রাশিয়ার সম্ভাব্য সামরিক হুমকি মোকাবিলা ও সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করতে ১০ লাখ পদাতিকবিরোধী স্থলমাইন সংগ্রহের পরিকল্পনা করছে ফিনল্যান্ড। এ প্রকল্পে প্রায় ১০ কোটি ইউরো বা ১১ কোটি ২০ লাখ ডলার ব্যয় হতে পারে। স্থলমাইন নিষিদ্ধ করার আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশ সরে আসার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ইউক্রেনকে সমর্থনকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে রাশিয়া প্রচলিত সামরিক তৎপরতার বাইরেও বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির সম্ভাব্য সামরিক উসকানি নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালে স্থলমাইন নিষিদ্ধসংক্রান্ত অটোয়া কনভেনশন থেকে বেরিয়ে আসে ফিনল্যান্ড। একই পথে হাঁটে এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ড। রাশিয়ার সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলার যুক্তিতে দেশগুলো এ সিদ্ধান্ত নেয়।
ফিনল্যান্ডের সেনাবাহিনীর কমান্ডের কর্নেল রিকু মিক্কোনেন দেশটির জাতীয় সংবাদ সংস্থা এসটিটিকে জানিয়েছেন, স্থলমাইন সংগ্রহের বিষয়ে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ফিনল্যান্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সম্ভব হলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এসব স্থলমাইন উৎপাদন করা হবে। এ লক্ষ্যে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ চুক্তি স্বাক্ষর এবং ২০২৮ সালের মধ্যে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মিক্কোনেন বলেন, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো পদাতিকবিরোধী স্থলমাইন তৈরি করতে পারলে তা ফিনল্যান্ডের জন্য বিভিন্ন দিক থেকে লাভজনক হবে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ছয়টি প্রতিষ্ঠানের এ ধরনের অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রয়োজন হলে বিদেশি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে স্থলমাইন কেনার বিকল্পও খোলা রাখা হয়েছে।
অটোয়া কনভেনশন থেকে কেন সরে গেল ফিনল্যান্ড
পদাতিকবিরোধী স্থলমাইনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা এবং মজুত থাকা এসব অস্ত্র ধ্বংসের লক্ষ্য নিয়ে গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি অটোয়া কনভেনশনে ২০১২ সালে যোগ দিয়েছিল ফিনল্যান্ড। চুক্তির আওতায় দেশটি ১০ লাখেরও বেশি স্থলমাইন ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির কথা উল্লেখ করে ২০২৫ সালের এপ্রিলে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় দেশটি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয় ফিনল্যান্ড।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেত্তেরি অর্পো রাশিয়াকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেন। ফিনল্যান্ডের সঙ্গে রাশিয়ার পূর্ব সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ৩৪০ কিলোমিটার। ফলে সীমান্ত সুরক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা হেলসিংকির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে ফিনল্যান্ড। একই সঙ্গে রাশিয়ার দিক থেকে অভিবাসীদের সীমান্ত অতিক্রম করে ফিনল্যান্ডে পাঠানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে দেশটি।
রুশ পর্যটকদের ভিসা বন্ধে ইইউকে আহ্বান
রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিনা ভালতোনেন। সোমবার তিনি বলেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশটির নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া বন্ধ রাখা উচিত।
ভালতোনেনের ভাষ্য, রাশিয়া যত দিন ইউক্রেনে আগ্রাসন চালাবে, তত দিন রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া সমীচীন নয়। ইউক্রেনের মানুষের বাড়িঘরে যখন রুশ বাহিনী বোমা হামলা চালাচ্ছে, তখন রাশিয়ার নাগরিকদের ইউরোপের স্বাধীনতা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে দেওয়াকে তিনি অনুচিত বলে মন্তব্য করেন।
ফিনল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে শেনজেনভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার নাগরিকদের প্রায় পাঁচ লাখ পর্যটন ভিসা দিয়েছিল। ফিনল্যান্ড অবশ্য ২০২২ সালেই রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্যদেশগুলোকেও একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন ভালতোনেন।
স্থলমাইন সংগ্রহের পরিকল্পনা এবং রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা বন্ধের দাবি—দুই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপের নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
