মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ও সারের বাড়তি দাম, ঋণের চাপ এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতি কঠিন বিশ্ব অর্থনীতির চ্যালেঞ্জে পৃথিবী। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল চ্যালেঞ্জের বিষয় এসেছে।
আর বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হচ্ছে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপ। পরিসংখ্যান বলছে সাত মাসে এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪১২ কোটি মার্কিন ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার প্লেনারি অধিবেশনে এসব ঝুঁকির পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
১৬ অক্টোবরের সভায় বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। তার হিসাবে, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন, অথচ বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে প্রায় ৪০ কোটি। অর্থাৎ সম্ভাব্য কর্মসংস্থানের ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৮০ কোটি।
একই দিনে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোর সহযোগিতার ওপর জোর দেন।
বাংলাদেশের জন্য এসব বার্তার তাৎপর্য শুধু বাড়তি আমদানি ব্যয়ে সীমাবদ্ধ নয়। জ্বালানি ও সারের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে আমদানি ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন খরচ ও সরকারি অর্থায়নের ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সময়ে ঋণ পরিশোধের দায় সামলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি এবং সামাজিক সুরক্ষা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাড়তি ব্যয়ের বড় চাপ জ্বালানি ও সারে
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের উপস্থাপিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর—এই সাত মাসে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৪১২ কোটি ডলার। এর মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানিতে অতিরিক্ত ১৮২ কোটি ডলার, তেল আমদানিতে ২২১ কোটি ডলার এবং সারে প্রায় ৭ কোটি ডলারের বাড়তি ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে। উপদেষ্টা সতর্ক করেছেন, সংঘাত অব্যাহত থাকলে প্রতি মাসে আরও প্রায় ৬০ কোটি ডলার ব্যয়ের চাপ তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের নজরে ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের ঘাটতি
শুক্রবারের প্লেনারি অধিবেশনে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়ন অর্থায়নের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বৈশ্বিক উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে রাখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে ১২০ কোটি তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন। কিন্তু বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী তাদের জন্য চাকরি তৈরি হতে পারে মাত্র ৪০ কোটি। ফলে সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৮০ কোটি কর্মসংস্থানের।
বাঙ্গার বক্তব্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে—অবকাঠামো ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ, ব্যবসার জন্য স্থিতিশীল নীতি ও বিধিবিধান এবং বেসরকারি বিনিয়োগের ঝুঁকি কমিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানো। বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও ডিজিটাল সংযোগের পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দক্ষতা উন্নয়নকে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেন।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে,২০২৬ অর্থবছরে সংস্থাটি বেসরকারি খাত থেকে প্রায় ১১২ বিলিয়ন ডলার পুঁজি সংগ্রহে সহায়তা করেছে। ২০২২ অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। নিজস্ব অর্থায়নের সঙ্গে বেসরকারি পুঁজি যুক্ত করে ওই অর্থবছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের মোট অর্থায়ন ২৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে সীমিত বলে মনে করছে বাঙ্গা।
বিশ্বব্যাংক একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ খাতে অর্থায়ন পাঁচ বছরে পাঁচগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য জানিয়েছে। ২০২৬ থেকে ২০৩০ অর্থবছরে এ খাতে ১৯ বিলিয়ন ডলার অর্থায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবছরে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। সংস্থাটি এ খাতে স্থানীয় শিল্প গড়ে তোলা ও উৎপাদনশীল দেশেই বেশি কর্মসংস্থান এবং মূল্য সংযোজন ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। এ উদ্যোগের জন্য ২০টি সম্ভাব্য অংশীদার দেশ চিহ্নিত করার কথাও জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে আলোচনায় আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বিশ্ব অর্থনীতির ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে জরুরি ও কার্যকর সহযোগিতার আহ্বান জানান। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি ও খাদ্যের উচ্চমূল্য, বাণিজ্যব্যবস্থার পরিবর্তন, বাড়তে থাকা ঋণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ—এসব বিষয় বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
আইএমএফ চলতি ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত করলেও সংস্থাটি বলেছে, এ হার ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় কম। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে সৃষ্ট জ্বালানি ধাক্কা, ঋণের উচ্চমাত্রা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের প্রবণতা হঠাৎ বদলে গেলে প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গত ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে আইএমএফ জানায়, এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে। উদীয়মান এশিয়ার প্রবৃদ্ধিও ২০২৫ সালের ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ৫ দশমিক ১ শতাংশে নামতে পারে।
আইএমএফের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পণ্য ও জ্বালানির দাম উঁচু থাকবে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোতে সুদের হার ও সরকারি ঋণের চাপ বাড়লে এশিয়ার দেশগুলোর ঋণ নেওয়ার খরচও বেড়ে যেতে পারে। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূল্যস্থিতি ও বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখার এবং সরকারগুলোকে সবার জন্য ব্যাপক ভর্তুকির বদলে প্রয়োজনভিত্তিক ও সাময়িক সহায়তা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
ঋণ ও বৈষম্য নিয়ে প্রতিবাদ
বার্ষিক সভাকে ঘিরে ব্যাংককে নাগরিক সমাজ, শ্রমিক, কৃষক ও পরিবেশবাদী গোষ্ঠীর প্রতিবাদও আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। প্রতিবাদকারীরা ঋণের বোঝা, বৈষম্য, পরিবেশগত ক্ষতি এবং উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণের ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ জানান। তাদের দাবির মধ্যে ছিল ঋণচুক্তিতে স্বচ্ছতা, জনপরামর্শ, কৃষকের ঋণচাপ কমানো, ন্যায্য করব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সরকারি ঋণ ও গ্যারান্টির জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
এসব প্রতিবাদ বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের অর্থায়ন নিয়ে একটি পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে : উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন বাড়লেই কি তার সুফল সবার কাছে পৌঁছায়? ঋণ নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব, স্বচ্ছতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন নিশ্চিত করা না গেলে উন্নয়নের সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
বার্ষিক সভার আলোচনাগুলো বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি ও সারের বাড়তি ব্যয় শুধু আমদানি বিলের বিষয় নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রা, মূল্যস্ফীতি, উৎপাদন ব্যয় ও সরকারি অর্থায়নের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ হলেও ঋণের শর্ত, অর্থ ব্যবহারের দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা বিবেচনায় রাখতে হবে।
তৃতীয়ত, বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করতে অবকাঠামো, দক্ষতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং ছোট ও মাঝারি ব্যবসার বিকাশে জোর দেওয়া প্রয়োজন।
আরএম/এমএমএইচ/এমএম/এমএন
