তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করার ১১ দিনের মাথায় যুদ্ধ শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যে। তিনি দায়িত্ব নেন ১৭ ফেব্রুয়ারি আর ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায়। মার্চের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হয়, যা দেশের অর্থনীতিকে আরও চাপের মুখে ফেলে দেয়।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শাসনের আট মাস পর সরকারের অর্জিত সাফল্যের চিত্রটি মিশ্র। একদিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে, ব্যবসায়ীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এখনো উদ্বেগ রয়ে গেছে জনমনে। এ ছাড়াও, মব ভায়োলেন্স বা দলবদ্ধ সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।
বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই বেশ কিছু জটিল সমস্যা পেয়েছে, তবে তাদের গৃহীত বিভিন্ন সিদ্ধান্তও এখন খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কারের বিষয়টি এখনো আলোচনার টেবিলেই রয়ে গেছে। মানবাধিকার সংক্রান্ত কিছু আইন নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো বিএনপি আসলে কতটা পরিবর্তন চায়? তাদের সিদ্ধান্তগুলো কি মানুষের জীবন আগের চেয়ে উন্নত, নিরাপদ এবং স্বাধীন করতে পারছে?
অপরাধ এবং আইনশৃঙ্খলা
বিএনপি শাসনের আট মাস কেটে গেলেও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পুলিশের মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরে কম সংখ্যক হত্যা, ডাকাতি এবং অপহরণ মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে চুরির মামলা বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে মব কিলিং বা দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যা অব্যাহত রয়েছে।
এই আট মাসে পুলিশ ২ হাজার ১২২টি হত্যা মামলা রেকর্ড করেছে, যা আগের বছরের ২ হাজার ৩১৭টির চেয়ে কম। ডাকাতির মামলা ১ হাজার ১৫৯টি থেকে ১ হাজার ৭৭টিতে নেমে এসেছে, অপহরণের মামলাও সামান্য কমে ৬২৮ থেকে ৬১৮ হয়েছে। চুরির মামলা ১ হাজার ৭৯৬ থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩২টি হয়েছে, অর্থাৎ এ ধরনের মামলা ১৩ শতাংশ বেড়েছে।
নথিভুক্ত মোট মামলার সংখ্যা ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১০ হাজার ২৯৬ থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৬৩তে দাঁড়িয়েছে। মামলার সংখ্যা বৃদ্ধিতে বড় অবদান রেখেছে মাদক সংক্রান্ত মামলাগুলো; যা প্রায় ৯০ শতাংশ। তবে এই মামলার সংখ্যা বৃদ্ধি থেকে এটা নির্ধারণ করা যায় না যে, মাদক অপরাধ বেড়েছে নাকি পুলিশ মামলা নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে আগের চেয়ে সক্রিয় হয়েছে।
দলবদ্ধ সহিংসতা বা মব ভায়োলেন্স একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। মানবাধিকার সংগঠন ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’-এর হিসেব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্টে গণপিটুনিতে ১৩১ জন নিহত হয়েছেন।
১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এক ‘পীর’কে পিটিয়ে হত্যা করে একদল লোক। তার দরগা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও হামলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় তারা।
সেপ্টেম্বরে ঢাকাতেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। ২৫ সেপ্টেম্বর মিরপুরের মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্র ‘রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে’ ২০০ জনেরও বেশি মুখোশধারী হামলাকারী ভাঙচুর চালায় এবং লুটপাট করে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকলেও লুটপাট থামাতে ব্যর্থ হন।

এর ঠিক একদিন পর কয়েকশ হামলাকারী কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে ভাঙচুর চালায়। পুলিশ বলছে জমি নিয়ে বিরোধ থেকে ওই হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পুলিশের ওপরও হামলা হয়েছে। গত জুনে সাভারে উত্তেজিত জনতা দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করে এক আসামিকে ছিনিয়ে নেয়। জুলাইয়ে কুতুবদিয়ায় এক আসামিকে হেফাজতে নেওয়ার সময় তিন পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা চালানো হয়। ৫ সেপ্টেম্বর সাভারে স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাব-ইন্সপেক্টর আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আর সর্বশেষ ১০ অক্টোবর খুলনায় ছিনতাইকারীদের হামলায় এক পুলিশ পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।
