আজ ২৪ অক্টোবর, ৮১তম জাতিসংঘ দিবস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়। ৫১টি সদস্যরাষ্ট্র নিয়ে যাত্রা শুরু করা সংস্থাটির সদস্যসংখ্যা এখন ১৯৩। তবে আট দশকের বেশি সময় পেরিয়ে জাতিসংঘ এখন যুদ্ধ, বাজেট সংকট, বড় শক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং সংস্কারের চাপের মুখে। এমন এক সময়ে সংস্থাটির সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ২ জুন সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচনে তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে পরাজিত করেন। গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি এক বছরের জন্য এ দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।
সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে বাংলাদেশের এই অবস্থানকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুদ্ধ, জ্বালানি ও জলবায়ু সংকট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চ্যালেঞ্জ, অর্থায়নের ঘাটতি এবং জাতিসংঘের কাঠামোগত সংস্কারের মতো জটিল বিষয়ে বাংলাদেশ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, তা এখন বড় প্রশ্ন।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবদান প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতিসংঘ এখন সংকটময় সময় পার করছে। এমন সময়ে সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ রয়েছে। এই সংকট থেকে সফল উত্তরণ সম্ভব হলে বাংলাদেশ তার কৃতিত্বের দাবিদার হবে। দেশ আয়তনে ছোট হলেও জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবদান উল্লেখযোগ্য।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচনের প্রচারে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সংকট নিরসনে কাজ করার অঙ্গীকার করেছিল। যুদ্ধসহ বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংকট মোকাবিলা এবং সেগুলোর সমাধানে বাংলাদেশের ভূমিকার বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছিল। এ বছর জাতিসংঘের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থার সর্বস্তরে সংস্কার, চলমান যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্য সংকট, জ্বালানি ও জলবায়ু সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের সিদ্ধান্তও এখনো আটকে রয়েছে। তবে এ বিষয়ে শিগগির সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা করছে সরকার।
দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান বলেছিলেন, বিশ্বের সব সমস্যার দ্রুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় কোনো ঘাটতি থাকবে না। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সুযোগ কাজে লাগাতে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা এবং সংলাপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, সব সমস্যার দ্রুত সমাধান হয়ে যাবে, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিছু সমস্যার সমাধান হতে সময় লাগবে, কিছু বিষয় অমীমাংসিতও থেকে যেতে পারে। তবে যেখানে সহাবস্থান ও সমঝোতার সুযোগ রয়েছে, সেখানে তা অর্জনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সদস্যরাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে কাজ করলে তাঁর দায়িত্ব পালন সহজ হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘের সামনে বহুমুখী সংকট: জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন। আঞ্চলিক রীতি অনুযায়ী, এবার লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল থেকে কাউকে নির্বাচনের প্রত্যাশা রয়েছে।
প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, মহাসচিব পদে সাতজন আনুষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন। তাঁরা হলেন কোস্টারিকার সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যান, জাতিসংঘে গায়ানার স্থায়ী প্রতিনিধি ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বিরকেট, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, ইকুয়েডরের সাবেক রাষ্ট্রদূত ইভন আ-বাকি, অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা গারসেস, জাতিসংঘের সাবেক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও শিশু এবং সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি উগান্ডার ওলার ওতুনু এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লানা নুসেইবেহ। সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল প্রথমে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও পরে নাম প্রত্যাহার করে নেন।
উত্তরসূরি নির্বাচনেও নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সমর্থন নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন- এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের প্রত্যেকেরই মহাসচিব নির্বাচনে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। ফলে নতুন মহাসচিব নির্বাচনেও বড় শক্তিগুলোর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে জাতিসংঘ তীব্র বাজেট সংকটে রয়েছে। সংস্থাটির আন্তর্জাতিক কর্তৃত্ব নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ঐতিহ্যগতভাবে জাতিসংঘের অন্যতম বৃহৎ অর্থদাতা যুক্তরাষ্ট্র সংস্থাটির ব্যয় ব্যাপকভাবে কমানোর চাপ দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, গাজায় ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ, ইউক্রেনের যুদ্ধ এবং ইয়েমেনে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া লড়াই বিশ্বশান্তির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাতিসংঘে বাংলাদেশের অবস্থান: স্বাধীনতার পর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংস্থাটির ১৩৬তম সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এরপর থেকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে দেশটি।
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে কর্মকর্তা পাঠানোর মধ্য দিয়ে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুরু হয়। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং স্থিতিশীলতা ফেরাতে বাংলাদেশি সামরিক ও পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৬ সালেও শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা ও পুলিশ সদস্য পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ শীর্ষ অবদানকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও হাই রিপ্রেজেন্টেটিভের দায়িত্ব পালন করছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত রাবাব ফাতিমা। এ ছাড়া ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত খন্দকার এম তালহা সংস্থাটির ৪০তম সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী নভেম্বর থেকে নতুন পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আর জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আইরিন খান।
জাতিসংঘ দিবস উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। দিবসটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি ও মানবাধিকারের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার সুযোগ তৈরি করে।
বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও অনিশ্চয়তার এই সময়ে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বড় দায়িত্বও। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কাজে লাগিয়ে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপ বাড়ানো, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ তুলে ধরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটা অগ্রসর হতে পারে, তার ওপর এ দায়িত্বের কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করবে।
সানা/আপ্র/২৪/১০/২০২৬
