মাসের শুরুতে বেতন হাতে পেয়েই শুরু হয় সংসারের হিসাব। বাসাভাড়া, বাজার, যাতায়াত, বিদ্যুৎ বিল ও কিস্তি পরিশোধ করতে করতেই আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়। মাসের ২৫ তারিখ পার হওয়ার আগেই অনেকের পকেট ফাঁকা হয়ে পড়ে। বাকি দিনগুলো চালাতে কেউ ভাঙছেন সঞ্চয়, কেউ নিচ্ছেন ঋণ। পরের মাসে বেতন পেয়ে সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে আবারও তৈরি হচ্ছে অর্থসংকট। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে এভাবেই ঋণের চক্রে আটকে পড়ছেন অনেক চাকরিজীবী।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আনাস আহমেদের মাসিক বেতন ৫৪ হাজার টাকা। পরিবারের সঙ্গে থাকলেও তাঁকে মাসে ২০ হাজার টাকা বাসাভাড়া দিতে হয়। গ্যাসের সিলিন্ডার, পানি ও বিদ্যুৎ বিল বাবদ খরচ হয় আরও ৫ হাজার টাকা। ছয় মাস আগে কেনা মুঠোফোনের কিস্তি দিতে হয় ৫ হাজার ৫০০ টাকা।
কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন আনাস। জ্বালানি ও যাতায়াতে মাসে ব্যয় হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। বাজারের পেছনে খরচ হয় আরও ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এসব খাতেই মাসে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়ে যায়। ফলে পরিবারের অন্যান্য প্রয়োজন মেটানো এবং জরুরি সময়ের জন্য সঞ্চয় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা সঞ্চয়ের চেষ্টা করলেও নিয়মিত খরচ সামলাতে গিয়ে প্রায়ই সেই টাকা ভাঙতে হয় তাঁকে। অনেক সময় মাসের ২৫ তারিখের আগেই হাতে থাকা টাকা শেষ হয়ে যায়। তখন বাকি দিনগুলো চালাতে মুঠোফোনভিত্তিক আর্থিক সেবা থেকে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিতে হয়। তিন মাস মেয়াদি এসব ঋণ পরিশোধ করতে সুদও দিতে হয়। পরের মাসে বেতন পাওয়ার পর ঋণ শোধ করতে গিয়ে আবারও টান পড়ে সংসারের বাজেটে।
আনাস বলেন, প্রতিদিনই খরচ বাড়ছে, কিন্তু বেতন বাড়ছে না। প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে হয়তো ২ থেকে ৪ হাজার টাকা বেতন বাড়ানো হয়। কিন্তু তাতে বাড়তি খরচ সামাল দেওয়া যায় না।
একই পরিস্থিতির মুখোমুখি আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী নিলয়। তাঁর ভাষ্য, খরচ এত দ্রুত বাড়ছে যে চাকরির পাশাপাশি বাড়তি আয়ের কথাও ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু বাড়তি কাজ করার মতো সময় ও সুযোগ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আনাস ও নিলয়ের মতো ঢাকার অনেক বেতনভোগী মানুষের জন্য সংসারের খরচ সামলানো দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে কমছে সঞ্চয়, আবার কারও কারও দৈনন্দিন খরচ মেটাতেও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাড়ছে মূল্যস্ফীতি, কমছে ক্রয়ক্ষমতা
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগস্টে এ হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ০২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ থেকে সামান্য কমে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আগের ১২ মাসে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এর আগের ১২ মাসে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪৫ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির হার কমে যাওয়ার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কমে আসা। ফলে সাধারণ মানুষকে এখনো আগের তুলনায় বেশি দামেই পণ্য ও সেবা কিনতে হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও দক্ষিণ এশীয় অর্থনৈতিক মডেলিং নেটওয়ার্কের সম্মানসূচক গবেষণা পরিচালক মাহতাব উদ্দিনের মতে, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বোঝার জন্য মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সিদ্ধান্তগুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য ও ভারতের মতো দেশ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুদ্রানীতি যথেষ্ট কঠোরভাবে বা সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়নি বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ। সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে ধারাবাহিক তারল্য সহায়তা এবং সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতিও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
মাহতাব উদ্দিনের মতে, দুর্বল কর আদায়ব্যবস্থা এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল ব্যয় সরকারের আর্থিক চাপ বাড়িয়েছে। এসব কাঠামোগত সমস্যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের সংসার খরচেও।
খাবার ও শিক্ষার খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে পরিবার
মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। কারণ, তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পেছনে ব্যয় হয়।
মাহতাব উদ্দিন বলেন, পণ্যের দাম বাড়লেও প্রকৃত মজুরি সেই হারে না বাড়লে পরিবারগুলোকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেকে মাছ, মাংস ও ফল কেনা কমিয়ে দেন। কেউ কম পুষ্টিকর খাবার খেতে বাধ্য হন, আবার কেউ সন্তানের শিক্ষার খরচ কমান।
এ ধরনের সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও রয়েছে। পুষ্টিকর খাবারের অভাব, শিক্ষায় ব্যয় কমানো এবং সঞ্চয়ের সুযোগ হারানোর কারণে পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিবিএসের মজুরি হার সূচক অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে জাতীয় পর্যায়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৯ শতাংশ। একই মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে ০ দশমিক ৪৪ শতাংশীয় পয়েন্ট কম ছিল।