সরকারের দাবি, পুলিশ বাহিনী ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। গত ২৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন যে সরকারের প্রথম ছয় মাসে দায়ের হওয়া প্রায় সব ফৌজদারি মামলার আসামিদের যুক্তিসঙ্গত সময়ের মধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান প্রশাসন উত্তরাধিকার সূত্রেই এক নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পেয়েছিল এবং পুলিশের মনোবল চাঙ্গা করতে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
চাঁদাবাজিও একটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে। গণমাধ্যমে উঠে আসা আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের ৪৯টি থানায় মোট ৭২৩টি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার মধ্যে বিএনপি সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের কয়েক সপ্তাহও অন্তর্ভুক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল ওয়েলকাম অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. মো. তৌহিদুল হক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতাকে মিশ্র হিসেবে অভিহিত করেছেন। দ্য ডিপ্লোম্যাটকে তিনি বলেন, ‘গত দেড় বছরের তুলনায় পরিস্থিতির কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে আমরা বলতে পারি না। একই সঙ্গে আমরা বলতে পারি না যে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে খারাপ হয়েছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ার পেছনে আংশিকভাবে আইনের অসম প্রয়োগ এবং নিজ দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করেন তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দল যদি নিজের দলের ভেতরের অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান না নেয়, তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।’
মাদকবিরোধী অভিযানের প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই বিশ্লেষক। তিনি বলেন, ‘মাদকসেবী, খুচরা মাদক বিক্রেতা এবং বাহকেরা গ্রেপ্তার হলেও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রাজনৈতিক সুরক্ষার সুবিধা পেয়ে যাচ্ছেন। তার মতে, মাদক ব্যবসার মূল পৃষ্ঠপোষক এবং ক্ষমতাধরেরা আইনের আওতার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
এই রাজনৈতিক সুরক্ষাবলয় ভাঙতে হলে পুলিশ বাহিনীতে আরও গভীর পরিবর্তনের প্রয়োজন বলে মনে করেন তৌহিদুল হক। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পুলিশকে এখনো রাজনীতিমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। এর অভ্যন্তরীণ কাঠামোও অনেকাংশে অপরিবর্তিত থেকে গেছে।
অর্থনীতি
বিএনপি সরকারের শুরুর মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সেই অগ্রগতির চিত্র সব জায়গায় সমান ছিল না। মার্চে ভোক্তা মূল্যসূচক এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ৮.৭১ শতাংশ বেশি ছিল। মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.৪২ শতাংশে পৌঁছায়, তবে সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়ায় ৮.৩৪ শতাংশে; যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের ৮.৩৬ শতাংশের তুলনায় নামমাত্র কম। তবে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে থাকায় তা মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামলাতে থাকা সাধারণ পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের আয়ও কোনো স্বস্তি দিতে পারেনি। আগস্টে মজুরি সূচক বৃদ্ধি পায় মাত্র ৮.০৫ শতাংশ, যা মূল্যস্ফীতির হারের তুলনায় কম। কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক ও পরিবহন শ্রমিকদের মতো নিম্ন আয়ের নির্বাচিত পেশাগুলোকে নিয়ে এই সূচক তৈরি করা হয়। এসব শ্রমিকের জন্য এই হিসাবের অর্থ দাঁড়ায়, পণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমলেও তাদের মজুরিতে এক বছর আগের চেয়ে কম পণ্য কেনা যাচ্ছিল।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কিছু আশাব্যঞ্জক খবর অবশ্য এসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৮.৯৪ বিলিয়ন ডলারে; যা ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ১৩.১ শতাংশ বেশি। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে সহায়তা করার পাশাপাশি প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোকে বড় ধরনের স্বস্তি দিয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, বিএনপি দায়িত্ব নেওয়ার আগে থেকেই রেমিট্যান্স প্রবাহের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা শুরু হয়েছিল।
