তার সামনে এসে দাঁড়ালেন এক অপরূপা দেবী— সিংহবাহিনী, অস্ত্রধারিণী, অসীম জ্যোতিতে উদ্ভাসিত মহামায়া দুর্গা।
দেবী ভাগবত পুরাণের কাহিনি অনুযায়ী, দেবীর রূপের কথা শুনে মহিষাসুর তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে। অসুররাজের ধারণা হয়, এমন অপরূপা নারীকে নিজের প্রধান মহিষী করতে পারলে তার গৌরব আরও বৃদ্ধি পাবে। সে ভেবেছিল, দেবীকে যুদ্ধে পরাস্ত করার আগেই বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে নিজের কাছে নিয়ে আসা সম্ভব।
মহিষাসুর প্রথমে তার মন্ত্রীকে দেবীর কাছে পাঠাল। দেবীর সৌন্দর্যের প্রশংসা করে দূত তাঁকে জানাল, মহিষাসুর তিন ভুবনের অধিপতি। তার অঢেল ঐশ্বর্য, অসংখ্য রত্ন এবং অপরিসীম ক্ষমতা রয়েছে। দেবী তাকে বিবাহ করলে তিনিই হবেন ত্রিভুবনের প্রধান রানি।
কিন্তু দেবী এই প্রস্তাব শুনে মুগ্ধ হলেন না। বরং মহিষাসুরের জন্ম ও স্বভাবের প্রসঙ্গ তুলে তার প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করলেন। দেবীর বক্তব্য ছিল, তিনি কোনও অসুরের ঐশ্বর্য বা ক্ষমতার মোহে পড়ে বিবাহ করতে আসেননি। তাঁর আবির্ভাবের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ অন্য। দেবী দূতকে জানিয়ে দিলেন, মহিষাসুর যদি প্রাণে বাঁচতে চায়, তবে পাতালে ফিরে যাক। অন্যথায় যুদ্ধক্ষেত্রে তার মৃত্যু অনিবার্য।
দূত ফিরে গিয়ে সমস্ত কথা জানালে মহিষাসুরের অহঙ্কারে আঘাত লাগে। যে নারীকে সে নিজের রানি করতে চেয়েছিল, সেই নারীই তাকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন!
দেবীর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মহিষাসুর নিজের ক্ষমতার অহঙ্কারে যুদ্ধের পথ বেছে নিল। সে ভেবেছিল, বলপ্রয়োগ করে দেবীকে বশ করা সম্ভব। কিন্তু দেবী যে কোনও সাধারণ নারী নন— তিনি মহামায়া, মহালক্ষ্মী, আদ্যাশক্তির প্রকাশ। শুরু হল ভয়ানক যুদ্ধ। মহিষাসুর কখনও মহিষ, কখনও অন্য রূপ ধারণ করে দেবীকে পরাস্ত করার চেষ্টা করতে লাগল। তার সেনাবাহিনীও একের পর এক যুদ্ধে ধ্বংস হতে লাগল। শেষ পর্যন্ত দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করলেন। তার মৃত্যুতে স্বস্তি ফিরে পেলেন দেবতারা। ত্রিভুবনও অসুরের অত্যাচার থেকে মুক্ত হল।
মহিষাসুরের কাহিনি কেবল এক অসুরের দেবীর প্রতি আকর্ষণের গল্প নয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্ষমতার অহঙ্কার, সৌন্দর্যকে অধিকার করার বাসনা এবং নিজের ইচ্ছাকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা। দেবী দুর্গা সেই প্রবণতার কাছে নতি স্বীকার করেননি। মহিষাসুরের ঐশ্বর্য, শক্তি কিংবা বিবাহের প্রস্তাব— কোনও কিছুই তাঁকে তাঁর উদ্দেশ্য থেকে সরাতে পারেনি। মহিষাসুরের আকর্ষণের পরিণতি তাই প্রেমের মিলন নয়, বরং দেবীশক্তির কাছে অহঙ্কারের পরাজয়। দুর্গাপুজোর মহিষাসুরমর্দিনী রূপে এই জয়ই চিরকাল স্মরণ করা হয়।
এই প্রতিবেদনটি "আনন্দ উৎসব" ফিচারের একটি অংশ।
