জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) সততার প্রতীক হয়ে নানা চ্যালেঞ্জ নিয়ে যিনি দায়িত্ব পালন করছেন তিনি হলেন, কর অঞ্চল-৮, ঢাকার কর কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিব। মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করে তাকে ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ৩২৪ কোটি টাকার অনিয়ম এবং দুর্নীতির লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ ওঠার পর তিনি গণমাধ্যমের কাছে নিজের সততা নিয়ে একধরনের চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনা একটি অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তিনি স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে দেবেন। এমনকি সরকারি চাকুরিবিধি মোতাবেক যেকোন ধরনের শাস্তি মাথাপেতে নিতে তিনি প্রস্তুত।
কর কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিব পূর্বে এনবিআর-এর অত্যন্ত সংবেদনশীল শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ জমা পড়ে। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে যদি একটি অনিয়মও প্রমাণিত হয়, তবে তিনি আইনি শাস্তির পাশাপাশি নিজ দায়িত্ব ও চাকরি থেকে ইস্তফা দেবেন। বর্তমানে এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগ প্রাথমিক অনুসন্ধান কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার দাবিও জানান তিনি।
প্রশাসনের শীর্ষ পদে বসার জন্য অর্থ লেনদেনের অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত। যা তাকে হেয় করতে এবং তার চরিত্রের উপর কালিমা লেপনের একটি অপপ্রয়াসমাত্র। একটি মহল তার পেশাগত সুনাম ক্ষুণ্ন করতে এবং তাকে হয়রানি করতে এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়াচ্ছে।
গত ৩০ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের হস্তক্ষেপ কামনা করে একটি লিখিত আবেদন করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের পক্ষে ব্যারিস্টার রুকন উদ্দিন আহমেদ ওই আবেদন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনে আবদুর রকিবের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, দুর্নীতি, সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, অর্থ পাচার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। তবে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন কর কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিব। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের একটি পয়সার দুর্নীতিও কেউ প্রমাণ করতে পারলে তিনি নিজে গিয়ে আত্মসমর্পণ করবেন এবং সরকারি চাকরি থেকে অবসর নেবেন।
কেউ আমার বিরুদ্ধে কোনো এক পয়সার কোনো দুর্নীতি প্রমাণ দিতে পারবে না। যদি দিতে পারে আমি সরাসরি গিয়ে সারেন্ডার করব। অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র এখনো তার কাছে পৌঁছায়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভিযোগ তদন্ত করা হোক। তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তিনি তার দায় নিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে অভিযোগে যেসব ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, ঠিকানা ও সম্পদের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তার স্ত্রী ও কন্যা সন্তানদের নামে সম্পদ ও ব্যাংক হিসাবের যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেটিকে সরাসরি মিথ্যা বলে দাবি করেন তিনি। তার স্ত্রীর নাম উম্মে হাজেরা খাতুন। অথচ অভিযোগে তার স্ত্রীর নাম ইয়াসমিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার কোনো কন্যা সন্তান নেই। সন্তানদের নামে বিদেশে পড়াশোনা এবং বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অর্থ থাকার যে তথ্যের কথা বলা হয়েছে, সেটিও অস্বীকার করেন তিনি। রকিব জানান, তার দুই ছেলে রয়েছে। তাদের প্রকৃত পরিচয় ও শিক্ষাজীবনের তথ্য অভিযোগে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে মিল নেই। তার কোনো ছেলে বিদেশে পড়াশোনা করে না বলেও দাবি করেন তিনি।
ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগে যেসব ব্যাংক হিসাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে তিনি খোঁজ নিয়েছেন। তার দাবি, উল্লিখিত নামে ওই ধরনের কোনো হিসাব নেই এবং অভিযোগে দেওয়া হিসাব নম্বরও সঠিক নয়। কর অঞ্চল-৮, ঢাকার কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিব বলেন, আমি ব্যাংকে খবর নিছি, আসলে ওই দুই ব্যাংকে ওই ধরনের কোনো অ্যাকাউন্টই নাই। যাদের কথা বলা হয়েছে, ওই ছেলেমেয়ের নামও আমার না। অভিযোগে বনানী, গুলশান ও কলাবাগানে তার নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে ফ্ল্যাট ও সম্পদের তথ্য থাকার বিষয়েও প্রশ্ন করা হলে তিনি এসব সম্পদের মালিকানা অস্বীকার করেন।
তিনি সরকারি বাসায় থাকেন। সরকারি ঋণ নিয়ে কয়েকজন কর্মকর্তা মিলে বসুন্ধরায় একটি গ্রুপ ফ্ল্যাট করছেন। এর বাইরে তার কোনো ফ্ল্যাট বা বাড়িঘর নেই বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, আমি সরকারি বাসায় থাকি এবং আমরা সরকারি লোন নিয়ে কতজন অফিসার মিলে বসুন্ধরায় একটা গ্রুপ ফ্ল্যাট করতেছি, এর বাইরে আমার কিছু নাই। ফলে অভিযোগে উল্লেখ করা বনানী, গুলশান ও কলাবাগানের ফ্ল্যাটের মালিকানা নিয়েও বড় ধরনের তথ্যগত অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। পুরা এনবিআরে আপনারা খবর নিতে পারেন, কেউ যদি বলতে পারে যে আমাকে কোনোদিন এক টাকা কেউ ঘুষ দিছে, তাহলে আমি যেকোনো শাস্তি মেনে নিতে প্রস্তুত। বিদেশে অর্থ পাচার এবং অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় যাতায়াতের তথ্যের বিষয়েও সরাসরি অস্বীকার করেন তিনি। জীবনে তিনি কখনও অস্ট্রেলিয়া বা কানাডায় যাননি।
অভিযোগে আরো দাবি করা হয়েছে, দুর্নীতি দমন কমিশনে নেওয়ার জন্য তিনি দুই সচিবকে দুই কোটি টাকা দিয়েছেন। এই অভিযোগও সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন তিনি। তার ভাষ্য, দুই কোটি টাকা তো দূরের কথা, কাউকে দুই টাকা দেওয়ার অভিযোগও কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি জনপ্রশাসন সচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়ার আহ্বান জানান।
অভিযোগে তার পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ, ব্যাংক হিসাব এবং বিদেশে অর্থ পাচারের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই দাবি করে রকিব বলেন, তার সন্তানদের নাম, স্ত্রীর নাম এবং পারিবারিক তথ্যই সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ওইসব তথ্যের ভিত্তিতে তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ বা অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় বলেও তিনি দাবি করেন।
অভিযোগকারী ব্যারিস্টার রুকন উদ্দিন আহমেদের পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন রকিব। তার দাবি, অভিযোগে ব্যবহৃত ফোন নম্বরটি আলী আজগর ফকির নামে একজনের। একই সঙ্গে হাইকোর্টে তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের তালিকায় ব্যারিস্টার রুকন উদ্দিন আহমেদ নামে কাউকে তিনি খুঁজে পাননি বলে দাবি করেন। তবে এ দাবির স্বতন্ত্র সত্যতা যাচাই করা হয়নি।
নিজের কর্মজীবনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে কর অঞ্চল-৮, ঢাকার কমিশনার মোহাম্মদ আবদুর রকিব বলেন, তিনি প্রায় ২৮ বছর সরকারি চাকরি করেছেন। কর্মজীবনে নীতির বাইরে গিয়ে কোনো কাজ করার চেষ্টা করেননি। তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে তিনি শতভাগ শুদ্ধ নন, তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করার চেষ্টা করেছেন এবং যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই দেশের স্বার্থে কাজ করেছেন।
বিআলো/অর্নব