Published on
:
2 min read
জয় সাহা
কলকাতার পুজো এ বার দর্শনার্থীদের জন্য খোলা হয়েছিল গত বুধবার, চতুর্থী থেকে। মানুষের ঢল চোরবাগানের নামার আগেই ওই পুজো সংক্রান্ত একাধিক রিলের ভিউ কোনওটা ৫ লক্ষ কোনওটা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে যায় মাস খানেক আগে থাকতেই। এমন ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে সেই সব রিলগুলি তৈরি করা হয়েছিল যাতে মানুষের চোখ আটকে যায়। পুজোর এক মাস আগে যদি ৫–১০ লক্ষ মানুষ সেই সব রিল দেখেন, তাহলে তার এক –দু’শতাংশও পুজোর দিনগুলিতে ভিড় করলে সেই ভিড়ের আকার কী হবে, তা সামলানোর মতো পরিস্থিতি, পরিকাঠামো আদৌ পুজো কমিটির ছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠে আসছে।
গত তিন চার বছর ধরে রিল–নির্ভর এমন হাইপ তোলা পুজোর সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। প্রতি বছরই দেখা যাচ্ছে, শহরের দু–তিনটি পুজো এমন ভাবে নিজেদের হাইপ তুলছে যেখানে জনতার স্রোত নেমে আসছে। এ বছর চোরবাগানেও তাই হয়েছে বলে অভিমত নেট নাগরিকদের একাংশের। আর সেই ভিড়ের চাপ সামলাতে না পেরেই ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে ১৯ জন তরতাজা প্রাণকে। যদিও ২০১৫–তে ‘সবচেয়ে বড় দুর্গা’ হাইপ তুলে প্রায় একই রকম পরিস্থিতি হয়েছিল দেশপ্রিয় পার্কে। কিন্তু সে বার পঞ্চমীতেই সেই পুজো বন্ধ করে দেয় কলকাতা পুলিশ। চোরবাগানের ঘটনার পরে তাই প্রশ্ন উঠেছে, পুজোকে কেন্দ্র করে এমন অহেতুক হাইপ তোলা, পুরস্কার ঘোষণা, পুজোর যথেচ্ছ পাস বিলি করা এবং সর্বোপরি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে কোনও কোনও পুজোকে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে পৌঁছনোর প্রক্রিয়া কি বন্ধ হওয়া দরকার?
বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, পুজোর আগে থেকেই কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের রীতিমতো টাকা দিয়ে রিল বানাতে বুক করে বিভিন্ন পুজো কমিটিগুলি। উত্তর কলকাতার বৃন্দাবন মাতৃমন্দিরের কোঅর্ডিনেটর শিবেন্দু মিত্রর কথায়, ‘আজকাল তো মাস খানেক আগে থাকতে মণ্ডপের অন্তত একটা–দুটো জায়গা পুরোপুরি কমপ্লিট করে দিতে হয় যাতে কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা ভালো করে শুট করে তা নিয়ে রিল তৈরি করতে পারেন।’ কন্টেন্ট ক্রিয়েটররা কে কত টাকা পাবেন, তা অবশ্য ঠিক করা থাকে তাঁদের ফলোয়ার্স সংখ্যা, ভিউজ় ইত্যাদির উপরে। যাঁদের বাজেট থাকে না, তাঁরা আবার বিনা পয়সাতেই নতুন কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের ডেকে এনে শুট করতে দেন। তার বদলে মিষ্টির প্যাকেট বা পুজোর পাস দেওয়া হয় সাম্মানিক হিসেবে। কখনও কখনও টিশার্ট বা কোনও বিপণী গিফট কুপন।
পুজোয় পুরস্কারও এই হাইপের একটা অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখছেন পুলিশ কর্তাদের অনেকে। পুজো উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, আগে যেখানে হাতে গোনা কয়েকটি পুরস্কার ছিল, এখন তার সংখ্যা যে কত, তার ইয়ত্তা নেই। দক্ষিণ কলকাতার একটি বড় পুজোর উদ্যোক্তার কথায়, ‘কোনও একটি পুরস্কার কোনও পুজো পেয়েছে শুনলেই মানুষের ঢল নামছে।’ এরপর রয়েছে পুজোর পাস বিলি। সরকারি ভাবে ভিআইপি পাস বিলি করা বন্ধ হলেও এ বছরও দেখা গিয়েছে বিভিন্ন ই–কমার্স অ্যাপে পুজোর পাস খুব অল্প টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়েছে। সেখানে সেই পুজোগুলোকেই লিস্ট করা হয়েছে যা এমনিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। হাতিবাগানের একটি পুজোর উদ্যোক্তা বলেন, ‘এমনও অনেক জায়গা থেকে পাস কিনে লোকে এসেছেন, যাঁদের বিষয়ে আমরাই জানি না। আমাদের থেকে কোনও অনুমতি নিয়ে ওই পাস বিক্রি করা হয়নি।’
ফলে সার্বিক ভাবে এই প্রথাগুলো কি চোরবাগানের পরে বন্ধ হওয়া দরকার? পুজোর উদ্যোক্তাদের অনেকে এর সঙ্গে সহমত নন। হিন্দুস্তান পার্কের পুজোর সম্পাদিকা সুতপা দাসের কথায়, ‘রিলস বা পুরস্কার কিম্বা পুজোর পাস— কোনওটাই নতুন নয়। এ বছর তো আমরা পুজো শুরুও করেছি দেরিতে। হাইপটা করতে পারলাম কোথায়!’ ফোরাম ফর দুর্গোৎসবের তরফে শাশ্বত বসুর সংযোজন, ‘পুরস্কার বা রিলস–এর জন্য বিপদ ঘটে না। বিপদ ঘটার কারণগুলি আগে থেকে চিহ্নিত করা গেলেই সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
