Published on
:
5 min read
আমার মন আজও সেই সময়টার কথা ভাবে, একটা নতুন সুরের মতো জেগে থাকে ২০০০ সাল, আমার মেখলিগঞ্জ অঞ্চলে ডাক্তারি করতে যাওয়ার দিনগুলো। ভালোবেসে ফেললাম কোচবিহার জেলার এই ১.৫০ বর্গমাইল অঞ্চলের মহকুমা মেখলিগঞ্জ। সেই জীবনের কথাই আজ বলবো। আমি কাজের সুবাদে, অর্থাৎ ডাক্তার হিসেবে ওই অঞ্চলে মেখলিগঞ্জ সাব-ডিভিশনাল হাসপাতালে যুক্ত হই। চিকিৎসক হিসেবে আমার যা অভিজ্ঞতা ছিল ওখানে যুক্ত হওয়ার আগে, তা সম্পূর্ণ ভাবে পাল্টে যায়। আমি তো কলকাতার ছেলে, পড়াশোনা করেছি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। কিন্তু গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র ও চরিত্র দুইই আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠলো মেখলিগঞ্জে গিয়ে। আজ স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলে বুঝতে পারি, আমার জীবনের অনেক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায় ওই অঞ্চল আর সেখানকার মানুষজনদের জন্য।
প্রায় দু'বছর ওই অঞ্চলে বসবাস করেছি। আরও যেহেতু আমি একাই থাকতাম তাই নিজের মতো করে চারপাশটা দেখেছি; সাক্ষাৎ হয়েছে উপশহর বা গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে। আমার একটা অখণ্ড অবসর ছিল কাজের পরে, ফলে নিজের সঙ্গে নিজের পরিচিত হওয়ার খুব সুবিধা করে দিয়েছিল।
ওই অঞ্চলে থাকাকালীন ডাক্তারি জীবনের কিছু কথা বলি— আমরা যারা সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তাদের জন্য ছিল কোয়াটার। সবার কোয়াটার অবশ্যই একই অঞ্চলে ছিল না, একটু দূরে দূরেই ছিল। আমার কোয়াটার থেকে পশ্চিম দিকে গেলে তিস্তা নদী। মেখলিগঞ্জের মজাটা হচ্ছে, জায়গাটা এক সীমান্তবর্তী শহর। সামনেই চ্যাংরাবান্ধা বর্ডার ও তার ঠিক ওপারে বাংলাদেশের পাটগ্রাম। তিন বিঘা করিডোর সামনেই, যা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলার অন্তর্গত এবং বাংলাদেশের দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ছিটমহলের সাথে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয় আজও। এইরকম একটা অঞ্চলে গিয়ে আমার সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছিল— হাসপাতালে আমার আউটডোরের কাজ। তিন থেকে চার ঘন্টা ছিল বরাদ্দ একজন ডাক্তারের জন্য, আর প্রায় সাড়ে তিনশো থেকে চারশো মানুষ অপেক্ষা করে থাকতেন ডাক্তার দেখানোর জন্য। আমার হাসপাতালের যথেষ্ট নাম ছিল, তাই দূরদূরান্ত থেকে লোকজনও আসতেন। আমি আগে কখনও দেখিনি ডাক্তার দেখাতে এত পরিমাণ মানুষ আসেন এক বেলায়। তিন থেকে চার ঘন্টা যদি একজন ডাক্তারের কাজের সময় থাকে, তাহলে চারশোর কাছাকাছি লোকজনকে দেখতে গড়ে কতটুকু সময় দেওয়া যেত বোঝাই যাচ্ছে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ছবিটা তৈরি হচ্ছিল তখন চোখের সামনে। আরও রোমাঞ্চকর একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি— এই যে এতো রোগীরা আসতেন, তাদের মধ্যে সবাই ভারতীয় নন, বর্ডার পার করেও ওপার বাংলার মানুষ ডাক্তার দেখাতে আসতেন। আবার তারা ফিরেও যেতেন বর্ডারের ওপারে। কিন্তু ডাক্তারের তো কোনও কাঁটাতার নেই, পৃথিবীর মানুষের সেবা করাটাই তার কর্তব্য। ওপারের মানুষ অনেক সময় যেমন গোপনে কাঁটাতার পার করে আসতেন, তেমনই দেখেছি বিএসএফ-এর হাতে গ্রেফতার হয়েও আসতো ডাক্তার দেখাতে। তখনও আমাদের