Published on
:
3 min read
গত ২৯ মার্চ। এমন একটা খবর আসবে কল্পনাও করেনি কেউ। সন্ধে নামতেই আসে দুঃসংবাদ। প্রয়াত রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়। সমুদ্রের ধারে শুটিংয়ে গিয়ে মৃত্যু হয় অভিনেতার। যে ঘটনার পরে হয়েছে বহু প্রতিবাদ। দাবি উঠেছে তদন্তের। মৃত্যুর পরে প্রথম জন্মদিন রাহুলের। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই অবশ্য তাঁকে মায়ের দেওয়া নাম ‘বাবিন’ বলে ডাকতেন। প্রিয় বাবিনদার স্মৃতিচারণায় তারকা-দম্পতি সুদীপ ও অনিন্দিতা।
সুদীপ সরকার
বাবিনদা এমন মানুষ ছিলেন, যিনি জুনিয়রদের প্রত্যেকের কাছেই আপন দাদার থেকে কোনও অংশে কিছু কম ছিলেন না। মন দিয়ে ভালোবেসেছেন সবাইকে। শুধুমাত্র আমি বলে না, প্রত্যেককে। এমন সিনিয়র পাওয়া খুবই ভাগ্যের ব্যাপার। আর কোনও দিন এরকম সিনিয়র পাব বলে আমার মনে হয় না। আসলে যখন থেকে আমার কেরিয়ার শুরু, সেই সময় থেকেই বাবিনদার সংস্পর্শে আসা। প্রতিটা বিষয়ে ছিল যাঁর সত্যিকারের পড়াশোনা।
রাজনীতি হোক বা খেলা, সিনেমা থেকে সাহিত্য, সমস্ত বিষয়ে আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। সেগুলো স্বভাবতই আমাদের প্রত্যেককে আকৃষ্ট করেছে। এমন একজন মানুষ যিনি প্রকৃত জ্ঞানী, গুণী ও প্রচণ্ড ভালো একজন অভিনেতা। আমি তো বলব সিনিয়র হিসেবেও ভালো। কোনও সময়ে এরকম মনে হয়নি যে আমরা একা আছি, বাড়ি ছেড়ে আছি। আমি তো কলকাতার ছেলেই নই। কোনও সময়ে কোনও অসুবিধা হলে, ডিপ্রেশন হলে বকা দিত, বাড়িতে ডেকে নিয়ে যেত। রাহুলদার বাড়িতে থাকা, খাওয়াদাওয়া করা, সে সব কত যে সুন্দর মুহূর্ত।
পুজোর সময়ে বাবা-মা ছাড়াও যাঁর তরফে উপহার আসবেই, তিনি বাবিনদা। দামি জুতো, জামা, জ্যাকেট নির্দ্বিধায় দিয়ে দিত। মানে এটা শুধু টাকা থাকলে হয় না, একটা বড় মন থাকতে হয়। বেড়াতে যাওয়ার টাকা না থাকলে যে সবার আগে এগিয়ে এসে বলত, ‘তুই চল তোর ভালোলাগবে। তোর তো মন খারাপ।’ সেটা বাবিনদা। এক দাদা হারানোর যন্ত্রণা কোনও কিছু দিয়ে সামাল দেওয়ার নয়। আগের বছর তো আমি বাবাকেও হারিয়েছি। তার পরে বাবিনদাও চলে গিয়েছে। তাই সময়টা সত্যিই খুব কঠিন আমার জন্য। একসঙ্গে অনেক কাজ করব, অনেক ছবি করব স্বপ্ন ছিল। মাঝেমধ্যে খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগে।
জন্মদিনে প্রতি বছর দেখা করতাম, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা হতো। আমার জীবনের বেড়ানোর সঙ্গী ছিল বাবিনদা। বড় বড় যা কিছু ঘটেছে, মানে মেয়ে হওয়ার প্রথম খবর বাবিনদা জেনেছে। অনিন্দিতার সঙ্গে প্রেম থেকে বিয়ে, সব কিছুর প্রথম সাক্ষী বাবিনদা। যে দিন জানতে পেরেছি আমার আর অনিন্দিতার সন্তান আসতে চলেছে, সে দিন সকালবেলা আমরা গিয়ে প্রথম বাবিনদাকেই জানিয়েছিলাম। কারণ, বাবিনদা যা ভালোবাসত সেটা কল্পনাতীত। বাবিনদা বিভিন্ন সময়ে সমস্যায় পড়েছেন ব্যক্তিগত জীবনে। কিন্তু কোনও দিন সত্যের পাশ ছাড়েননি। আমরা হয়তো কেউই সেরকম নই এবং কেউই কোনও দিন হতেও পারব না। কিন্তু চাইব আমার মেয়ে যেন বাবিনদার মতো হতে পারে।
অনিন্দিতা রায়চৌধুরী
রাহুলদা আর আমার ‘দেশের মাটি’-তে কাজের সূত্রে আলাপ। তার আগে তো রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবশ্যই চিনতাম। সুদীপের সঙ্গে বিয়ে হওয়ার পরে রাহুলদা আমার কাছে ওই ‘দাদা’টা হয়ে উঠেছে। ভীষণ আন্তরিক একটা মানুষ। মানে, পৃথিবীর যে প্রান্তে যত দিন পরই দেখা হোক না কেন, ওকে দেখলেই মনে হবে যে এই তো রাহুলদা আছে। শেষ যে দিন বাবিনদার বাড়ি গিয়েছিলাম, সেই দিনটা আমার বিশেষ করে খুব মনে পড়ে। কারণ, সে দিন আমাদের যাওয়ার কথাই ছিল না। নিনিকে নিয়ে গিয়েছিলাম। বাবিনদার বাড়িতে নিনিকে নিয়ে কখনও যাওয়াই হয়নি। ভাবছি ঠিক আছে, বড় কোনও প্ল্যান হওয়ার আগে আমরা যাই একটু দেখা করে আসি, ঘুরে আসি। ওই দিনটা আমার কাছে খুবই স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সে দিন যদি ওকে না নিয়ে যেতাম, তা হলে একটু বড় অবস্থার নিনিকে বাবিনদার সঙ্গে আলাপ করানো হতো না। বার বার খালি মনে হয়, রাহুলদার থাকাটা আসলে খুব দরকার ছিল, অন্তত এই সময় দাঁড়িয়ে।