ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মোঁদ ও লে প্যারিজিয়াঁর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৪ অক্টোবরের নতুন বিক্ষোভকে সামনে রেখে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে প্লাস দ্য লা রিপুবলিক, রু দ্য রিভোলি, বুলভার ভলতেয়ার ও আশপাশের বাণিজ্যিক এলাকায় দোকান সুরক্ষিত করার তৎপরতা দেখা গেছে। ২৩ অক্টোবর প্যারিসের বিভিন্ন দোকান, ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে কাঠের প্যানেল ও ব্যারিকেড স্থাপনের দৃশ্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
প্যারিস নগর কর্তৃপক্ষ, পুলিশ প্রিফেকচার ও ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের প্রশাসনের যৌথ হিসাব অনুযায়ী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবরের সহিংসতায় রাজধানীর ৪৫১টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২২৮টি প্রতিষ্ঠানে লুটপাট এবং ২২৩টিতে ভাঙচুরসহ অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। ২২ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিজিয়াঁ।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ছোট দোকান, টেলিযোগাযোগ পণ্যের বিক্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। প্রশাসনিক হিসাব অনুযায়ী, প্যারিসের দশম প্রশাসনিক এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্যারিস সেন্টার ও একাদশ প্রশাসনিক এলাকাতেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দোকান ক্ষতির মুখে পড়েছে। কোথাও দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করা হয়েছে, আবার কোথাও নষ্ট করা হয়েছে দোকানের ভেতরের সরঞ্জাম।
এসব ঘটনায় বহু ব্যবসায়ী আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কর্মীদের বেতন, দোকান মেরামত এবং ব্যবসা পুনরায় চালুর ব্যয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে তাঁদের অনেকেরই দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
নিরাপত্তা জোরদারের পরামর্শ, বাড়ছে ব্যয়ের চাপ, নতুন বিক্ষোভকে সামনে রেখে প্যারিস পুলিশ প্রিফেকচার ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে। লে মোঁদ-এর ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য লুটপাট ও ভাঙচুর ঠেকাতে ব্যবসায়ীদের অ্যালার্ম ব্যবস্থা পরীক্ষা, পরিস্থিতি বিবেচনায় দোকান খোলা রাখার সময় পরিবর্তন এবং সামর্থ্য অনুযায়ী বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তবে নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পক্ষে বাড়তি এই খরচ বহন করা কঠিন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের। ব্যবসায়ীদের নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়নি।
এ পরিস্থিতিতে দোকানের কাচের সামনে কাঠের প্যানেল স্থাপনকে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানোর একটি উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছেন অনেক ব্যবসায়ী। তবে এ ব্যবস্থা গ্রহণেও তাঁদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তুলনামূলক সহজে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে পারলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে।
কেউ দোকান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ প্রতিবেশী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমন্বয় করছেন, আবার কেউ কাঠের প্যানেল বসিয়ে ব্যবসা চালু রাখার চেষ্টা করছেন। দোকান বন্ধ রাখলে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে খোলা রাখলে লুটপাটের ঝুঁকি—এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তার উদ্যোগ, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সহায়তায় প্যারিস নগর কর্তৃপক্ষ প্রশাসনিক সমন্বয় ও সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। নগর কর্তৃপক্ষের ২১ অক্টোবর হালনাগাদ করা নির্দেশনায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষয়ক্ষতির প্রমাণ সংগ্রহ, পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের, বীমা প্রতিষ্ঠানে ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ এবং সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারে কত সময় লাগবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। দোকান মেরামত, নতুন পণ্য সংগ্রহ এবং স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে অনেক ব্যবসায়ীকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।
প্যারিসের বিভিন্ন দোকানের কাচ কাঠের প্যানেল দিয়ে ঢেকে দেওয়ার দৃশ্য নগরীর ব্যবসায়িক পরিবেশে তৈরি হওয়া উদ্বেগের প্রতিফলন। তবে এ পরিস্থিতি থেকে পুরো প্যারিসের সব দোকান বন্ধ কিংবা শহরের স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতি ও ঝুঁকি বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা নিজ নিজ উদ্যোগে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকার রক্ষা, সহিংসতা ও লুটপাট প্রতিরোধ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এই তিনটি বিষয় এখন ফরাসি কর্তৃপক্ষের সামনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
The post প্যারিসে ফের বিক্ষোভের শঙ্কা, লুটপাট ঠেকাতে দোকানের কাচে কাঠের ব্যারিকেড appeared first on ভোরের চেতনা.
