শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটিতে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলো অনেকটাই ফাঁকা এবং যানজটমুক্ত। ব্যস্ততা, যানজট আর হর্নের বিকট শব্দে অভ্যস্ত ২ কোটি মানুষের এই মেগাসিটি এখন কোলাহলমুক্ত, শান্ত ও প্রায় নির্জন। তবে বিনোদন পকন্দ্রগুলোর চিত্র ছিল ভিন্ন। সকাল থেকেই বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়ক ও কয়েকটি বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রতি বছর প্রধান প্রধান ধর্মীয় উৎসব বা ছুটির দিনগুলোতে নাড়ির টানে হাজার হাজার মানুষ ঢাকা ছাড়েন। এ বছর দুর্গাপূজায় টানা পাঁচ দিন ছুটি থাকায় দীর্ঘ অবকাশ পেয়ে নগরবাসীর একাংশ রাজধানী ছেড়েছেন গ্রামে বা দর্শনীয় স্থানে ঘুরে আসার উদ্দেশ্যে। এর ফলে চিরচেনা ব্যস্ত ঢাকা দেখা দিয়েছে এক অন্যরকম রূপ।
ছুটির দিনে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিমান বাহিনী জাদুঘর, ভাসানী নভোথিয়েটার এবং জিয়া উদ্যানে ঘুরতে এসেছে হাজারো দর্শনার্থী। শুধু তাই নয়, সকাল থেকে জাতীয় চিড়িয়াখানায়ও ভিড় ছিল লক্ষণীয়।
গতকাল চিড়িয়াখানা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় সব বয়সের মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বাবার কাঁধে চেপে কিংবা মায়ের হাত ধরে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে বেড়াচ্ছে দর্শনার্থী শিশুরা। চিড়িয়াখানার বাঘ, সিংহ, হরিণ, জিরাফ, বাঁদর ও নানা প্রজাতির পশুপাখি দেখে আনন্দে মেতে উঠেছে তারা। কেবল বন্যপ্রাণী দেখাই নয়, চিড়িয়াখানার ভেতরে থাকা শিশু পার্কে বিভিন্ন রাইডে চড়ে এবং আনন্দময় খেলাধুলায় মেতে উঠে দারুণ সময় পার করছে ছোটরা।
চিড়িয়াখানায় আসা সাত বছরের শিশু দীপিকা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলে, ‘এ কয়েক দিন খুব আনন্দ করে দুর্গাপূজা পালন করেছি। এখনো স্কুল অনেক দিন বন্ধ, তাই চিড়িয়াখানায় ঘুরতে এসেছি। এখানে এসে জিরাফ আর বানর দেখে খুব ভালো লাগছে, এখন হাতি দেখতে যাব।’ আরেক খুদে দর্শনার্থী অয়ন আহমেদ সানন্দে বলে, ‘টিভিতে দেখা বাঘ আর জিরাফ আজ সামনাসামনি দেখতে পেয়ে আমার খুব আনন্দ হচ্ছে!’
শিশুদের এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দারুণ খুশি অভিভাবকেরাও। মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা ইমরান মাহমুদ বলেন, ব্যস্ত এই নগরীতে ছোটোদের পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার সুযোগ খুব একটা পাওয়া যায় না। যেহেতু দুর্গাপূজা উপলক্ষে একটা লম্বা ছুটি পাওয়া গেল, আর বাচ্চারাও বায়না ধরেছিল ঘুরতে বের হওয়ার, তাই এই সুযোগে সবাই মিলে একসঙ্গে ঘুরতে এলাম।
এদিকে সাধারণ দিনে মতিঝিল, শাহবাগ, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুরের যে রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়, এখন সেসব সড়ক সম্পূর্ণ ফাঁকা। গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যাও কম। কিছু সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করলেও সেগুলোতে যাত্রীর সংখ্যা বেশ কম। তবে ফাঁকা সড়কে অটোরিকশাগুলো গতি বাড়িয়ে দিয়ে গন্তব্যে ছুটছে।
মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরায় যেতে যেখানে সাধারণ সময়ে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা লেগে যায়, বর্তমানে মাত্র ২০ থেকে ২৫ মিনিটেই সেই দূরত্ব অতিক্রম করা সম্ভব হচ্ছে। আব্দুল্লাহপুর থেকে মিরপুর শেওড়াপাড়ায় ৩৫ মিনিটে এসে পৌঁছেছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শেখ কামাল হোসেন। তিনি বলেন, কর্মদিবসে এক থেকে দেড় ঘণ্টার কমে আসার সুযোগ থাকে না, সেখানে মাত্র ৩৫ মিনিটে এসে পৌঁছালাম। পূজার ছুটির কারণে সড়কে চলাচলে স্বস্তি মিলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এদিকে পূজার ছুটিতে সকালের দিকে মেট্রোরেল স্টেশনগুলোতেও যাত্রীদের তেমন চাপ লক্ষ করা যায়নি।
ঢাকা ফাঁকা হওয়ায় একদিকে যেমন কর্মজীবী মানুষ ও পথচারীদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেছে। সড়কগুলো নির্জন হলেও রাজধানীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোয় উৎসবের আনন্দ আর দর্শনার্থীদের ভিড় জমে উঠেছে। টানা ছুটিতে বিনোদন কেন্দ্রগুলো পরিবারের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। ছুটির দিন শেষ হলেই আবারও তিলোত্তমা ঢাকা ফিরে পাবে তার ব্যস্ত ও কোলাহলপূর্ণ আসল রূপ। তবু প্রতি বছর এ ধরনের ছুটি ঢাকাবাসীকে দেয় কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ।