কালবেলা · রাজনীতি
কার্যালয়ে ছবি ভাঙচুরের দায় ব্যবসায়ীর ওপর চাপাল বিএনপি, ভিডিওতে ভিন্ন চিত্র
২২/১০/২০২৬

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় মর্ণেয়া ইউনিয়ন বিএনপির কার্যালয়ে ঢুকে ইউনিয়ন সভাপতি মীর কাশেম মিঠুকে মারধর ও ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক বিড়ি ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। বিএনপির দাবি, হামলাকারীরা কার্যালয়ে টাঙানো জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবিও ভাঙচুর করেছেন। কিন্তু কালবেলার হাতে আসা ঘটনার পরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হামলার পর ছবিগুলো ঠিকই দেয়ালে অক্ষত অবস্থায় ঝুলছে।
বুধবার (২১ অক্টোবর) রাত আটটার দিকে উপজেলার কামদেব শেখপাড়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে।
হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত রমজান আলী জিকু হারাগাছ পৌরসভার মেসার্স ফ্রেশ বিড়ি ফ্যাক্টরির মালিক।
স্থানীয় বিএনপির দাবি, হামলায় মিঠু, ৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আসাদসহ তিনজন আহত হয়েছেন। দলটির অভিযোগ, হামলাকারীরা কার্যালয়ে টাঙানো জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ছবিও ভাঙচুর করেছেন।
কিন্তু কালবেলার হাতে আসা হামলার ঘটনার পরপর ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কার্যালয়ের ভেতরে কয়েকটি চেয়ার ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে এবং দেয়ালে টাঙানো কয়েকটি ব্যানার ছেঁড়া। তবে জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি অক্ষত অবস্থায় দেয়ালে ঝুলছে।
এসময় ক্যামেরার পেছন থেকে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘খালেদা জিয়ার ছবিটা ভাঙ্গি দাও। জিয়ার ছবিটা, তারেক জিয়ার ছবিটা। ছবিগুলো ছিঁড়ে ছবি তোলা লাগতো। ভাঙি দাও, ভাঙ্গি দাও, ভাঙ্গি দাও।’
মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিওতে কে এ নির্দেশ দিচ্ছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, হামলার পরপরই ঘটনাস্থলে আসা মিঠুর পক্ষের একজন এ নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ভিডিওটি হামলার পরের সময়ে ধারণ করা বলে নিশ্চিত করেছেন সেখানে উপস্থিত এক ছাত্রদল নেতা।
হামলার সময় ধারণ করা আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, কার্যালয়ের বাইরে ২৫-৩০ জনের মধ্যে হাতাহাতি চলছে। এ সময় ভেতরে থাকা দুই-তিনজনকে চেয়ার দিয়ে বাইরের লোকজনকে আঘাত করতে দেখা যায়।
ছবি ভাঙার নির্দেশ নিয়ে মন্তব্য জানতে আজ বৃহস্পতিবার মীর কাশেম মিঠুকে একাধিকবার মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
তবে হামলার পর বুধবার রাতে মীর কাসেম মিঠু অভিযোগ করেন, পার্শ্ববর্তী এলাকার একটি তালাকের মীমাংসার জন্য তিনি কার্যালয়ে বসেছিলেন। তার সঙ্গে আরও চারজন ছিলেন এবং মীমাংসা সংক্রান্ত ১০ লাখ টাকা তার কাছে ছিল।
তিনি জানান, এ সময় কয়েকটি মোটরসাইকেলে ১৫-২০ জন এসে তার শার্টের কলার চেপে ধরেন। এরপর তাকে মারধর এবং কার্যালয়ে হামলা ও নেতাদের ছবি ভাঙচুর করা হয় এবং সেখানে থেকে ১০ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে যায়।
