মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকায় চলছে টানা ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা। ইলিশের বংশবিস্তার ও ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়ানোর স্বার্থে সরকারি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও কর্মহীন হয়ে পড়া জেলেদের ঘরে এখন অভাব-অনটন। প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি খাদ্যসহায়তা অপ্রতুল বলে অভিযোগ তাদের। এর মধ্যে আয় বন্ধ থাকলেও এনজিওর ঋণের কিস্তি আদায় অব্যাহত থাকায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা।
নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন জেলেরা। নদীর তীরে তুলে রাখা হয়েছে জাল ও ট্রলার। কেউ জাল মেরামত করছেন, কেউবা নৌযান প্রস্তুত করছেন নদীতে ফেরার জন্য। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা শেষে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। ফলে একদিকে সংসার চালানোর চাপ, অন্যদিকে ঋণের বোঝা—সব মিলিয়ে কঠিন সময় পার করছেন ভোলার জেলেপল্লির বাসিন্দারা।
জেলা মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ নিষেধাজ্ঞা চলবে আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত। এর আওতায় রয়েছে ভোলার মেঘনা নদীর ইলিশা থেকে চরপিয়াল পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার এবং তেঁতুলিয়া নদীর ভেদুরিয়া থেকে চররুস্তম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এলাকা। দেশের ইলিশের ছয়টি অভয়াশ্রমের মধ্যে দুটি রয়েছে ভোলায়। নিষেধাজ্ঞাকালে এসব এলাকায় মাছ ধরা, ক্রয়-বিক্রয়, মজুত ও পরিবহন দণ্ডনীয় অপরাধ।
মৎস্য বিভাগের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ভোলার সাত উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭০। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৫৬ জন জেলের জন্য ২৫ কেজি করে মোট ৩ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪ মেট্রিক টন ভিজিএফের চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। চাল বিতরণ কার্যক্রম প্রায় শেষ পর্যায়ে।
তবে জেলেদের অভিযোগ, একটি পরিবারের পুরো নিষেধাজ্ঞার সময়ের খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর জন্য এ সহায়তা যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে যাদের পরিবারে সদস্যসংখ্যা বেশি এবং আগের মৌসুমের ঋণ রয়েছে, তাদের সংকট আরও তীব্র।
সরেজমিনে সদর উপজেলার মেঘনাতীরবর্তী শিবপুর ইউনিয়নের ভোলারখাল ও ধনিয়া ইউনিয়নের তুলাতুলি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মাছ ধরতে না পারায় অলস সময় কাটাচ্ছেন জেলেরা। নদীর তীরে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে জাল ও ট্রলার। অনেকে দলবদ্ধ হয়ে জাল মেরামত করছেন। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেই আবার নদীতে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।
জেলে মো. হান্নান, আব্দুল হক, হাসান বেপারী ও শহিদুল বলেন, ‘সরকারের অভিযান সফল হোক, আমরাও চাই। কিন্তু উপার্জন বন্ধ থাকায় চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে। ডরে-ভয়ে নদীতে যাই না। সরকার ২৫ কেজি করে চাল দিয়েছে, যা পরিবারের চাহিদার তুলনায় নামমাত্র।’
তাদের ভাষ্য, এবার পুরো মৌসুমেই নদীতে আশানুরূপ ইলিশ পাওয়া যায়নি। ফলে আগের বছরের দেনা রয়ে গেছে। মৌসুমের শেষ পর্যায়ে এসেও সেই দেনা পরিশোধের নিশ্চয়তা নেই। বরং একের পর এক সংকটে ঋণের বোঝা বাড়ছে।
এদিকে, নিষেধাজ্ঞার সময় কর্মহীন জেলেদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে জেলেপল্লিগুলোতে। জেলে মোসলেউদ্দিন, খোরশেদ ও খলিলের অভিযোগ, মাছ ধরতে না পারায় তাদের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক সময় তিন বেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। অথচ ঋণের কিস্তি আদায়ে ছাড় পাচ্ছেন না তারা।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, ‘আমাগো কামাই বন্ধ হইয়া গেছে, কিন্তু সমিতির কিস্তি বন্ধ হয় নাই। সংসার চালাইতেই পারি না, কিস্তি দেব কীভাবে? এভাবে চলতে থাকলে বাধ্য হয়েই নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নদীতে মাছ ধরতে যেতে হবে।’
নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও মাছ ধরার অভিযোগ
নিষেধাজ্ঞা শেষে নদীতে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া নিয়েও শঙ্কিত জেলেরা। মো. জাহাঙ্গীর, বশার, রাকিব ও সোহাগের অভিযোগ, সাধারণ জেলেরা অভিযান ও শাস্তির ভয়ে নদীতে মাছ ধরতে না গেলেও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় কিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই মাছ ধরছেন।
তারা বলেন, ‘আমরা নদীতে না গেলেও কিছু অসাধু জেলে ঠিকই মাছ ধরছে। আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ না হলে নিষেধাজ্ঞার সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন।’
১০ দিনে আটক ৯১ জেলে
তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১০ দিনে যৌথ অভিযানে ৯১ জন জেলেকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে জেল-জরিমানার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মৎস্যসম্পদ রক্ষায় অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মুহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইন বলেন, ‘নিষেধাজ্ঞা সফলভাবে বাস্তবায়নে সবার জন্য সমানভাবে আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রয়োজনে রাতেও মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করা হবে। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মৎস্য বিভাগের কারও বিরুদ্ধে অসৎ কাজে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অপেক্ষা নদীতে ফেরার নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সময় নদীনির্ভর জেলে পরিবারগুলোর জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সীমিত খাদ্যসহায়তা, পুরোনো ঋণ এবং কিস্তির চাপের মধ্যে দিন কাটানো জেলেদের কাছে নিষেধাজ্ঞার বাকি দিনগুলো তাই বড় চ্যালেঞ্জ।’
