চকলেট কারখানায় কাজ নিয়েছেন দুই বান্ধবী। চলন্ত বেল্টে একের পর এক চকলেট আসছে। তাঁদের কাজ সেগুলো মোড়কে ভরা। প্রথমে সব ঠিকঠাক। তারপর গতি বাড়ে। তাল মেলাতে না পেরে তাঁরা চকলেট মুখে পুরতে থাকেন, পোশাকের ভেতর লুকিয়ে ফেলেন। কাজ সামলানোর চেষ্টা যত বাড়ে, বিপত্তিও তত বড় হয়। ‘আই লাভ লুসি’র ‘জব সুইচিং’ পর্বের এই দৃশ্যে হাসির জন্য দীর্ঘ সংলাপের প্রয়োজন পড়ে না। লুসিল বল ও ভিভিয়ান ভ্যান্সের মুখভঙ্গি, হাতের তৎপরতা আর ধরা পড়ার ভয়ই যথেষ্ট। একটি সাধারণ পরিস্থিতিকে অভিনয় কীভাবে অসাধারণ করে তোলে, দৃশ্যটি তার স্মরণীয় উদাহরণ।
আজ বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, মার্কিন সিটকম ‘আই লাভ লুসি’র প্রথম প্রচারের ৭৫ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৫১ সালের এই দিনে সিবিএসে শুরু হয়েছিল সিরিজটি। সাদা–কালো পর্দায় এক দম্পতির সংসার, বন্ধুত্ব আর ছোট ছোট বিপত্তির গল্প দেখতে বসেছিলেন দর্শক। সেই গল্পই ক্রমে বদলে দিয়েছিল টেলিভিশনের নির্মাণপদ্ধতি ও ব্যবসার ধারণা। পর্দায় ছিলেন লুসিল বল; নেপথ্যে ছিল অভিনয়, নির্মাণ ও স্বত্ব নিয়ে কয়েকটি দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
সংসারের বাইরে লুসির স্বপ্ন
সিরিজে লুসিল বলের চরিত্রের নাম লুসি রিকার্ডো। স্বামী রিকি রিকার্ডোর ভূমিকায় তাঁর বাস্তব জীবনের স্বামী, কিউবায় জন্ম নেওয়া সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ডলিডার দেশি আর্নাজ। নিউইয়র্কে তাঁদের সংসার। রিকি একটি নাইট ক্লাবের অর্কেস্ট্রার নেতৃত্ব দেন। লুসিরও ইচ্ছা বিনোদনজগতে জায়গা করে নেওয়ার। স্বামীর অনুষ্ঠানে ঢুকে পড়া, নিজের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ তৈরি করা কিংবা নতুন কোনো পরিকল্পনায় নামা—সেই ইচ্ছা থেকেই বারবার বিপত্তির শুরু।

তাঁদের বাড়িওয়ালা, প্রতিবেশী ও বন্ধু এথেল এবং ফ্রেড মার্টজের চরিত্রে ছিলেন ভিভিয়ান ভ্যান্স ও উইলিয়াম ফ্রলি। লুসির উদ্যম, রিকির আপত্তি আর দুই বন্ধুর সঙ্গে তাঁদের খুনসুটিতে তৈরি হতো হাসির নতুন পরিস্থিতি। চারজনের সম্পর্ক দর্শকের এত চেনা হয়ে উঠেছিল যে একই সংসারে বারবার ফিরতেও একঘেয়ে লাগত না।
লুসি রিকার্ডো হওয়ার আগে বল ছিলেন সিবিএসের জনপ্রিয় বেতার অনুষ্ঠান ‘মাই ফেবারিট হাজব্যান্ড’–এর তারকা। অনুষ্ঠানটিকে টেলিভিশনে নেওয়ার ভাবনা থেকেই ‘আই লাভ লুসি’র সূত্রপাত। লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের ‘আই লাভ লুসি: অ্যান আমেরিকান লেজেন্ড’ প্রদর্শনীতে এই যাত্রার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে পারিবারিক স্ক্র্যাপবুক, ছবি, চিত্রনাট্য ও সংগীতের নথির মাধ্যমে।