দেখতে হতো। স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রান্তিক মানুষের জীবন নিয়ে মেডিকেল কনফারেন্স আর জার্নালের পণ্ডিতির বিপরীতে একটা স্পষ্ট বাস্তব দাঁড়িয়ে আছে। ওই হাসপাতালে না গেলে, মানুষের কাছে গিয়ে কাজ না করলে বুঝতে পারতাম না। ডাক্তার কিন্তু কেউ ওই অঞ্চলের ছিল না, কলকাতা বা বিভিন্ন অন্যান্য জেলা থেকে আসতেন, এমনকি অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীও বাইরে থেকেই আসতেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে চেম্বার করতাম না, কিন্তু আস্তে আস্তে পরিচিত হলাম, তারপর ওই সমস্ত রোগীদের সন্ধ্যায় আমার কোয়াটারে সময় দিতে হতো। দেখা গেল, শারীরিক অসুস্থতা শুধু নয়, সময়ের সঙ্গে আমি তাদের আত্মার একজন হয়ে উঠলাম। বিভিন্ন ব্যক্তিগত সমস্যা, এমনকি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করতেও আমার কাছে অনেকেই আসতেন। ধরা যাক, শাসকদল বনধ্ ডেকেছে, কিন্তু বিরোধী দল চাইছে না, হাসপাতাল যেন খোলা থাকে সেই জন্য দুপক্ষই আমাদের কাছে আসছেন এবং একটা সহাবস্থানের জায়গা তৈরি হতো। সবুজ প্রকৃতির আদরে ঢাকা মেখলিগঞ্জ; মানুষগুলোকে তখনও খুব বিষিয়ে দিতে পারেনি।
ভারতবর্ষের একটা ছোট্ট অঞ্চলের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে থেকে দেখেছি, অধঃপতন, সরকারি নিয়ম ভেঙে ডাক্তারি প্র্যাকটিস করা। আবার পাশাপাশি দেখেছি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস কাজ, কতটা গভীরভাবে তারা কাজ করে যান। এই সবটা নিয়েই তো আমার মেখলিগঞ্জ।
পেশাগত জীবনের পাশে আরও একটা জীবনের খোঁজ পাচ্ছিলাম সেই সময়। ১৯৯৭ সালে তখন মোবাইলের ব্যবহার আসছে, আমার কাছেও ছিল— কিন্তু সেই ২০০০ সালে তখন মোবাইলের টাওয়ার বসেনি ওই অঞ্চলে। তার ফলে একটা অখণ্ড অবসর ছিল সেই সময়ে। মেখলিগঞ্জ এটা আমাকে দিয়েছে। সপ্তাহান্তে কাজের ছুটি থাকলে উত্তরবঙ্গের কোথাও না কোথাও, সেই রাজাভাতখাওয়া, জয়ন্তী থেকে শুরু করে সান্দাকফু পর্যন্ত, ঘুরে বেড়িয়েছি। ডাক্তারি করলেও মাঝে মধ্যে ছুটি থাকতো, যার ফলে গরুমারা, চাপরামারি, চিলাপাতাসহ বহু জঙ্গলে ঘুরেছি। জঙ্গল আমাকে যে বড্ড টানে! কত ধরণের মানুষের সঙ্গে, প্রকৃতির সঙ্গে আলাপ হয়েছে।
মেখলিগঞ্জের প্রকৃতির মধ্যে ছিল শান্তি। দিকে দিকে বিরাট পাট ক্ষেত। নগরায়ণের ছোঁয়া তখনও লাগেনি, অধিকাংশ অঞ্চলের মধ্যে গ্রামীণ সৌন্দর্য লেগে ছিল। ওখানে একটা মেলা বসতো তিস্তা পেরিয়ে, হুজুর শরীফের মেলা। "হুজুর শরীফের মেলা" বলতে সাধারণত হলদিবাড়ির "হুজুর সাহেবের ইসালে সওয়াব" মেলাকে বোঝায়, যা পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার হলদিবাড়িতে অনুষ্ঠিত হয়। এই যে তিস্তা নদী, যার আসল নাম ত্রি-স্রোতা, তারই একটি পাড়ে ছিল। প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের ৫ ও ৬ তারিখে আয়োজিত হয় এবং এই মেলা মূলত একটি বার্ষিক ওরস বা ইসালে সওয়াব মাহফিল।
