কিডনি আমাদের শরীরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঙ্গ। শরীরের রক্ত পরিশোধন, অতিরিক্ত পানি ও বর্জ্য পদার্থ প্রস্রাবের মাধ্যমে বের করে দেওয়া, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের পানি ও খনিজের ভারসাম্য বজায় রাখতে কিডনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে সহায়তা করা এবং হাড়ের স্বাস্থ্য রক্ষায়ও কিডনির ভূমিকা রয়েছে। বিভিন্ন কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করা না হলে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে, যা একসময় গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
কিডনি রোগের অন্যতম বিপজ্জনক দিক হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক ক্ষেত্রেই এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন রোগ সম্পর্কে জানতে পারেন না। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন এবং কিছু ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলার মাধ্যমে কিডনি রোগের ঝুঁকি কমানো এবং অনেক ক্ষেত্রে রোগের অগ্রগতি ধীর করা সম্ভব।
কিডনি রোগের কারণ
কিডনি রোগ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ অন্যতম। দীর্ঘদিন রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে কিডনির সূক্ষ্ম রক্তনালিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ কিডনির রক্তনালির ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং ধীরে ধীরে এর কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া কিডনিতে সংক্রমণ, কিডনিতে পাথর, বংশগত বা পলিসিস্টিক কিডনি রোগ, অটোইমিউন রোগ এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও কিডনি ক্ষতির কারণ হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে, বিশেষ করে গুরুতর অবস্থায়, কিডনির কার্যক্ষমতা সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পরিবারের কারও কিডনি রোগের ইতিহাস থাকলে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিডনি রোগের লক্ষণ
কিডনি রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। রোগের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। যেমনÑ
প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া, প্রস্রাবে রক্ত দেখা, প্রস্রাবের রং বা ধরনে পরিবর্তন, প্রস্রাবে অতিরিক্ত ফেনা হওয়া, চোখের চারপাশে ফোলাভাব এবং পা, গোড়ালি বা শরীরের অন্যান্য অংশ ফুলে যাওয়া কিডনির সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, বমি বমি ভাব, বমি, ঘুমের সমস্যা, ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া এবং মনোযোগ ধরে রাখতে অসুবিধা হতে পারে। কিডনির কার্যক্ষমতা অনেক কমে গেলে শরীরে বর্জ্য পদার্থ জমে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কখনো শ্বাসকষ্ট, রক্তস্বল্পতা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে কিডনি রোগ হয়েছে, তা নিশ্চিত নয়। অন্য রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
কিডনি রোগ প্রতিরোধে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
কিডনি সুস্থ রাখতে সুষম ও পরিমিত খাবার গ্রহণ করা জরুরি। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর প্রোটিন রাখা উচিত। অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্ট ফুড এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলা ভালো।
অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, যা কিডনির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই খাবারে বাড়তি লবণ দেওয়া এবং অতিরিক্ত লবণযুক্ত আচার, চিপস, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অন্যান্য খাবার খাওয়ার অভ্যাস কমাতে হবে।
কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পটাশিয়াম, ফসফরাস, প্রোটিন ও লবণ গ্রহণের পরিমাণ রোগের পর্যায় এবং পরীক্ষার ফল অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়। কলা, আঙুর, স্ট্রবেরি, টমেটোসহ বিভিন্ন খাবারে পটাশিয়াম থাকে। মাছ, মাংস, দুধ ও বাদামে ফসফরাস থাকতে পারে। তবে এসব খাবার সবার জন্য ক্ষতিকর নয়। কিডনি রোগীর শরীরে পটাশিয়াম বা ফসফরাসের মাত্রা বেশি থাকলে কিংবা চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন আনতে হয়। তাই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার বাদ দেওয়া উচিত নয়।
পর্যাপ্ত পানি পান করা
শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা প্রয়োজন। পানিশূন্যতা এড়াতে নিয়মিত পানি পান করা উচিত। তবে সবার পানির চাহিদা এক নয়। আবহাওয়া, শারীরিক পরিশ্রম, বয়স এবং শারীরিক অবস্থার ওপর পানির প্রয়োজন নির্ভর করে।
সুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে তৃষ্ণা, প্রস্রাবের স্বাভাবিকতা ও দৈনন্দিন কাজের ধরন অনুযায়ী পানি পান করা যায়। কিন্তু যাঁদের কিডনির কার্যক্ষমতা কমে গেছে, শরীরে পানি জমে বা হৃদ্?রোগের কারণে তরল গ্রহণ সীমিত রাখতে বলা হয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পানি পান করতে হবে। কিডনি সুস্থ রাখার জন্য সবারই প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি পান করা বাধ্যতামূলকÑএমন ধারণা সঠিক নয়।
নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম ও ওজন নিয়ন্ত্রণ
কিডনি রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা কিংবা সামর্থ্য অনুযায়ী অন্য কোনো ব্যায়াম করা যেতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সাধারণভাবে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমের পরামর্শ দেওয়া হয়।
নিয়মিত ব্যায়াম ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতেও ভূমিকা রাখে। দীর্ঘ সময় একটানা বসে না থেকে কাজের ফাঁকে হাঁটাচলা করা এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনে শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ানো উচিত।
ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার
ধূমপান রক্তনালির ক্ষতি করে এবং রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এর ফলে কিডনির স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই কিডনি সুস্থ রাখতে ধূমপান পরিহার করা জরুরি। অতিরিক্ত মদ্যপানও শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এসব অভ্যাস এড়িয়ে চলা উচিত।
কিডনি রোগের চিকিৎসা
কিডনি রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের ধরন, কারণ ও তীব্রতার ওপর। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে অনেক ক্ষেত্রে ওষুধ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি ধীর করা যায়।
কিডনিতে সংক্রমণ থাকলে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। কিডনিতে পাথর হলে পাথরের আকার, অবস্থান ও উপসর্গ বিবেচনায় চিকিৎসার পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।
ডা. সাদিয়া সুলতানা
অ্যাটেনডিং কনসালট্যান্ট
নেফ্রোলজি, এভারকেয়ার হাসপাতাল, চট্টগ্রাম।
