নাটোরের বড়াইগ্রামে বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩০ জন। মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার সরদারপাড়া এলাকায় দুর্ঘটনাটি ঘটে।
দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৯ জন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়। বনপাড়া হাইওয়ে থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত ১৪ জন মারা গেছেন।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, বরগুনা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহীগামী আরপি পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে পাবনাগামী বালুবোঝাই একটি ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস কর্মী ও উদ্ধারকারীরা ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠান।
নাটোর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা আব্দুর রউফ জানান, আহতদের উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতাল, স্থানীয় বিভিন্ন ক্লিনিক ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
নিহতদের পরিচয়
নিহতদের মধ্যে আটজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন:
শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার কাজীরহাট গ্রামের ইউনুস আলীর ছেলে সোহাগ হোসেন (৩০), বড়কান্দি গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে জুয়েল রানা (৪০), ডুবিসাহেবের গ্রামের জাহান উদ্দিন মোল্লার ছেলে সালাম (৪৫), কাজীরহাট গ্রামের শাহিন হোসেন (২৫), আব্দুস সামাদ ফকির রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার ফরহাদপুর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে ও বাসটির চালক সোহেল রানা (৪০), বাগমারা উপজেলার কনোপাড়া গ্রামের বাবর আলীর ছেলে আনোয়ার হক (৩০), পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের মৃত শহিদুল ইসলামের মেয়ে তাসফিয়া খাতুন (৮)।

যাত্রীদের বর্ণনা
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন চাঁপাইনবাবগঞ্জের যুবক তামিম বলেন, ‘বাসে শতাধিক যাত্রী ছিল। জায়গা না পেয়ে বাসের গেটে বসেছিলাম। দুর্ঘটনার পর বালির মধ্যে পড়েছিলাম। আমার ওপর আরও তিনজন ছিল। আল্লাহ বাঁচাইছে। কী যে ভয়ংকর অবস্থা ছিল, তা ভাষায় বর্ণনা করার মতো না। লোহার সাথে পা আটকে ছিল। ওঠার মতো অবস্থা ছিল না।’
তামিম জানান, তিনি মাদারীপুর থেকে বাসে উঠেছিলেন। তার ভাষ্য, ‘আমার সঙ্গে শুধু মাদারীপুর থেকেই উঠেছিলেন অন্তত ৫০ জন।’ তার দাবি, বাসের সব সিটে যাত্রী বসা ছিল এবং গেট থেকে পেছন পর্যন্ত ঠাসাঠাসি করে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া হয়েছিল।
আহত যাত্রীদের অনেকের ভাষ্য, বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের বাসটিতে শতাধিক যাত্রী ছিলেন। তাদের অভিযোগ, চালকের পরিবর্তে বাসটি চালাচ্ছিলেন সুপারভাইজার।
বাসের যাত্রী ও ঝিনাইদহ জনতা ব্যাংকে কর্মরত কালীগঞ্জের জুয়েল কিবরিয়া জানান, দুর্ঘটনার পর বাসের হেলপারের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। হেলপার তাকে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার সময় চালকের বদলে সুপারভাইজার গাড়ি চালাচ্ছিলেন।
চিকিৎসাধীন যারা
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের মধ্যে রয়েছেন নওগাঁর আব্দুর নূর ও চিরঞ্জিত; রাজশাহীর শহিদুল ইসলাম, সিয়াম, মজনু ও ফজলু হক; ঝিনাইদহের ডা. এস এম মুশফিকুর রহমান, তাওহীদ ও জুয়েল কিবরিয়া; চাঁপাইনবাবগঞ্জের তামিম, ববি, শামীম ও ডালিম; মাদারীপুরের ইমা ও নার্গিস এবং নাটোরের নেহাল ও জুলফিকার।

হাসপাতালের চিকিৎসক ও মুখপাত্র ডা. শেখ শামীম আহমেদ জানান, আহতদের মধ্যে অন্তত চারজনের অবস্থা গুরুতর। বাকিদের অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
আর্থিক সহায়তা ও তদন্ত কমিটি
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান জেলা প্রশাসক সুমনী আক্তার ও পুলিশ সুপার শরীফুল হক। এ সময় জেলা প্রশাসক নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেন। পুলিশ সুপার ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।
জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশের ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জাতীয় সংসদের হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। নিহতদের পরিবারকে এক লাখ টাকা করে অনুদানের কথাও বলেন তিনি। দুর্ঘটনা রোধে পাবনা-বনপাড়া মহাসড়ক প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান হুইপ।
বিআলো/শিলি