এখানে "হুজুর" বলতে "হুজুর সাহেব" বা "দাদা হুজুর" নামে পরিচিত পীর মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিকীকে বোঝানো হয়, যিনি ফুরফুরা দরবার শরীফের প্রতিষ্ঠাতা। তার মৃত্যুর পর তার মাজার শরীফ (সমাধি) সংলগ্ন স্থানে এই মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে তার অনুসারীরা এসে মিলিত হন এবং তার আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া ও প্রার্থনা করেন। আমার কোয়াটারের অদূরে ভেসে যেত সানিয়াজান নদী। ওই নদীর পাড়ের বাসিন্দারাই তখন আমার বন্ধুজন। অবসর ছিল বলে, লেখা আর পড়া দুটোই বেশ ভালো করে করা যেত। এই মেখলিগঞ্জ আমাকে দিয়েছে বহু নাটক ও সিনেমার চিত্রনাট্য লেখার রসদ। টিভি আমার ওখানে ছিল না, কিন্তু আমার একটা ডিস্কম্যান ছিল। সিডি আর স্পিকার সহযোগে বেশ কাটতো সুরেলা এক একটা বেলা। মেখলিগঞ্জ আমাকে এই জীবনটা দিয়েছে, যে জীবনটা না থাকলে হয়তো আজকের 'আমি'টা হয়ে উঠতাম না। নাগরিক জীবনের যে ব্যস্ততা, আজ বুঝতে পারি মনোনিবেশ না করতে পারলে একটা সময় নিয়ে, কোনও কিছুই সম্ভব নয়। আজ আমি না চাইলেও সেই মোবাইলের যন্ত্রণা, সোশ্যাল মিডিয়ার অত্যাচারের গড্ডালিকা প্রবাহে পড়ে গেছি।তখনও এতটা গ্রাস করেনি এইসব সমাজকে।
নীরবে চিন্তা করার সুযোগ আজকে কোথায় পাবো! সেই সময় অনেক নাটক লিখেছি, চিত্রনাট্যের খসড়া তৈরি করেছি। আর যেহেতু একা তখন, তাই পড়াশোনা, কাজকর্ম আর লেখালিখির মধ্যে দিয়েই জীবনটা বেশ কাটছিল। তিনমাস অন্তর বাড়ি গিয়ে বইপত্র নিয়ে আসতাম, শুধু ডাক্তারির বই না— ধরা যাক স্যবাইন পড়ছি, বার্ট্রান্ড রাসেল পড়ছি ('দ্যা হিস্ট্রি অফ ওয়েস্টার্ন ফিলোসফি'-তে তখন মগ্ন), বিভিন্ন রাজনৈতিক বই পড়ছি , কবিতা তো ছিলই সবসময়ের সঙ্গী। সেই সময়কার অনুভূতিগুলো অনেক তীক্ষ্ণ ছিল, যা আজ বেশ মোটা হয়ে গেছে।
মেখলিগঞ্জ অঞ্চলের একটা মজার ইতিহাস আছে। প্রথমে এটা ভুঁইয়াদের হাতে ছিল, পরে এটা রাজপুতদের হাতে চলে যায়। কোচ রাজবংশ থেকে রাজপুতরা জমি পান। এই অঞ্চলের লোকেরা, যারা নর্মদা তীর থেকে এসেছে তাদের বলা হতো 'মেখলা', সেখান থেকেই মেখলিগঞ্জ। রাজপুতরা এখানে বাণিজ্য কেন্দ্র তৈরি করে। তিস্তাকে ঘিরে চাষ আবাদ শুরু হয়।
এই অঞ্চলে থাকতে থাকতে দেখেছিলাম ছিটমহল। বলা যেতে পারে রাষ্ট্রহীন কিছু দ্বীপ, জেগে আছে ভারত-বাংলাদেশ বর্ডার বরাবর। নিজের দেশে আসার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গেট খুলে দেওয়া হয়। এই নৃশংসতা আমি আজও মেনে নিতে পারি না। যদি কারোর মেডিকেল এমার্জেন্সি হয়, তখন তাদের বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তেই হবে, এটাই নিয়তি। সীমান্ত সন্ত্রাস এখান থেকেই শুরু হয়। ওখানে না গেলে এই 'রাষ্ট্রহীন জীবনের' কথা তো জানতেই পারতাম না। তখন বয়সটা তরুণ কিন্তু কোনও রোমান্টিক জীবনযাপন করেছি মেখলিগঞ্জে একদমই নয়, বুঝেছি রূঢ় বাস্তব কাকে বলে। ভাবলে কষ্ট হয়, চোখের সামনে দেখেছি— চিকিৎসা বিষয়টা কেমনভাবে বিপণনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। সুযোগ সুবিধা হাসপাতালে সব ছিল না, বহু রোগের চিকিৎসা করা যেত না তখনও। তাই অঞ্চলের মানুষরা আবার সেই জলপাইগুড়ি জেলা হাসপাতালে যেতে বাধ্য হতো। তবুও তার মধ্যে কিছু চিকিৎসক ও কর্মীদের নিরলস পরিশ্রম সেই অঞ্চলের জন্য একটা অবলম্বন ছিল। মানুষের আন্তরিকতা ছিল, প্রাণ ছিল এই সাধারণ জীবন যাপনে। সন্ধ্যায় মাঝে মাঝে ভিডিও হলে যাওয়া হতো। থিয়েটার সেই অঞ্চলে নজরে না এলেও, কিছু ছায়াছবি দেখেছি। নিত্য দিনের সব কিছু এখানে পাওয়া যেত এমনটা নয়, পাট শাক দিয়ে তৈরি ব্যঞ্জন আর বোরোলি মাছের ঝোলের মশলায় ছিল আপনজনের স্নিগ্ধতা। ন্যূনতমর মধ্যে দিয়ে একটা যাপনের চেষ্টা আমাকে বারবার মেখলিগঞ্জের মেঠো জীবনটার কাছে পৌঁছে দেয়।
