বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসরকারি বিমান পরিবহন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় সরকার আধুনিকীকরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা বা সহযোগিতা স্মারক ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ের আমন্ত্রণে সরকারি এ সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ঢাকা ও টোকিওতে একই সময়ে সফরটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ও জাপান সরকার। ঢাকার সময় বেলা ১টা এবং টোকিওর সময় বিকাল ৪টায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সফরটি দুই দেশের বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, দক্ষতা বৃদ্ধি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে সফরে আলোচনা হবে।
অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব ও বিনিয়োগে গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া দেশগুলোর অন্যতম জাপান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে।
সময়ের সঙ্গে দুই দেশের সম্পর্ক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ পর্যায়ে রয়েছে। এ অংশীদারিত্বের আওতায় বাংলাদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (ইপিএ) স্বাক্ষরের ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সফরকালে এ চুক্তির কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ, বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হবে।
জাপান বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশটি মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ প্রকল্প নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা করে আসছে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ও সফরে গুরুত্ব পাবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক
সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাকাইচি সানায়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন তিনি।
সফরসূচির সম্ভাব্য অন্যান্য কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের (জেবিসিসিইসি) চেয়ারম্যান, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশনের গভর্নর, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সভাপতি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠক।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী।
এলএনজি টার্মিনাল ও টয়োটার কারখানা পরিদর্শন
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুৎসু সিটি, চিবা-তে একটি এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করবেন। এ ছাড়া ইউনিক্লো কোম্পানির সদর দপ্তর এবং নাগোয়ায় টয়োটার কারখানা পরিদর্শনের কর্মসূচিও প্রাথমিকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপানের সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য সফরসূচি প্রস্তুত করা হয়েছে।
সফরসঙ্গী হচ্ছেন সরকারের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধি ও কর্মকর্তারা
প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে থাকছেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, অর্থমন্ত্রী, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির চেয়ারম্যান, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, মিডিয়া টিম ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তি।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা জাপানে যাতায়াত করবেন।
রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়েও আলোচনা
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যার টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট নিরসনে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়েও দুই পক্ষের মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা ও উদ্যোগ গ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে আশা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও জাপানের বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে, সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে, বাংলাদেশে জাপানের নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে এবং চলমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তা বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রেও সফরটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
