ন্যাশনাল চাইল্ড হেল্পলাইনের তথ্যমতে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরে শিশুদের সাইবার হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা বেড়েছে ৪২ শতাংশ। শিশুদের জন্য আশঙ্কাজনক পরিস্থিতিতৈরি হওয়ার জন্য প্রথম দায় অভিভাবক এবং পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠরা এড়াতে পারেন না। এমনিতেই এখনকার শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি প্রবল। শিশুদের এই মাধ্যমটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতার দায় কি এড়ানো যাবে?
প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারে আগ্রহী হওয়া অস্বাভাবিক নয়। অভিযোগ আছে, কোনো কোনো অভিভাবক পড়াশোনার সাহায্য পাওয়ার অজুহাত দেখিয়ে তাঁদের সন্তানদের বয়সের সঠিক তথ্য গোপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলে দিচ্ছেন। অথচ ১৩ বছরের নিচের বয়সী কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে না। আবার অনেক মা-বাবা নিজ সন্তানদের ছবি অনায়াসে ফেসবুকে প্রকাশ করছেন। কিন্তু এর পরিণতি যে কত ভয়াবহ হতে পারে, সে সম্পর্কে তাঁদের ধারণা নেই। সমাজের একশ্রেণির বিপজ্জনক মানুষ এই ছবিগুলোর অপব্যবহার করে।
ফেসবুকের ভালো ও মন্দ দুটি দিকই আছে। শিশুরা ভালোটা তখনই গ্রহণ করবে, যখন তারা এ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে। এ জন্য শিশুদের জীবনের নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি ফেসবুকের ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে শেখাতে হবে। তা না হলে এই ফেসবুকই শিশুদের জীবন বিপন্ন করতে পারে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের ছবি বা তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে চরম সংযম বজায় রাখা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্তানের উপস্থিতি সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে না রেখে অ্যাকাউন্ট ব্যক্তিগত রাখা, অনুসারীদের তালিকা নিয়মিত যাচাই করা খুব জরুরি। তবে কড়া নজরদারির মধ্যে রাখাও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ যুগের চাহিদা শিশুরা এড়িয়ে যেতে পারে না।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করার ঝুঁকি সম্পর্কে শিশুদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে বোঝাতে হবে, যাতে কোনো অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে তারা ভয় না পেয়ে নির্দ্বিধায় মা-বাবার কাছে সাহায্য চাইতে পারে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেলে তাড়াহুড়ো করে সব তথ্য বা প্রমাণ মুছে না ফেলে লিংক, স্ক্রিনশট ও মেসেজ সংরক্ষণ করে সঠিক জায়গায় অভিযোগ জানাতে হবে।
এসব ক্ষেত্রে দ্বিতীয় ভূমিকা পালন করতে পারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রযুক্তি ব্যবহারের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো শ্রেণিকক্ষে আলোচনা হওয়া দরকার। শিশুদের কেবল বইয়ের পাঠে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের অনলাইন সচেতনতা-বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ ছাড়া সাইবার অপরাধীদের দমন করা প্রায় অসম্ভব। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দক্ষতা, সক্ষমতা ও আধুনিক প্রযুক্তিতে অভ্যস্ততা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।
শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ ও ইতিবাচক ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা কেবল একটি নির্দিষ্ট পক্ষের একক কাজ নয়, এটি সমগ্র সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব। প্রযুক্তিকে বাদ দিয়ে নয়, বরং সচেতনতা, নৈতিক শিক্ষা ও কঠোর নজরদারির মাধ্যমে শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহারের উপযুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে।
