পড়েছেন চিত্রকলায়, কিন্তু শিল্পের খুব কমই শাখা আছে যেখানে মুস্তাফা মনোয়ার হাত দেননি। শুধু হাত দেওয়া নয়, স্বকীয়তার ছাপ রেখেছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে পাপেট-সংশ্লিষ্টতাই তাকে সারা দেশের ঘরে ঘরে পরিচিত মুখ করে তুলেছিল।
বেশ পরিণত বয়সেই গত ২৯ জুন চিরবিদায় নিয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার। রেখে গেছেন নিজের তৈরি বিখ্যাত পাপেট চরিত্রগুলোকে। ধানমন্ডির বাড়িময় তাদের বর্ণাঢ্য উপস্থিতি। জানা গেল, মুস্তাফা মনোয়ারের পরিকল্পিত অসমাপ্ত কিছু কাজের বাস্তবায়ন আর তার পাপেটজগতের সংরক্ষণ নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন তারা।
মুস্তাফা মনোয়ারের বাড়ির দুটি তলায় গড়ে উঠেছে তার শিল্পের ভুবন। নিচতলায় স্টুডিও। কয়েকটি কক্ষে এলোমেলো পড়ে আছে কাজের হরেক সরঞ্জাম। পুরো স্টুডিওতে আকাশি-নীলের ক্যানভাস। ওপরে সার বাঁধা আলোকসম্পাতের যন্ত্র। অনেক স্ট্যান্ড দাঁড় করানো। দু-একটা কৃত্রিম গাছ। বিটিভির জনপ্রিয় পাপেট শো ‘মনের কথা’র শুটিং হতো এখানেই।
মুস্তাফা মনোয়ারের কাজের সঙ্গী অনুকূল চন্দ্র জানালেন, শিল্পীর মৃত্যুর পর থেকে গত কয়েক মাসে কোনো কাজ হয়নি। তবে আবার শুটিং শুরু হবে। তাই গোছগাছ চলছে। ওপর তলায় দেখা মিলল ‘পাপেট বাড়ি’ নামের অদ্ভুতুড়ে একটি কক্ষের। কক্ষটিকে ‘যন্তরমন্তর গৃহ’ বললে ভুল হয় না। চারদিকে নানা ধরনের ধাতব যন্ত্র—হাতুড়ি, বিভিন্ন ধরনের বাটালি, স্ক্রু ড্রাইভার, ড্রিল মেশিন, প্লায়ার্স, কাঠ কাটার নানা যন্ত্র। ঘরের এক কোণে একটা পুরোনো লেদ মেশিনও। মাথার ওপরের তাকে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কাপড়ের বান্ডিল, কাঠের ছোট ছোট গুঁড়ি, পাপেট তৈরির নানা সরঞ্জাম।
পাপেটের প্রতিটা অংশই ওয়ার্কশপ ঘরে বসে নিজে নির্দেশনা দিয়ে বানাতেন মুস্তাফা মনোয়ার। নিজেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করতেন। জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে নিজে আনিয়েছিলেন যন্ত্রগুলো।
পাপেট বাড়িতে এখনো আছে শিল্পীর তৈরি করে যাওয়া প্রায় এক শ পাপেট। ঘরে ঢুকলেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে সার বেঁধে ঝোলানো বর্ণিল মুখ। কারও ঠোঁটে হাসি, কারও মুখ হা হয়ে আছে যেন এখনই কথা বলে উঠবে। কারও হাত-পা আবার ঝুলছে নিষ্প্রাণ ভঙ্গিতে। এখানেও টেবিলে ছড়িয়ে আছে ছেনি, তুলি, রঙের কৌটা, সেলাই কাটার সরঞ্জাম। দেখা গেল ‘মনের কথা’র জনপ্রিয় চরিত্র পারুল, বাউল ভাই ও ষাঁড়কে।
নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে এই ‘পাপেট বাড়ি’ গড়ে তুলেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। কক্ষটিতে একটি সেকেলে কাঠের আলমারির গায়ে কয়েকটি কাগজ সাঁটানো। তাতে লেখা পাপেট চলচ্চিত্র ‘বীর পুরুষ’-এর কয়েক ধাপের কাজের বিবরণ। অনুকূল জানান, পাপেট চরিত্র ও সত্যিকার অভিনেতাদের সমন্বয়ে রবীন্দ্রনাথের শিশুতোষ কবিতা ‘বীর পুরুষ’কে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে চেয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। ইচ্ছা ছিল কবিগুরুর আরেক বিখ্যাত চরিত্র ‘সুভা’ নিয়েও পাপেট চলচ্চিত্র করার। কিন্তু সেগুলো পরিকল্পনাই থেকে গেল।
স্বয়ং মুজতবা আলী তরুণ বয়সেই তার প্রতিভার আভাস পেয়ে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ছাড়িয়ে ভর্তি হতে বলেছিলেন আর্ট কলেজে। সেই থেকে শুরু। দীর্ঘ জীবনে শিল্পের নানা ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন সাফল্যের সঙ্গে। বিটিভির জন্য তার তৈরি করা ‘রক্তকরবী’ নাটক প্রশংসা কুড়িয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের মতো কৃতী মানুষের। বিনোদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে পাপেট শোকে পরিণত করেছিলেন দারুণ গণশিক্ষার মাধ্যমে। সেই মুস্তাফা মনোয়ারের সৃষ্টিকর্মের প্রসার ও সংরক্ষণ নিশ্চয়ই জাতীয় স্বার্থেই প্রয়োজন।