তবে দেশিকে পর্দার স্বামী হিসেবে পাওয়ার পথ সহজ ছিল না। কিউবায় জন্ম নেওয়া দেশিকে একজন সাধারণ মার্কিন স্বামীর চরিত্রে দর্শক বিশ্বাসযোগ্য মনে করবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল সিবিএসের কর্তাদের। বল ও আর্নাজ একসঙ্গে মঞ্চে অনুষ্ঠান করে দর্শকের সাড়া দেখিয়েছিলেন। নিজেদের জুটির ওপর তাঁদের আস্থা শেষ পর্যন্ত টেলিভিশনেও জায়গা করে নেয়।
তিন ক্যামেরায় ধরা হাসি
সিরিজটির বড় পরিবর্তন ঘটেছিল ক্যামেরার পেছনে। বল ও আর্নাজ হলিউডে স্টুডিওর দর্শকের সামনে অভিনয় করে তা ফিল্মে ধারণ করতে চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, মঞ্চে অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা থাকবে, আবার ছবিও সংরক্ষিত হবে ভালো মানে।
একসঙ্গে তিনটি ৩৫ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণ করা হতো। চিত্রগ্রাহক কার্ল ফ্রয়েন্ড সেটজুড়ে প্রায় সমান আলো রাখার ব্যবস্থা করেন, যাতে অভিনয় চলার সময় বারবার আলো বদলাতে না হয়। অভিনয়শিল্পীদের পারস্পরিক প্রতিক্রিয়া ও উপস্থিত দর্শকের হাসি এই নির্মাণপদ্ধতিকে প্রাণ দিত।

একাধিক ক্যামেরা ব্যবহারের ধারণা আগেও ছিল। ‘আই লাভ লুসি’র কৃতিত্ব ছিল দর্শকের সামনে অভিনয়, ফিল্মে ধারণ ও তিন ক্যামেরার কাজকে সফলভাবে একসঙ্গে মেলানোয়। লাইব্রেরি অব কংগ্রেস এই পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ফ্রয়েন্ড ও সিরিজের প্রথম পরিচালক মার্ক ড্যানিয়েলসের ভূমিকা উল্লেখ করেছে। পরবর্তী সময়ে এটি স্টুডিওতে দর্শকের উপস্থিতিতে নির্মিত সিটকমের একটি মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
লুসিলের হাসির ভেতরে
সেই প্রযুক্তির কেন্দ্রে ছিলেন একজন অসাধারণ অভিনেত্রী। সিনেমায় বহু বছর কাজ করলেও লুসিল বলের প্রতিভা বিকাশের অনন্য সুযোগ তৈরি করে দেয় লুসি রিকার্ডো চরিত্রটি। বেসুরো গান গাওয়া থেকে স্বামীর সঙ্গে নিজেকে হাতকড়ায় আটকে ফেলা—বিব্রতকর পরিস্থিতিতে নিজেকে ঠেলে দিতে তাঁর অভিনয়ে দ্বিধা ছিল না।
লুসির আত্মবিশ্বাস ও কাজের পরিণতির মধ্যে ব্যবধানটাই হাসির বড় উৎস। দর্শক বিপদ টের পান, লুসি তখনো নিজের পরিকল্পনায় অটল। সেই আত্মবিশ্বাসের ফাটল মুখে কখন ফুটবে, কখন থামতে হবে, কখন বিপত্তিকে আরও বাড়তে দিতে হবে—বল তা বুঝতেন নিখুঁতভাবে। নিজের চরিত্রকে হাস্যকর হতে দেওয়ার মধ্যেই ছিল তাঁর অভিনয়ের শক্তি।

তবে এই হাসির ভিত ছিল চিত্রনাট্য। জেস ওপেনহাইমার, ম্যাডেলিন পিউ ও বব ক্যারল জুনিয়র বেতার অনুষ্ঠান থেকে টেলিভিশনেও এসেছিলেন। টেলিভিশন একাডেমির প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণামূলক নিবন্ধে পরিচালক উইলিয়াম অ্যাশার জানিয়েছেন, কোনো কৌতুক চরিত্রের স্বভাবের সঙ্গে না মিললে তাঁরা তা রাখতেন না। তাই লুসির কাণ্ড যতই অদ্ভুত হোক, মানুষটিকে দর্শকের চেনা লাগত।
মাতৃত্বও হয়ে উঠল গল্প
