কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে সাত টার দিকে পাটোয়ারটেক সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এ ঘটনায় অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ঢাকার একটি পরিবারের সদস্য এবং রিসোর্টের কর্মী রয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না এবং গত জুনে এটিকে ঝুকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
ঘটনার পর ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও প্রশাসনের সদস্যরা উদ্ধারকাজ চালান। ফায়ার সার্ভিসের উখিয়া ও কক্সবাজার স্টেশনের চারটি ইউনিট প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনে রিসোর্টটির কাঠের স্থাপনা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উদ্ধার করা মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ, রিসোর্টটির বৈধতা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার ত্রুটি খতিয়ে দেখতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক বলেন, নিহতদের মরদেহ পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তদন্তে মালিকপক্ষের গাফিলতি প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে অগ্নিঝুকি ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে সতর্ক করা হয়েছিল।
রিসোর্টটি কাঠ ও বাশের মতো দাহ্য উপকরণে তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত উৎস এখনো নিশ্চিত হয়নি। রান্নাঘরের চুল্লি কিংবা রেফ্রিজারেটরের বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক ধারণা। তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হলেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবীর (৩৩) ও পাচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। তাঁদের ঠিকানা হিসেবে ঢাকার বনশ্রী ও খিলগাঁও এবং চুয়াডাঙ্গার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
বাকি চারজনের মরদেহ গুরুতরভাবে পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে জটিলতা দেখা দিয়েছে। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রশাসন জানিয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাদের শিহাব উদ্দীন (৩১), নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাটোয়ারটেক এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল ইসলাম ও অন্য প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, শনিবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টের রান্নাঘরের দিক থেকে বিকট শব্দ শোনার পর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ভেতরে থাকা পর্যটকদের চিৎকার শুনে স্থানীয় কয়েকজন তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যান। তাঁদের দাবি, কয়েকজনকে টেনে বের করা সম্ভব হলেও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সবাইকে উদ্ধার করা যায়নি।
রিসোর্টের কর্মী ও মালিকপক্ষের কেউ কেউ পর্যটকদের উদ্ধারে চেষ্টা না করে ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে গেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান মজুমদার জানান, শনিবার বিকেল পর্যন্ত এ ঘটনায় নিয়মিত ফৌজদারি মামলা হয়নি। তবে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে থানায় অপমৃত্যুর মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। নিহতদের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের কার্যক্রম চলছে। পরিচয় নিশ্চিত করা এবং স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, লাইসেন্স, আগুনের উৎস এবং সতর্কবার্তা পাওয়ার পরও কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়গুলো তদন্তে গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
