শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এ সময় দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সরকার ও বিরোধী দলকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন আমন্ত্রিত নেতারা।
মত বিনিময়ে হিন্দু নেতারা সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব দাবি করেন। সেটা কিভাবে সম্ভব তা আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে সরকার ও বিরোধী দলকে ঠিক করতে বলেছেন তারা।
রাজধানীর মিন্টো রেডে বিরোধী দলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ মত বিনিময় সভা হয়। সভার পর সাংবাদিকদের সামনে ব্রিফ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবেই শুধু নয়, বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে একটা সাংবিধানিক দায়িত্বের কথা তিনি (শফিকুর রহমান) স্মরণ করে বলেছেন যে, আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের সকল ধর্মের মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা, তাদের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট সব কথা বলা সরকারেরও যেমন দায়িত্ব, তেমনি বিরোধীদলীয় নেতারও সাংবিধানিক কর্তব্য। সেটা তিনি স্মরণ করেছেন এবং সে ব্যাপারে তার ভূমিকা যতটুকু তিনি পালন করেন, সেটাও ব্রিফ করেছেন।”
তার দাবি, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা, মন্দির রক্ষায় জামায়াত কর্মীদের ভূমিকারও প্রশংসা করেছেন হিন্দু নেতারা। তবে বিভিন্ন জায়গায় কিছু বৈষম্য, বঞ্চনা, অসুবিধা, দুঃখ-কষ্টের কথা জানিয়ে তারা বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, “সরকার এবং বিরোধী দল সেসব সমস্যার সমাধানে ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের পাশে থাকবে। আমাদের নেতা আশ্বস্ত করেছেন যে, আমরা আপনাদের সঙ্গে আরও মতবিনিময় করব, আরও কথা শুনব। আমাদের এই কর্তব্য-দায়িত্ব পালনে আপনাদের পাশে আমরা সবসময় থাকব।’’
মত বিনিময়ে অংশ নেওয়া পূজা উপদাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বলেন, “আজকে শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে বিরোধীদলীয় নেতার আমন্ত্রণে আমরা এখানে এসেছিলাম। আপনারা জানেন, বিভিন্ন জাতীয় সমস্যাও এই পুজো উৎসবের মধ্যে, প্রস্তুতির মধ্যে আলোচিত হয়েছে। আমরা তুলে ধরেছি; কারণ যেই সমস্যাগুলোর কারণে আমাদের যা বলতেই হবে।
“আমি বলেছি যে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলা হচ্ছে, কিন্তু আমরা ২৯ থেকে আটে নেমে এসেছি। এইটার সঙ্গে এটা মিলছে না। যাতে ভবিষ্যতে এই সত্যিকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে আমরা সবাই এক কাতারে দাঁড়িয়ে বলতে পারি, সেটা যেন নিশ্চিত করা হযয়। দ্বিতীয়ত যে সমস্যাগুলো আমরা তুলে ধরেছি, এটা সরকার ও বিরোধী দল মিলে সমাধান করতে হবে।”
সবার সহযোগিতা, পারস্পরিক বোঝাপড়া, সমন্বয় ছাড়া সমস্যাগুলো সমাধান হবে না মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা বলেছি, সংসদে আমাদের কেউ নেই। কার্যত আমরা সংসদে আসতে চাই। কিভাবে আসব, সেটা আপনারা এবং সরকারি দল মিলে ঠিক করবেন। এই কথাগুলো আলোচনার মধ্যে এসেছে।”
মত বিনিময় অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ধন্যবাদ দিয়ে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বলেন, “যে শুভ সূচনা হল, আগামী দিনে বাংলাদেশের সকল সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমরা যেন দলমত নির্বিশেষে একসাথে কাজ করতে পারি। সকলে মিলেমিশে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে পারি এবং একে অপরের সহমর্মিতায় পাশে থাকতে পারি, সেটাই আজ আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির এবং বিরোধী দলীয় নেতা।
“আমরা সনাতন সমাজের পক্ষ থেকে তার এই আগ্রহ এবং তার যে বক্তব্য, সেটাতে আমরা সন্তুষ্ট। আগামী দিনে জামায়াতে ইসলামী এসব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
মত বিনিময়ে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় হিন্দু মহাজোটের সভাপতি দীনুবন্ধু রায়, মহাসচিব গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ, পূজা উপদাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর, সাধারণ সম্পাদক সন্তোষ শর্মা, পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সভাপতি অর্পনা রায়, সাধারণ সম্পাদক মিল্টন বৈদ্য, মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ, সাধারণ সম্পাদক শুভাশীষ কুমার বিশ্বাস, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের সভাপতি তপন চন্দ্র মজুমদার, আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) সভাপতি সত্যরঞ্জন বাড়ৈ, সাধারণ সম্পাদক চারু চন্দ্র দাশ ব্রহ্মচারী, জাতীয় হিন্দু মহাজোটের (প্রভাষ-পলাশ) সভাপতি প্রভাস চন্দ্র রায়, নির্বাহী মহাসচিব পলাশ কান্তি দে, বাংলাদেশ ঋষি পঞ্চায়েত ফোরামের সভাপতি রামানন্দ দাস, সাধারণ সম্পাদক রাজ কুমার দাস, বাংলাদেশ সনাতন পার্টির সভাপতি আশিষ রঞ্জন দাস ও সাধারণ সম্পাদক সুমন কুমার রায়।
এছাড়াও মতবিনিময়ে ছিলেন বাংলাদেশ রবিদাস ফোরামের সভাপতি চাঁদমোহন রবিদাস, সাধারণ সম্পাদক শিপন রবিদাস প্রাণকৃষ্ণ, ভোলানন্দগিরি আশ্রম ট্রাস্টের সাধারণ সম্পাদক ননী গোপাল মজুমদার, রবিদাস উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি দিলীপ রবিদাস, সাধারণ সম্পাদক ফুল চাঁদ রবিদাস, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং, হরিজন ঐক্য পরিষদের সভাপতি কৃষ্ণলাল, সাধারণ সম্পাদক নির্মল দাশ, জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতির সভাপতি হীরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, সাধারণ সম্পাদক সোমনাথ দেসহ অন্যান্যরা।
জামায়াতের নেতাদের মধ্যে সভায় ছিলেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন ও শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