তবে ব্যবসায়িক অঙ্গনে এখনো সতর্কতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যাংক নির্বাহীরা বাজারে দুর্বল চাহিদা, চড়া সুদের ঋণ এবং জ্বালানি সংকটের কথা জানান। ব্যাংক এশিয়ার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোহেল আর কে হোসেন বলেন, কারখানাগুলোতে এখনো সক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না, যার ফলে ব্যবসায়ীদের নতুন করে ব্যবসার সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করার জোরালো কারণ নেই। একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় ফেরার পরও ব্যাংক ঋণের ক্ষেত্রে শক্তিশালী কোনো পুনরুদ্ধারের চিত্র এখনো দেখা যায়নি।
সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই এই সংকটের সিংহভাগ পেয়েছে। ঋণ বিতরণের সক্ষমতাকে খেলাপী ঋণ সংকুচিত করে রাখার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বজায় রাখতে হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতি বিবৃতিতে স্বীকার করা হয় যে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যার কারণে তৈরি হওয়া মূল্যস্ফীতি কেবল সুদের হার বাড়িয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সাথে শিল্প, কৃষি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৬০ হাজার কোটি (৬০০ বিলিয়ন) টাকার একটি অর্থায়ন প্যাকেজ ঘোষণাও করা হয়।
সেপ্টেম্বরে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া ছিল আরও একটি বড় ধাক্কা। মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানায়, রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের লোকসান কমাতেই এই মূল্যবৃদ্ধি অপরিহার্য ছিল। তবে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ পরিবারগুলোর জন্য এই সিদ্ধান্ত উৎপাদন ও পরিবহন খরচ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। এর ফলে সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে আসার ধারা বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
সরকার তাদের নিজ ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থায়নেও হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশি একটি পত্রিকার একটি প্রতিবেদনের সূত্রে এতে বলা হয়, ৯ দশমিক ৩৮ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট মূলত প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল। অথচ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরগতি হওয়ায় রাজস্ব আদায়ে ভাটা পড়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সূত্রের বরাত দিয়ে ওই পত্রিকার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট মেয়াদে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৫১ হাজার ৮৯০ কোটি (৫১৮.৯ বিলিয়ন) টাকা; যা আগের বছরের একই সময়ের ৫৪ হাজার ৭০০ কোটি (৫৪৭.৭ বিলিয়ন) টাকার চেয়ে কম এবং দুই মাসের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২৯ হাজার ১৬০ কোটি (২৯১.৬ বিলিয়ন) টাকা কম। অন্যদিকে জ্বালানি আমদানির বাড়তি খরচ, ভর্তুকি, সরকারি খাতের বেতন বৃদ্ধি এবং মেগা প্রকল্পগুলোর প্রতিশ্রুতি সরকারের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শিল্প অর্থনীতিবিদ, নীতি বিশ্লেষক এবং নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের সভাপতি ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থবির প্রবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের মন্থরতা বা স্থবিরতারই ইঙ্গিত দেয়। তার মতে, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে সরকার খুব একটা আগ্রহ দেখায়নি। সরকারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ টেনে দ্য ডিপ্লোম্যাটকে তিনি বলেন, সমস্যা হলো, এই বিশাল কর্মকাণ্ডের খরচ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় রাজস্ব সহায়তার সক্ষমতা সরকারের নেই।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো এবং বড় প্রকল্পগুলোর সময় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি মনে করেন, এগুলো পিছিয়ে দেওয়া যেত।
