দ্যা নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকম | স্টাফ রিপোর্টার প্রকাশিত: অক্টোবর ১১, ২০২৬, ১০:০৭ পিএম
নারায়ণগঞ্জে পলাতক ওসমান পরিবারের বিষোদাগার করে বেশ আলোচনায় মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি বেশ সোচ্চার। বিশেষ করে বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী ইস্যু নিয়ে তিনি তোলপাড় সৃষ্টি করেছিলেন। আলীকে তিন ওসমানদের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। কিন্তু এবার সেই টিপুকে দেখা গেছে হেফাজতে ইসলামের বিতর্কিত নেতা মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানের পাশে। এ নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। টিপু বক্তব্যে ওসমানদের কঠোর সমালোচনা করলেও শামীম ওসমানের ‘ছোট ভাই’ খ্যাত ফেরদাউসুর রহমান যখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিগৃহীত তখন তাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন টিপু।
সরকারী জায়গা দখল করে নির্মিত নম পার্কের রাহবার নিজামের ডেরায় বসে দিনরাত কূটকৌশল করে শামীম ওসমানের ‘ছোট ভাই’ উপাধি পাওয়া নেতারা এখন মিশে যাচ্ছে বিএনপির সমর্থকদের সঙ্গে।
৯ অক্টোবর শহরের একটি রেস্টুরেন্টে ওলামা কল্যাণ পরিষদ নামের একটি ভূইফোঁড় সংগঠনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন টিপু। এতে সভাপতিত্ব করেন ফেরদাউসুর। সেখানে টিপু ছাড়া বিএনপির আর কোন নেতাকে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামের নারায়ণগঞ্জের সমন্বয়ক ছিলেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-প্রচার সম্পাদক পদেও আসীন হয়েছিলেন তিনি। ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনে কঠোর ভূমিকা রেখে নারায়ণগঞ্জে বেশ আলোচিত একজন হয়ে ওঠেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। ধীরে ধীরে সংগঠনের আদর্শ উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন প্রভাবশালী এমপি বর্তমানে পলাতক শামীম ওসমানের পারপাস সার্ভ করতে কাজ করে যান তিনি। শামীম ওসমানের হয়ে তার প্রতিপক্ষ নাসিকের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াত আইভীকে ঠেকাতে কাজ করেন তিনি।
পর্দার আড়ালে শামীম ওসমানের হুকুম তামিল করতে ঝাপিয়ে পড়েন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান। ধীরে ধীরে সেইসব পর্দার অন্তরালের বিষগুলো শামীম ওসমানের সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তে প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। শামীম ওসমান প্রকাশ্যেই নিজেই ঘোষণা করেন মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান তার ছোট ভাই। সেই ফেরদাউসুর রহমান আওয়ামীলীগের নৌকা প্রতীকের ব্যানার নিয়ে হেফাজত ইসলামের নেতাকর্মীদের নিয়ে শোডাউন করতেও দ্বিধাবোধ করেননি।
২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে শামীম ওসমানের জয় সহজ করে দিতে জমিয়তে ওলামায়ৈ ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মনির হোসাইন কাসেমীর মনোনয়ন বাগিয়ে অনতে কাজ করেন ফেরদাউসুর রহমান। নির্বাচনে যেনো কোনোভাবেই বিএনপির গিয়াসউদ্দীন কিংবা শাহআলম ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন না পান। শামীম ওসমানের দাবি বাস্তবায়নে এতটাই উদগ্রীব ছিল যে, কেন্দ্রীয় জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম সারাদেশের সব আসন ছাড় দিলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি ছাড়তে নারাজ থাকে। ফলশ্রæতিতে মনির হোসাইন কাসেমীকেই ধানের শীষ প্রতীকে মনোনিত করা হয় এবং ফেরদাউসুর রহমানের মিশন বাস্তবে রূপ নেয়।
একই পন্থীয় ভূমিকা রাখেন সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়ন পরিষদের গত নির্বাচনে। নির্বাচনে প্রথমে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পান সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান। কিন্তু জাকির হোসেনও নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে আগ্রহী ছিলেন। এতে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সঙ্গে মধ্যস্ত করেন ফেরদাউসুর রহমান। মাঝখানে কাজে লাগান অস্ত্রধারী ক্যাডার শাহ নিজামকে। এ নিজামের পরিচালনাধীন নম পার্কে নিয়মিত আড্ডা বসাতেন তিনি। ছিলেন বুলবুল নামের একজন জমির দালাল। মতিউর রহমানকে চাপ প্রয়োগ করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো হয়। মতি তখন নিজকে অসুস্থ দাবি করে নির্বাচন থেকে সরে যান। দ্বিতীয় দফায় কৌশলে জাকির হোসেনের জন্য নৌকা প্রতীকে এনে দেন শামীম ওসমান। জাকির হোসেনের ওই নির্বাচনে মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নৌকা প্রতীকে মনোনযন জমা দেন জাকির হোসেন। নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের নিয়ে জাকির হোসেনের নৌকার পক্ষে শোডাউন করেন এবং নির্বাচনী কাজ করেন।