মিঠু আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা মাদক কারবারের সঙ্গে যুক্ত। মাদকবিরোধী আন্দোলন ও ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বের কারণে হামলা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে মুঠোফোনে কালবেলাকে অভিযুক্ত রমজান আলী জিকু বলেন, ঘটনার আধা ঘণ্টা আগে গজঘন্টা বাজারে চায়ের দোকানে বসা অবস্থায় তাকে মারধর করা হয়। উল্টো তার অভিযোগ, মিঠুর ঘনিষ্ঠ স্টার আকিজ বিড়ির মালিক আব্দুল মাবুদ সরকার, দুলাল মেম্বারকে দিয়ে মিঠু এ মারধর করান।
জিকু বলেন, এরপর শেখপাড়া বাজারে এসে কার্যালয়ের সামনে মিঠুকে দেখে তিনি তাকে ধাক্কা দেন। তিনি বলেন, ‘সত্য যেটা, ফাঁসি হইলেও আমি সেটা বলবো। তার সাথে আমার ধাক্কাধাক্কি হয়েছে। তার রক্ত বের হইছে হয়ত। আর কাউকে মারধর করা হয়নি।’
কার্যালয়ে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি দাবি করেন, ‘তার (মিঠুর) ছেলেরাই এসব ভাঙচুর করেছে।’
জিকুর অভিযোগ, চার বছর আগে ঢাকায় বিড়ি ফ্যাক্টরি মালিক সমিতির বৈঠকে প্রতি প্যাকেট বিড়ি ১৮ টাকায় বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়, পরে অনুরোধে তা ১৫ টাকা করা হয়। কিন্তু মিঠু প্রতি প্যাকেট ১০ টাকায় বিক্রি করছিলেন। এতে তার ব্যবসায় লোকসান হচ্ছিল। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গঙ্গাচড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি চাঁদ সরকার বলেন, ‘এটি একটি ষড়যন্ত্র। ভিডিওটি তিনি দেখেছেন, সেখানে ভাঙার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে শোনা গেলেও ভাঙা দেখা যায়নি। হামলাকারীরা দ্বিতীয় দফায় এসে এটা করেছেন এবং মামলার এজাহারে এ বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।’
তিনি জানান, বিষয়টি নিয়ে তারা তদন্ত করছেন। ভিডিওর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্তের আগে এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চান না।।
তবে ওই কার্যালয়ের পাশের এক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘটনার সময় তিনি পাশের মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়েছিলেন। ওজু করার সময় চিল্লাচিল্লির শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে এসে দেখেন, মারধর ও ভাঙচুর হয়ে গেছে। তিনি হামলাকারীদের কাউকে দেখেননি বা তাদের গাড়িতে করে যেতেও দেখেননি। পুরো ঘটনা সর্বোচ্চ দুই মিনিটের মধ্যে ঘটেছে বলে জানান তিনি।
এদিকে এ ঘটনায় রাতেই মীর কাশেম মিঠু বাদী হয়ে গংগাচড়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, মাদকবিরোধী একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার কারণে তার ওপর হামলা হয়েছে।
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, ২১ অক্টোবর রাত ৮টার দিকে শেখপাড়ায় দলীয় কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়। এ সময় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয় এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বেগম খালেদা জিয়া ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছবি ভেঙে ফেলা হয়। কার্যালয়ের টেবিলের ড্রয়ারে সালিশের জন্য আমানত হিসেবে রাখা ১০ লাখ টাকাও চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গঙ্গাচড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস সবুর কালবেলাকে বলেন, এ ঘটনায় গতকাল রাতেই মামলা হয়েছে। এজাহারনামীয় আসামি ২২ জন, অজ্ঞাতনামা ১০-১৫ জন।
তবে নেতাদের ছবি ভাঙচুরের নির্দেশ দেওয়া সংক্রান্ত ভিডিওটির বিষয়ে ওসি বলেন, ভিডিওটি প্রশাসনিকভাবে তারা পাননি। পেলে তদন্ত করে দেখা হবে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