এর একটি উদাহরণ হলো বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর অস্বাভাবিকভাবে বড় করার পরিকল্পনা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২৫টি বোয়িং এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ১০টি এয়ারবাস উড়োজাহাজ নিয়ে নতুন ৩৫টি এয়ারক্রাফটের যে ক্রয়াদেশ দেওয়া হচ্ছে, তা বর্তমানে বিমানের থাকা মাত্র ১৯টি উড়োজাহাজের বহরের তুলনায় বিশাল। ড. মোয়াজ্জেম সতর্ক করে বলেন, বিমানের ব্যবস্থাপনা ও সেবার মান উন্নত না করে এই ধরনের বিশাল কেনাকাটা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে এমন এক দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে আটকে ফেলতে পারে, যা পরিশোধ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
তিনি আরও যোগ করেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ পরিবারগুলো যখন এমনিতেই চরম টানাটানির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন সরকারের এই নতুন ব্যয় পরিস্থিতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ এবং অনিশ্চিত ব্যবসাবহির্ভূত পরিবেশ ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকেও নিরুৎসাহিত করছে।
বিএনপি যে উত্তরাধিকার সূত্রেই এই সংকটগুলো পেয়েছে তা স্বীকার করার পাশাপাশি গোলাম মোয়াজ্জেম জোর দিয়ে বলেন, এটাকে অজুহাত বানিয়ে চিরদিন পার পাওয়া সম্ভব নয়। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই সরকার তো অর্থনৈতিক পতন ঠেকানোর এবং পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড় করানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান চীন, মালয়েশিয়া এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) সফর করলেও এখনও ভারত সফর করেননি। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, ভারত সফরে এই বিলম্ব তারই প্রতিফলন। ভারত থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানো এবং তাকে ফেরত পেতে ঢাকার জোর দাবি দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক বা সফরের আয়োজনকে বারবার জটিল করে তুলছে।
গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল এবং এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমার কথা তিনি জানাননি। তার এই বক্তব্যে দুই দেশের মধ্যকার অন্যতম প্রধান বিরোধটি দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে কোনো স্পষ্ট আশ্বাস মেলেনি।
ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে যোগ দিতেও অস্বীকৃতি জানান তারেক রহমান। তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বদলে বিমসটেক চেয়ারম্যান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল উল্লেখ করে ঢাকা এ বিষয়ে আপত্তি জানায়। জবাবে ভারত দাবি করে, দ্বিপক্ষীয় সফরসহ পৃথক দুটি আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়েছিল। তবে প্রোটোকল ঘিরে দেখা দেওয়া এই দূরত্বের নেপথ্যে মূলত কিছু বাস্তবভিত্তিক উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ চায় ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণ, বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ প্রত্যাহার এবং পানি বণ্টন ইস্যুতে দৃশ্যমান অগ্রগতি। বিশেষ করে আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলায় এই আলোচনাগুলো এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে চীন বাংলাদেশকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানায়। গত জুনে তারেক রহমানের চীন সফরকালে বেইজিং মোংলা বন্দর, চট্টগ্রামে ‘চায়নিজ অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চল’ এবং তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে সহায়তার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। পাশাপাশি উভয় দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সংলাপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয় দুই সরকার, যা মূলত বিনিয়োগের পাশাপাশি নিরাপত্তা সমন্বয়ে ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেয়।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পটি এবার বিশেষ গুরুত্ব পায়। যৌথ ঘোষণায় চীনের পক্ষ থেকে কারিগরি সহায়তা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই কাজের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও চূড়ান্ত অর্থায়ন চুক্তির কোনো ঘোষণা আসেনি। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভেতরে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা সম্পন্ন হলেও পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে থাকা আলাদা বিরোধের সুরাহা হবে না। বেইজিংয়ের সমর্থন এই দীর্ঘায়িত প্রকল্পটি এগিয়ে নিতে ঢাকাকে নতুন পথ দেখালেও ভারতের সাথে আলোচনা ও সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা রয়েই গেছে।