গত ১৮ এপ্রিল জমিয়তের কেন্দ্রীয় কমিটির আমেলা সভা হয় যেটা দলের একটি সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম। সেখানে উঠে তৎ সময়ে জমিয়তের জেলার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাওলানা হারুন অর রশিদ কথা বলেন। তিনি বলেন, ফেরদাউসুর রহমানের সাথে তার ২০ বছরের অধিক সময় ধরে সম্পর্ক। বিগত দিনে সংগঠনের স্বার্থে অনেক কিছুই বলা হয়নি। কিন্তু এখন বিবেক ও মনুষ্যতের জন্য অনেক কিছু জানানো প্রয়োজন।
হারুন বলেন, ‘র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আলেপউদ্দিন (ধর্ষণ সহ নানা অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবন্দী) এর সাথে ফেরদাউসুরের ভালো সম্পর্ক ছিল। তখন আলেপের সোর্স হিসেবে কাজ করতেন ফেরদাউস। আমি কাছে থেকে দেখেছি ২০২১ সালে এ আলেপকে তথ্য দিয়ে মুফতি মনির হোসাইন কাসেমীকে গ্রেপ্তার করানো হয়। ওই সময়ে আলেপের কাছ থেকে সুবিধা নেয় ফেরদাউসুর। আমি তখন ঘটনার সাক্ষী ছিলাম। বার বার ফেরদাউসকে এসব বিষয়ে সতর্ক করলেও তিনি মানেনি।
‘শুধু মনির হোসাইন কাসেমী না বরং নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার শতাধিক আলেম ওলামাকে গ্রেপ্তারের পেছনে ফেরদাউসুরের হাত ধরেছে।’ বক্তব্যে যোগ করেন হারুন।
সভায় জানানো হয়, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে মনির হোসাইন কাশেমী সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু তখন শামীম ওসমানের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে পোলিং এজেন্টের তালিকা বিক্রি করে দেয় ফেরদাউসুর। নিয়মিত শামীম ওসমানের জামতলার বাসায় গিয়ে তথ্য আদান প্রদান করতেন।
হারুন সভায় সবশেষ ২০২৬ এর ১২ ফেব্রæয়ারীর সংসদ নির্বাচন নিয়েও কথা তুলেন। বলেন, ‘ফেরদাউস আমাদের ও দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মোনাফেকগিরি করেছেন। তিনি উপরে জোট প্রার্থী ও আমাদের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমীর পক্ষ নিলেও প্রতিদিন রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহ আলম, গিয়াসউদ্দিন ও মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করতেন। এদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা এনেছেন। এক বৈঠকে রোজেল ও রানাসসহ কয়েকজনের উপস্থিতিতে ফেরদাউস শপথ করিয়েছেন কোনভাবেই যেন মনির কাসেমীকে জয়ী না করানো হয়। কারণ আমি যে মনির কাসেমীকে ২০২১ সালে গ্রেপ্তার করিয়েছি এটা সে জানে। তিনি জয়ী হলে আমাকে জেলে ভরবে।
হারুনের বক্তব্য চলাকালে ফেরদাউস মাথা নিচু করে বসে থাকেন।
২০২১ সালের ২০ মার্চ আলীরটেকের ডিক্রিরচর ঈদগাহ মাঠে ইসলামি মহাসম্মেলন করে ওলামা পরিষদ। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়েছিলেন তৎকালিন এমপি শামীম ওসমান। এসময় তিনি মাওলানা ফেরদাউসুর রহমানকে তার ছোট ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছিলো।
এর আগে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৩ মে বন্দরের পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সেদিন শ্যামল কান্তিকে কান ধরে উঠবস করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পরে এই ঘটনা প্রকাশ পেলে সারাদেশজুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। এই ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে যান ওসমান পরিবার। ঠিক সে সময়েই তাদের পাশে দাঁড়ান নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের নেতারা। ওই বছরের ২০ মে নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজত আয়োজিত শহরের ডিআইটি জামে মসজিদের সামনে ‘নারায়ণগঞ্জের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা’ ব্যানারে সমাবেশ করা হয়। সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জ হেফাজত নেতারা শ্যামল কান্তিকে শাস্তি দিতে সরকারকে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। সেই সাথে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে হরতাল- অবরোধ করে দেশ অচল করে দেয়ার ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে ২০১৭ সালের ২০ এপ্রিল ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিষয়ে কটূক্তির অভিযোগ এনে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রফিউর রাব্বির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম (ক অঞ্চল) অশোক কুমার দত্তের আদালতে হেফাজতে ইসলাম নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সমন্বয়ক মাওলানা ফেরদাউসুর রহমান এই মামলা করেন।
২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলামের মিছিলে দুই গ্রæপের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এদিন জুমআর নামাজের পর শহরের ডিআইটি কেন্দ্রীয় রেলওয়ে জামে মসজিদের সামনে এই ঘটনা ঘটে। প্রায় মিনিট দশেক ধরে হেফাজতের নেতাকর্মীদের মধ্যে হৈ চৈ ও হাতাহাতি চলে। পরে সিনিয়ররা নেতারা বার বার অনুরোধ করলে থামে। তবে পÐ হয়ে যায় পূর্ব ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিল। পরবর্তীতে অপর একটি গ্রæপ মিছিল করে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