১৯৫২ সালে বল অন্তঃসত্ত্বা হলে সিরিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। ওপেনহাইমার প্রস্তাব দেন, বিষয়টিকে গল্পে যুক্ত করা হোক। শুরুতে সিবিএস ও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানের কর্তারা আপত্তি জানিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত বাস্তব জীবনের পরিবর্তন পর্দার লুসির জীবনেও আসে।
১৯৫৩ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রচারিত হয় ‘লুসি গোজ টু দ্য হসপিটাল’। একই দিন বলের ছেলে দেশি আর্নাজ জুনিয়রের জন্ম হয়। টেলিভিশন একাডেমির হিসাবে, পর্দায় লুসির সন্তান জন্মের পর্বটি দেখেছিলেন প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ দর্শক। একটি কাল্পনিক পরিবারের ঘটনা কতটা বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, পর্বটি ছিল তার স্মরণীয় উদাহরণ।
শেষ হয়েও থেকে যাওয়া
জনপ্রিয়তার হিসাবেও সিরিজটি ব্যতিক্রম। ছয় মৌসুমের চারটিতে এটি নিলসেন রেটিংয়ে শীর্ষে ছিল। শীর্ষস্থান ধরে রেখেই মূল সম্প্রচার শেষ করা প্রথম টেলিভিশন সিরিজও এটি। নিয়মিত আধঘণ্টার সিরিজের শেষ পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৫৭ সালের ৬ মে। পরে একই চরিত্রদের নিয়ে ১৩টি এক ঘণ্টার বিশেষ অনুষ্ঠান তৈরি হয়, যা ১৯৫৭ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৬০ সালের এপ্রিলের মধ্যে প্রচারিত হয়েছিল।

ফিল্মে ধারণ করার সিদ্ধান্ত অনুষ্ঠানটিকে দীর্ঘ জীবন দেয়। ভালো মানে সংরক্ষিত পর্ব বারবার দেখানো সম্ভব হয়। বল ও আর্নাজ কম পারিশ্রমিক নেওয়ার বিনিময়ে অনুষ্ঠানটির ফিল্মের মূল নেগেটিভের পূর্ণ মালিকানা নিজেদের হাতে রেখেছিলেন। এই সিদ্ধান্ত পরে পুনঃপ্রচার থেকে আয়ের বড় সুযোগ তৈরি করে দেয়। নতুন পর্ব তৈরি বন্ধ হওয়ার পরও একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠান যে মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকতে পারে, ‘আই লাভ লুসি’ তা প্রতিষ্ঠা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
লুসির গল্পে সে সময়ের সামাজিক সীমাবদ্ধতাও আছে। সংসারের বাইরে কিছু করতে গিয়ে তিনি প্রায়ই ব্যর্থ হন, ফিরে আসেন পরিচিত জীবনে। তবু তাঁর ইচ্ছাটি মুছে যায় না। পরের পর্বে আবার সুযোগ খোঁজেন। নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়ার এ আকাঙ্ক্ষাই চরিত্রটিকে শুধু বিপত্তি ঘটানো গৃহিণীর পরিচয়ে আটকে থাকতে দেয় না।
৭৫ বছর পরও সিরিজটির প্রভাবের স্বীকৃতি মিলছে। ২০২৬ সালে টেলিভিশন একাডেমির প্রথম ‘লিগ্যাসি অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে ‘আই লাভ লুসি’। দর্শক, সংস্কৃতি ও টেলিভিশনশিল্পে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের জন্য এই সম্মান। চকলেটের বেল্টে তাল মেলাতে না পারা লুসি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আজও দর্শক হাসাচ্ছেন।