কূটনীতির পাশাপাশি ক্রয় চুক্তির মাধ্যমেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে সরকার। জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফরকালে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আরও ১১টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার দেয়, যার মাধ্যমে চলতি বছরেই বোয়িংয়ের মোট অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৫টিতে। বাংলাদেশ বিমান এই ক্রয়কে তাদের বহর নবায়নের অংশ হিসেবে বর্ণনা করলেও এর একটি বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তা হলো— মার্কিন আমদানি বৃদ্ধি করে বাণিজ্য উত্তেজনা কমানো এবং বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকে শুল্কের বাড়তি চাপ থেকে রক্ষা করা।
তবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের মূল শুল্ক চুক্তিটি এক প্রকার বাধ্য হয়েই গ্রহণ করতে হয়েছে বিএনপি সরকারকে। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ওই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্র থেকে টেক্সটাইল কাঁচামাল আমদানির শর্তে নির্দিষ্ট পরিমাণের পোশাকের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধার বিধান রাখা হয়। একই সাথে এই চুক্তি বাংলাদেশকে মার্কিন কৃষিপণ্য ও জ্বালানি ক্রয়ের বড় ধরনের প্রতিশ্রুতির সাথেও বেঁধে ফেলে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রয়ে গেছে রোহিঙ্গা সংকট। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তারেক রহমান রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, মিয়ানমারে তাদের অধিকার রক্ষা এবং টেকসই মানবিক অর্থায়নের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পরিকল্পনার আহ্বান জানান। এর পাশাপাশি মিয়ানমারে অব্যাহত সহিংসতার মুখে নতুন করে বাংলাদেশে মানুষ পালিয়ে আসার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকারের অভ্যন্তরীণ এজেন্ডা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সমর্থনও চান তারেক রহমান। সাধারণ অধিবেশনে তিনি ‘পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন’ কৌশল তুলে ধরেন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প উৎপাদনে সহায়তার জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানান। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার এই সময়ে বাজারে সুবিধা অব্যাহত রাখা এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ওপর জোর দেন তিনি। তার ভাষণজুড়ে জলবায়ু অর্থায়ন ও রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে পররাষ্ট্রনীতির প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে দ্বিপক্ষীয় সফরে জাপান ও সৌদি আরব সফরের সূচি রয়েছে তারেক রহমানের। এ ছাড়া জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলনে (কপ৩১) যোগ দিতে তার তুরস্ক ভ্রমণের কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিবেশ ও বাকস্বাধীনতা
ক্ষমতায় আসার প্রথম কয়েক মাসেই বিএনপি ও তাদের একসময়ের সহযোগীদের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা ও প্রকাশ্যে বাগযুদ্ধ দেখা গেছে। বর্তমানে জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকা জামায়াতে ইসলামী সরকারের সাফল্যের দাবিগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। গত আগস্টে দলটির নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি সংকট ও জননিরাপত্তা রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার কঠোর সমালোচনা করে। অন্যদিকে এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, সরকার সংসদীয় কমিটিগুলোর সভাপতির পদ বিরোধী দলকে দিতে চাচ্ছে না, যা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো ও নজরদারির ক্ষমতাকে সীমিত করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক এসব দ্বন্দ্ব স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে নির্বাচনের পরও দেশে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহাল রয়েছে।
তবে এই প্রতিযোগিতা কেবল সীমিত পরিসরেই বিদ্যমান ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিচার চলাকালীন ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা নিষেধাজ্ঞার কারণে দলটির সার্বিক কার্যক্রম এখনো স্থগিত রয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা কেবল মিছিল-সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা প্রকাশনা ও ডিজিটাল প্রচারণার ওপরও বলবৎ করা হয়। বিএনপি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রেই এই নিষেধাজ্ঞা পায়, তবে তারা তা বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে বাংলাদেশের নাগরিকদের একটি বড় অংশ তাদের পছন্দের রাজনৈতিক দলের ব্যানারে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিতই রয়ে গেছে।
অন্যদিকে সাংবাদিকেরা এখনও নানা ধরনের হামলা, হুমকি ও আইনি হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গত মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সাংবাদিকদের ওপর হয়রানির ২৪২টি ঘটনা রেকর্ড করেছে। এই তথ্যের মধ্যে নিপীড়নের বিভিন্ন ধরন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং সব ঘটনার জন্য সরাসরি সরকারই দায়ী তা নয়। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও সংবাদকর্মীদের কাজের ঝুঁকি কতটা রয়ে গেছে, এই পরিসংখ্যান সে চিত্রই মূলত তুলে ধরে।
আটক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের প্রতি আচরণ নিয়েও নানা মহলে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত আগস্টে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) জানায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে যুক্ত শত শত ব্যক্তি কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই কারাবন্দী রয়েছেন। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তত ১০ জন আওয়ামী লীগ নেতার কারাগারে মৃত্যু হয়েছে, যাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধেই কোনো অভিযোগ গঠন করা হয়নি। বন্দী পরিবারের সদস্য ও আইনজীবীদের অভিযোগ, কারাবন্দীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে না এবং জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলা দিয়ে তাদের মুক্তি আটকে দেওয়া হচ্ছে। সাবেক কর্মকর্তাদের কারও কারও বিরুদ্ধে মারাত্মক অপরাধের অভিযোগ থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও এইচআরডব্লিউ প্রতিটি আটকের স্বতন্ত্র পর্যালোচনা এবং হেফাজতে সব মৃত্যুর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
প্রস্তাবিত সাইবার আইনের পরিবর্তন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, আইনের খসড়া সংশোধনী বাস্তবায়িত হলে কর্তৃপক্ষ যাকে ‘গুজব’ বা ‘অপতথ্য’ হিসেবে বিবেচনা করবে, তা ছড়ানোর অভিযোগে সাংবাদিকদের ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। সংগঠনটি আরও সতর্ক করে যে, আদালত বা প্রশাসনের তথ্যের সাথে অমিল বা চ্যালেঞ্জ তৈরি করে এমন প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে আদালত কোনো সংবাদমাধ্যমের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলও করতে পারে।
সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংশোধনীগুলো সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে করা হয়নি। তবে সম্পাদক ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সংগঠনের আপত্তির মুখে গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সুরক্ষা নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় সুপারিশের জন্য দুটি কমিটি গঠনে সম্মত হয় সরকার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ এম শাহান এসব উদ্বেগকে একটি বড় সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সাইবার নিরাপত্তা আইনের পরিবর্তন এবং মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ সংস্থার দুর্বলতা সমালোচকদের দমনে সরকারের হাতকেই আরও শক্ত করতে পারে। দ্য ডিপ্লোম্যাটকে তিনি বলেন, আমরা এমন কিছু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সূচনা দেখতে পাচ্ছি, যা মূলত বিরোধী দল ও ভিন্নমতকে দমন বা দুর্বল করতে ব্যবহার হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মনে করেন, কোনো চূড়ান্ত মূল্যায়নের জন্য আট মাস খুব কম সময়; তবে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের তুলনায় তিনি কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখছেন। দ্য ডিপ্লোম্যাটকে তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে সরকারের তরফ থেকে লক্ষণীয় উদ্যোগ দেখা গেছে। তবে পরিস্থিতি সামলাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া সরকারের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই।’
নূর খান লিটন কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, পুলিশি হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যু এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনাগুলো চিহ্নিত করেন। এ ছাড়া মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ঘটনাগুলোকে তিনি আরেকটি বড় উদ্বেগজনক বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আমরা দেখছি যে মানুষকে নানা ধরনের ট্যাগ দিয়ে মব ভায়োলেন্সের শিকার করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা এখনো সংকটাপন্ন উল্লেখ করে নূর খান লিটন গত ২৬ সেপ্টেম্বর ঢাকায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। জাসদের অভিযোগ, দলের একটি পূর্বনির্ধারিত সভা চলাকালে বিএনপি ও যুবদলের নেতা-কর্মীরা উপস্থিত লোকজনের ওপর হামলা চালায় এবং পরবর্তী সময়ে পুলিশ বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক করে। তবে পুলিশের দাবি, সেখানে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা একত্র হয়েছেন এমন তথ্যের ভিত্তিতেই তারা অভিযান চালিয়েছিল; কিন্তু জাসদ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে। অন্যদিকে যুবদলের এক নেতা কাউকে মারধরের কথা অস্বীকার করেন। এই ঘটনাকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও আইনবিরোধী উল্লেখ করে লিটন বলেন, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।
নূর খান লিটন সাম্প্রতিক আইনি পরিবর্তনগুলো নিয়েও প্রশ্ন তোলেন, যা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের সুরক্ষাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম সংক্রান্ত পূর্ববর্তী আইন বাতিল করে যেসব নতুন আইন আনা হয়েছে, সেগুলোকে আগের চেয়ে দুর্বল বলে সমালোচনা করেন তিনি। তার মূল্যায়নে, এসব পরিবর্তন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কমিশনের পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলবে।
গণমাধ্যমের ওপর অব্যাহত হামলার প্রেক্ষাপটে প্রস্তাবিত সাইবার আইন বাক স্বাধীনতাকে আরও সংকুচিত করবে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি মন্তব্য করেন, আমরা অন্তত স্পষ্ট করে বলতে পারছি না যে এই সরকারের অধীনে সাংবাদিকেরা নিরাপদ আছেন।
সংস্কারের প্রতিশ্রুতি
গত ফেব্রুয়ারির গণভোটে ভোটাররা যেসব সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদও তা বাস্তবায়নে সরকার বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা বজায় রেখেছিল। এই প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সময়সীমা নির্ধারণ, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে শক্তিশালী সুরক্ষাকবচ তৈরি করা।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, ডিসেম্বরের মধ্যে আলোচনা শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সংসদীয় কমিটি। তবে এর ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি এবং সংশোধনী বিল কবে পেশ করা হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি তিনি।
নির্বাচনের পরপরই প্রস্তাবিত সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে বিতর্ক ও দ্বিমত শুরু হয়। ‘জুলাই চার্টার’ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একটি পৃথক ‘সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রথম বৈঠকের পর থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাংবিধানিক সংস্কার সম্পন্ন করবেন। তবে বিএনপির সংসদ সদস্যরা কাউন্সিলের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। তাদের যুক্তি ছিল, বিদ্যমান সংবিধান অনুসরণ করেই যাবতীয় পরিবর্তন আনা উচিত। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা উভয় শপথ গ্রহণ করেন এবং জোর দিয়ে বলেন যে, গণভোটের রায় অনুযায়ী কাউন্সিলেই এই প্রক্রিয়া পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক। ফলে সংস্কারের পুরো সময়সূচিটি এমন একটি প্রক্রিয়ার সাথে আটকে যায়, যা শুরু করার বিষয়েই রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি।
এর পরিবর্তে জুলাই মাসে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করে সরকার, যেখানে বিরোধী দলের মনোনীত প্রতিনিধিদের জন্য পাঁচটি পদ রাখা হয়। তবে বিরোধী দলগুলো এই কমিটিতে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। সংস্কারের মূল বিষয়বস্তু কারা নির্ধারণ করবে সেটি নিয়েও দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। বিএনপির দাবি ছিল, জুলাই চার্টারে স্বাক্ষর করার সময় তারা যেসব বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিল, সেগুলোকে সম্মান জানাতে হবে; অন্যদিকে বিরোধীদের যুক্তি ছিল, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ ইতিমধ্যেই এটি বাস্তবায়নের স্পষ্ট অনুমোদন দিয়েছে।
