সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে গত আগস্টে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ এখন প্রথম বাস্তব পরীক্ষার মুখে। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বাহিনীর রিয়াদ ও আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলোতে হামলার পর ৫ অক্টোবর রিয়াদে জরুরি বৈঠকে তিন দেশ চুক্তির ‘সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেয়।
চুক্তির মূল নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিনটি দেশের বিরুদ্ধেই হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে, যা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তির মূল ধারার সঙ্গে তুলনীয় ।
এই ঘটনার তাৎপর্য শুধু সৌদি-হুথি সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি উপসাগর, লোহিত সাগর, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার নতুন পর্যায় নির্দেশ করে। মক্কা চুক্তি একটি ত্রিপাক্ষিক সামরিক সমঝোতা হলেও এর পেছনে রয়েছে ইরানের প্রভাব সীমিত করার, বাব-এল-মান্দাব প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহুমুখী করার চেষ্টা ।
হুথি হামলা কেন গুরুত্বপূর্ণ
হুথিরা কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের পক্ষ নয়, তারা ইরানের ‘অক্ষ প্রতিরোধ’ নীতির একটি আঞ্চলিক অস্ত্র হিসেবেও কাজ করে। লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থান করার কারণে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা কেবল সৌদি আরবকে নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্যকেও প্রভাবিত করে। স্বাভাবিক সময়ে বাব-এল-মান্দাব দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১২ শতাংশ বাণিজ্য চলাচল করে; তাই এই প্রণালির অনিরাপত্তা জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে ।
রিয়াদের বাদশাহ খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা এবং সৌদি রাজধানীতে ক্রমাগত আক্রমণ দেখিয়ে হুথিরা দেখিয়েছে, তারা কেবল প্রতিরক্ষামূলক শক্তি নয়, কৌশলগতভাবে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম। এই পরিস্থিতিতেই সৌদি আরব মক্কা চুক্তিকে একটি রাজনৈতিক ঘোষণা থেকে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থায় রূপান্তরের চেষ্টা করছে ।
পাকিস্তান ও তুরস্ক: সমর্থন আছে, কিন্তু যুদ্ধে টান নেই
পাকিস্তান ও তুরস্ক সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে এবং ‘সম্মত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা’ দ্রুত মোতায়েনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে । পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের ওপর কোনো আগ্রাসন সহ্য করা হবে না; তবে ইসলামাবাদের ভূমিকা মূলত প্রতিরক্ষামূলক থাকার কথা বলা হচ্ছে ।
তুরস্কের ক্ষেত্রে এরদোয়ান চুক্তিটি দ্রুত সংসদে অনুমোদনের ঘোষণা দিয়েছেন এবং হুথি হামলার নিন্দা জানিয়ে রিয়াদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছেন । কিন্তু তুরস্কের সংবিধানে বিদেশে সৈন্য পাঠানোর ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকায় আনকারার ভূমিকা এখনো কার্যত সীমিত।
মূল সমস্যা হলো- সমর্থন ঘোষণা করা এবং হুথির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া এক কথা নয়। পাকিস্তান অর্থনৈতিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আফগানিস্তান-ভারত সীমান্ত প্রসঙ্গে জটিলতার মধ্যে আছে। তুরস্ক আবার সিরিয়া, ইরাক, ভূমধ্যসাগর ও রাশিয়া-ন্যাটো সম্পর্কের মতো একাধিক ফ্রন্টে সক্রিয়। তাই দুই দেশই সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে চায়, কিন্তু ইয়েমেনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টেনে তোলার বিষয়টি এড়াতে চায় ।
চুক্তিটি কি সত্যিই প্রতিরোধক?
মক্কা চুক্তির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো এটি কি হুথি আক্রমণকে দামি করে তুলতে পারে কি না। বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া মাত্রই হুথির আক্রমণ বন্ধ হবে—এমন ধারণা করা যায় না। হুথিরা ইরানের সমর্থন, ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন সক্ষমতা এবং ইয়েমেনের ভৌগোলিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে অসমমিত যুদ্ধ চালাচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে কেবল বিমান প্রতিরক্ষা বা সৈন্য মোতায়েন যথেষ্ট নয়।
চুক্তিটি নিশ্চয়ই সৌদি আরবের জন্য রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক লাভ দিয়েছে। এটি রিয়াদকে একা নয়, বরং একটি আঞ্চলিক জোটের অংশ হিসেবে দেখায়। একই সঙ্গে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা, তুরস্কের ন্যাটো-সংযুক্ত সামরিক শক্তি এবং সৌদি আরবের অর্থনৈতিক-সামরিক শক্তির সমন্বয় একটি শক্তিশালী বার্তা দেয় । কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বার্তা কি হুথিদের থামাতে পারবে, নাকি সংঘাতকে আরও আঞ্চলিক করে তুলবে?
মিসরের সম্ভাব্য যোগদান
মিসর এখন মক্কা চুক্তিতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ‘গুরুত্বসহকারে’ বিবেচনা করছে বলে জানা গেছে । মিসরের যোগদান হলে চুক্তিটি শুধু উপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও ভূমধ্যসাগর—এই তিন কৌশলগত অঞ্চলকে সংযুক্ত একটি নিরাপত্তা কাঠামোয় রূপ নেবে।
এটি ইরানের জন্য অবশ্যই উদ্বেগজনক। কারণ ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের অন্যতম পথ হলো অসমমিত শক্তি—হুথি, হিজবুল্লাহ, ইরাকি মিলিশিয়া ও সিরিয়ার ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী। মক্কা চুক্তির সম্প্রসারণ হলে ইরানের এই প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে আরব-তুর্কি-পাকিস্তানি একটি বৃহত্তর প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য তাৎপর্য
বাংলাদেশ সরাসরি এই চুক্তির পক্ষ নয়, কিন্তু এর প্রভাব আমাদের থেকে দূরে নয়। বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক, রেমিট্যান্স, জ্বালানি আমদানি এবং বিশ্ববাণিজ্যের সঙ্গে লোহিত সাগর ও উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা গভীরভাবে সম্পর্কিত। বাব-এল-মান্দাব অনিরাপদ হলে জ্বালানি মূল্য বাড়তে পারে, শিপিং খরচ বাড়তে পারে এবং প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক শিক্ষাও রয়েছে: আঞ্চলিক নিরাপত্তা চুক্তি কেবল সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়; তা রাজনৈতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জনগণের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। মক্কা চুক্তি দেখাচ্ছে, আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন এককভাবে নয়, বরং জোটবদ্ধভাবে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যতের পথ
মক্কা চুক্তি এখন কেবল কাগজে-কলমের সমঝোতা নয়, হুথি হামলার পর তা প্রথমবারের মতো কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ে—পাকিস্তান ও তুরস্ক কতটা বাস্তব সামরিক সক্ষমতা দেবে, সৌদি আরব কি সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুলে রাখবে, এবং ইরান-হুথি জোট কি এই নতুন ভারসাম্যকে আরও উত্তেজনায় রূপ দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা কখনো শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান হয়নি। মক্কা চুক্তি হয়তো সৌদি আরবকে সাময়িক নিরাপত্তা দেবে, কিন্তু টেকসই শান্তি আসবে তখনই, যখন ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট, ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা—এই তিন সমস্যার সমন্বিত সমাধান হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের খেলা চিরতরে বন্ধ হবে।
