সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব শুক্রবার ষষ্ঠীপূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে সাতক্ষীরাজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিমা নির্মাণে মুক্তা, মুগ ডাল, পাট ও তিলের মতো ব্যতিক্রমী উপকরণ ব্যবহার এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মণ্ডপসজ্জায় এবার থাকছে নানা চমক। কোথাও আবার তৈরি করা হয়েছে কর্ণফুলী টানেলের আদলে পথ।
এদিকে, উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপনের লক্ষ্যে জেলার ৬১২টি পূজামণ্ডপে ৩৬৭ দশমিক ২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ ও বিতরণ করেছে সরকার। অন্যদিকে, পূজাকে কেন্দ্র করে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোসহ কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
গত ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এবার দেবী দুর্গার আগমন ঘটেছে ঘোড়ায় চড়ে। ইতিমধ্যে পূজার সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন আয়োজকেরা। আগামী ২১ অক্টোবর, বুধবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব।
৬১২ মণ্ডপে পূজা, চাল বিতরণ ৩৬৭.২ টন
সাতক্ষীরা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দীন জানান, জেলার ৬১২টি পূজামণ্ডপে মোট ৩৬৭ দশমিক ২ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপের জন্য ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।
জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জেলার সাতটি উপজেলায় এবার ৬১২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ১১১টি, তালায় ২০২টি, কলারোয়ায় ৪৬টি, দেবহাটায় ২১টি, আশাশুনিতে ১০৬টি, কালীগঞ্জে ৫৫টি এবং শ্যামনগরে ৭১টি মণ্ডপ রয়েছে।
মুক্তার কারুকাজে সাজানো ১৩ প্রতিমা
সাতক্ষীরার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জায় দেখা যাচ্ছে ব্যতিক্রমী সব আয়োজন। আশাশুনি উপজেলার বড়দল ইউনিয়নের বুড়িয়া সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে প্রায় ৩৫ হাজার মুক্তার কারুকাজে সাজানো হয়েছে ১৩টি প্রতিমা। শিল্পী প্রকাশ মণ্ডল ও তাঁর সহযোগীদের কয়েক মাসের পরিশ্রমে তৈরি হয়েছে এই নান্দনিক সাজ। এতে ব্যয় হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি। মুক্তার কারুকাজের পাশাপাশি রয়েছে বিশেষ আলোকসজ্জা।
একই উপজেলার বুধহাটা কাছারিপাড়া পূজামণ্ডপে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কেজি মুগ ডাল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের প্রতিমা। প্রতিটি মুগ ডাল যত্নসহকারে বসিয়ে দেবদেবীর অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে শিল্পীদের সময় লেগেছে প্রায় ১৫ দিন। প্রচলিত উপকরণের বাইরে গিয়ে খাদ্যশস্য দিয়ে প্রতিমা তৈরির এ উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে কৌতূহল তৈরি করেছে।
সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা পূজামণ্ডপে বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতে ব্যবহার করা হচ্ছে পাট ও পাটজাত উপকরণ। পাটের আঁশ দিয়ে মণ্ডপসজ্জায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে বাংলার সোনালি আঁশের ঐতিহ্য। পাশাপাশি প্রতিমার সাজে ব্যবহার করা হচ্ছে রেশমি সুতা ও অন্যান্য উপকরণ।
তিল ও চুমকির নকশায় প্রতিমা
কলারোয়ার মুরারীকাটি পালপাড়ার মণ্ডপে ১৬টি প্রতিমা সাদা তিল দিয়ে সাজানো হয়েছে। প্রায় ২৫ কেজি তিল ব্যবহার করে চার শিল্পী ১৫ দিনে এ কাজ সম্পন্ন করেছেন। একই এলাকার অন্য একটি মণ্ডপে চুমকি দিয়ে প্রতিমার পোশাক ও অলংকারে আনা হয়েছে ঝলমলে নকশা। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ১২ কেজি চুমকি ব্যবহার করা হয়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার অমিয়ান বাথুয়াডাঙ্গা সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে ককশিট বা ফোমশিট দিয়ে তৈরি প্রতিমার পাশাপাশি থাকছে ভাসমান সেতু ও বিশেষ আলোকসজ্জা। অষ্টমী, নবমী ও দশমীর রাতে ডিজিটাল আলোক প্রদর্শনীর পরিকল্পনাও রয়েছে। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পুরো আয়োজনের বাজেট প্রায় আট থেকে ১০ লাখ টাকা।
কর্ণফুলী টানেলের আদলে পথ, ২৫ ফুটের প্রতিমা
শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের আড়পাঙ্গাশিয়া রাসমন্দির প্রাঙ্গণে কর্ণফুলী টানেলের আদলে একটি পথ তৈরি করা হয়েছে। ওই পথ দিয়ে দর্শনার্থীরা প্রতিমা দর্শন করতে পারবেন। প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে নতুন অভিজ্ঞতা দিতে বিশেষভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন আয়োজকেরা।
একই উপজেলার দক্ষিণ বড়কুপট নদীরপাড় দুর্গামন্দিরে নির্মাণ করা হচ্ছে প্রায় ২৫ ফুট উচ্চতার বিশাল দুর্গাপ্রতিমা। মাটি ও ফাইবারের সমন্বয়ে তৈরি এ প্রতিমার পাশাপাশি পৌরাণিক কাহিনিনির্ভর দৃশ্যপটও তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া সাতক্ষীরা শহরের কেন্দ্রীয় মন্দির ‘মায়ের বাড়ি’তে শতাধিক প্রতিমার মাধ্যমে পৌরাণিক যুগের বিভিন্ন দেবদেবীর লীলা ও কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। দেবদেবীর নানা রূপ ও পৌরাণিক ঘটনাবলির শৈল্পিক উপস্থাপনায় মন্দির প্রাঙ্গণে তৈরি হয়েছে ভিন্নধর্মী আবহ। ধর্মীয় আখ্যান ও প্রতিমাশিল্পের সমন্বয়ে এ আয়োজন দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভিন্নধর্মী এসব আয়োজন দেখতে ইতিমধ্যে দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা আসছেন বলে জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ ব্যবস্থা
সাতক্ষীরা জেলা পূজা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, এবার জেলায় ৬১২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মণ্ডপের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পবিত্রতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে যথাযথ নিয়মে পূজা আয়োজনের অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
জেলাবাসীকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। পাশাপাশি দুর্গোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
সাতক্ষীরা জেলা পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম জানিয়েছেন, দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন করতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। মণ্ডপগুলোতে টহল, সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নজরদারি, সাদাপোশাকে পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশের উপস্থিতি এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। উৎসব শান্তিপূর্ণ রাখতে তিনি সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।
ধর্মীয় ঐতিহ্য, প্রতিমাশিল্পের বৈচিত্র্য ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর আয়োজন—সব মিলিয়ে সাতক্ষীরায় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। আয়োজক ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, পারস্পরিক সম্প্রীতি, প্রশাসনের সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে এবারের দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর হবে।