সবার বেতন ও ব্যয়ের ধরন এক নয়। তবে এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, গড়ে মজুরি বৃদ্ধির হার পণ্যের দাম বাড়ার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ফলে অনেক পরিবারের পক্ষে আগের মতো খরচ চালানো ও সঞ্চয় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ঋণ শোধ করতেই শেষ হচ্ছে পরের মাসের বেতন
জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ শুধু চাকরিজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবারের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল শিক্ষার্থীদেরও যাতায়াত ও দৈনন্দিন খরচ নিয়ে হিসাব করতে হচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মাহমুদ মোটরসাইকেলে যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন অন্তত ২০০ টাকার জ্বালানি খরচ করেন। অন্যদিকে, মেট্রোরেলে যাওয়া-আসায় তাঁর ব্যয় হয় ২৪০ টাকা। ফলে কোন মাধ্যমে যাতায়াত করবেন, তা নির্ধারণের আগেও তাঁকে খরচের হিসাব করতে হয়।
মাহমুদ জানান, তাঁর বন্ধুদের অনেকেই মাসের শেষ দিকে টাকা ধার করেন এবং বেতন পাওয়ার পর তা শোধ করেন। এতে পরের মাসের শুরুতেই আবার অর্থসংকট তৈরি হয়। তখন নতুন করে ঋণ নিতে হয়। এভাবে বারবার ঋণ নিয়ে চলতে গিয়ে তাঁরা একটি চক্রে আটকে পড়ছেন।
মাহতাব উদ্দিনের মতে, শ্রমিকদের সম্মিলিত দর-কষাকষির ক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় বেতন বাড়ানোর দাবি জানানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে শিক্ষক, চিকিৎসক ও রেলকর্মীরা সংগঠিতভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। বাংলাদেশে অনেক কর্মীর, এমনকি দাপ্তরিক কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদেরও একই ধরনের দর-কষাকষির ক্ষমতা নেই। শ্রমের চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকলে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বেতন বাড়ানোর দাবি আদায় আরও কঠিন হয়।
শুধু খরচ কমিয়েই কি সংকট কাটবে?
বাসাভাড়া, খাবার ও যাতায়াতের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পাশাপাশি ছোট ছোট খরচও মাস শেষে বাজেটে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। রেস্তোরাঁয় খাওয়া, ঘোরাঘুরি, অনলাইনে কেনাকাটা কিংবা শখের পেছনে নিয়মিত ব্যয় করলে মাস শেষে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা খরচ হয়ে যেতে পারে। প্রতিদিন মাত্র ১০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও মাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার টাকা।
তবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোই এ সংকটের একমাত্র সমাধান নয়। অনেকের জন্য বাড়তি আয়ের সুযোগ খুঁজে পাওয়াও কঠিন, কারণ উপযুক্ত চাকরির সুযোগ সীমিত।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের অক্টোবরের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের প্রায় ২৯ শতাংশ বেকার। প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে বাংলাদেশের মোট শ্রমচাহিদায় ২ শতাংশের সমপরিমাণ চাপ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, সীমিত কর্মসংস্থান এবং শ্রমবাজারে সম্ভাব্য পরিবর্তন—সব মিলিয়ে অনেক মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাজেট ও সঞ্চয়ে মিলতে পারে কিছুটা স্বস্তি
ঢাকার সাংবাদিক মুমিতুল মিম্মা জানান, নিজের খরচের হিসাব লিখে রাখার অভ্যাস তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছে, টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে।
তিনি বলেন, আগে হিসাব না করেই খরচ করতেন। মাসের মাঝামাঝি সময়েই অর্থসংকটে পড়তেন। পরে যাতায়াতের ভাড়া থেকে শুরু করে এক কাপ চায়ের খরচ পর্যন্ত লিখে রাখার অভ্যাস গড়ে তোলেন। এতে ব্যয়ের ধরন বুঝতে এবং খরচের পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়েছে।
খরচের হিসাব রাখলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী বাজেট তৈরি করা সহজ হয়। বেতন পাওয়ার পর সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা সঞ্চয়ের জন্য আলাদা করে রাখাও কাজে আসতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য আলাদা তহবিল গড়ে তুললে হঠাৎ খরচের সময় ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক মঞ্জুরা আক্তার বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় যেমনই হোক, আয়ের মধ্যে খরচ সামলানোও একটি দক্ষতা। তিনি মাসের শুরু থেকেই সঞ্চয় করা এবং প্রয়োজনীয় খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যয়ের পরিকল্পনা করার পরামর্শ দেন।
তাঁর মতে, মাসিক সঞ্চয় প্রকল্প বা পেনশনভিত্তিক আমানত প্রকল্পের মতো ব্যবস্থায় নিয়মিত টাকা জমা রাখলে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে উঠতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে আলাদা তহবিল থাকলেও হঠাৎ ব্যয়ের চাপ সামলানো সহজ হয়।
তবে যাদের আয়ের প্রায় পুরোটাই খাবার, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে ব্যয় হয়ে যায়, তাঁদের পক্ষে সঞ্চয় করা কঠিন। আয় দিয়ে মৌলিক প্রয়োজন মেটানোই সম্ভব না হলে শুধু বাজেট তৈরি করে সংকট কাটানো যায় না।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ব্যবধান কমাতে ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রয়োজন আয় বৃদ্ধির সুযোগ, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং মজুরি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করা। অন্যথায় মাসের শেষের অর্থসংকট ও ঋণনির্ভরতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসা অনেক পরিবারের জন্যই কঠিন হয়ে থাকবে।
The post মাস শেষের আগেই পকেট খালি, সংসার চালাতে ঋণে ডুবছেন চাকরিজীবীরা appeared first on ভোরের চেতনা.