গত ২৯ সেপ্টেম্বর সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বিরোধী দলগুলো আলোচনায় যোগ দিলে এসব আপত্তির ক্ষেত্রে সমঝোতার সুযোগ রয়েছে। একই ব্যক্তি যাতে টানা দুই মেয়াদের (১০ বছর) বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকতে পারেন সেই প্রস্তাবের প্রতি তিনি পুনঃসমর্থন জানান। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে ১৬৮ দিন পদ খালি থাকার পর গত আগস্টে নতুন নিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নেতৃত্ব পুনর্বহাল করা হয়। এর ফলে দীর্ঘদিন আটকে থাকা অভিযোগ ও তদন্তের কাজ ফের শুরু করার পথ সুগম হয়। তবে এই নিয়োগগুলো হয়েছে পুরোনো আইন অনুসরণ করেই। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজের ‘রিফর্ম ওয়াচ’ উল্লেখ করে যে, চার্টারে যেমন একটি স্বাধীন নিয়োগ ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছিল, এই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করা হয়নি। কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থবিরতা দূর করে তার কাজ চালু করা আর সেখানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
সেপ্টেম্বর মাসে পাস হওয়া আইনগুলো সংস্কারের দিকনির্দেশনা নিয়ে আরও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন; এবং ‘গুম সংক্রান্ত’ আইন পাস হয়। গুমবিরোধী আইনে অপরাধীদের বিচার, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও ক্ষতিপূরণের বিধান রাখা হয়েছে। তবে এতে আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ সম্পর্কিত তদন্তের দায়িত্ব স্বাধীন কোনো কমিশনের বদলে সরকারের মনোনীত অন্য কোনো বাহিনীর ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) যুক্তি দেয় যে, এই পদক্ষেপটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রবর্তিত সুরক্ষাকবচগুলোকে উল্টে দিয়েছে। সংস্থাটি সরাসরি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষেত্রে কমিশনের ওপর আরোপিত বাধ্যবাধকতা এবং কমিশন সদস্য নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারের প্রভাব পুনর্বহাল করারও তীব্র সমালোচনা করেছে।
র্যাব পুনর্গঠন নিয়েও একই ধরনের সমালোচনা রয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের নতুন আইনের মাধ্যমে র্যাবকে বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ গঠন করা হয় এবং আগের বাহিনীর সর্বস্তরের সদস্য, ক্ষমতা ও সম্পত্তি নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত বিধান রাখা হয়নি। গুম ও হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর জন্য মূল প্রশ্ন হিসেবে রয়ে গেছে তদন্তকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর নিজস্ব সহযোগিতার ওপর নির্ভর না করে স্বাধীনভাবে তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত পরিচালনা করতে পারবেন কি না।
বিএনপি সরকারের আট মাস পেরিয়ে গেলেও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো এখনো আলোচনার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। অন্যদিকে ইতোমধ্যে যেসব আইন পাস হয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে মূলত সরকারের যে ক্ষমতা কমানোর কথা ছিল, তা বহাল রাখার চেষ্টা হচ্ছে বলেই অভিযোগ তুলে সেগুলোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আসিফ এম শাহান বলেন, গণতন্ত্র পুনর্গঠনের পথে নির্বাচন আয়োজন ছিল কেবল প্রথম ধাপ। সরকারের ক্ষমতাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতাও জরুরি। দ্য ডিপ্লোম্যাটকে তিনি বলেন, সরকার কীভাবে প্রকৃতপক্ষে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়, সে বিষয়ে আমি স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা দেখতে পাচ্ছি না। মাত্র আট মাসের মাথায় চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারির গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনা করেই বেছে বেছে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন শাহান। উদাহরণ হিসেবে তিনি সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক প্রশাসনিক সচিবালয় গঠনের প্রস্তাবের কথা উল্লেখ করেন, যা বিচার বিভাগকে সরকারের ওপর নির্ভরতা থেকে মুক্ত করতে সহায়ক হতো। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা না করলেও বিষয়টি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
দ্য ডিপ্লোম্যাট থেকে অনুবাদ।
আইজে/এনএফ
